ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

pic of pathagar
রূপকথার মত লাগে। ১৯৬৮ সালে, বাংলাদেশের তৎকালীন সিলেট জেলা ও ঢাকার মাঝামাঝি স্থানে হবিগঞ্জ মহকুমার, পাহাড় জঙ্গল ঘেরা এক প্রত্যন্ত থানা সদর ‘চুনারুঘাট’-এ পাঠাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।স্থানীয় বিদগ্ধজনের পাশাপাশি, ওই সময়ে চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)’র সক্রিয় উদ্যোগে চুনারুঘাট থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি পরিত্যক্ত ভবনে প্রায় চার হাজার বই নিয়ে শুরু হওয়া পাঠাগারটি, চুনারুঘাটকে একটি নতুন ভূবনের সন্ধান দেয়। ১৯৭০ সালে, অনন্য নাট্য গোষ্ঠী এরপর, ‘সাহিত্য নিকেতন’ নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রিড়াঙ্গনে ছিল আবাহনী ক্রিড়া চক্র ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। রীতিমত প্রশিক্ষন শিবিরের আয়োজন হত।

ওদিকে, সাহিত্য নিকেতনের ঘর, পাঠাগার ও আসবাবপত্র ব্যবহার করে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে ‘চুনারুঘাট কলেজ’। সাহিত্য নিকেতনের স্থায়ী ঠিকানা হয় ১৯৭৯ যা এখন ‘সাহিত্য নিকেতন মনসুর ভবন’ এবং ১৯৮৬ সালে জাতীয় স্বীকৃতি পেয়ে ‘চুনারুঘাট সরকারী (ডিগ্রি) কলেজ’ হয়। সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-পাহাড়-নদী-প্রকৃতির এক নিবিড় শিল্পালয়ে যেন এক সভ্যতা রচনা হচ্ছে। তৎকালীন হবিগঞ্জ মহকুমার প্রশাসক (এসডিও) আসাদুজ্জামান ভূইয়ার পৃষ্টপোষকতায় ১৯৮২ সালে উপজেলা পরিষদের জমিতে বেসরকারী উদ্যোগে ‘আসাদ ক্লাব ও পাবলিক লাইব্রেরী’ এর যাত্রা শুরু হয়।পৃষ্টপোষকের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করেই নামকরন করা হয়। এছাড়াও, এতে তৎকালীন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাদের সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই সময়ের জীবনযাপন, শিক্ষা, সামাজিকতা, ক্রিড়া ও সংস্কৃতিতে সরকারী প্রশাসন ও স্থানীয় জনসাধারনের মধ্যে সাবলীল সম্পর্ক ছিল যাতে রাষ্ট্রীয় পদ ও সামাজিক অবস্থান আলাদা আলাদাভাবে বুঝার উপায় ছিল না। যেন, সবাই গানের মত ‘মানুষ’।

এ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তাতে ওই সময়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, জনপ্রতিনিধি ও নেতৃস্থানীয় গুণী তথা বড়দের কীর্তি।তখনকার শিশু-কিশোর-তরুনেরাও গড়তে থাকে ‘খোয়াই কচি-কাচার মেলা’ এবং এরাই ১৯৮৯ এ এসে ‘চুনারুঘাট সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ’ গঠন করে এবং প্রতি বছর তিন দিনব্যাপী সাহিত্য-সংস্কৃতি উৎসবের আয়োজন করে, নতুন প্রজন্ম চোখের সামনে দেখতে পায় পাঠ্যবইয়ে পড়া নামের কবি, পত্রপত্রিকায় জানা ও টিভিতে দেখা শিল্পিকে। সাধারণ-অসাধারণের এক মেলবন্ধন রচিত হয়। অদ্যাবধি দেশের সকল প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যক, অধ্যাপক, চিন্তাবিদ, নাট্যকার, বাউল, সৈনিকদের পদধুলিতে ধন্য হয় চুনারুঘাটের মাটি ও মানুষ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাট্য সংগঠনসহ সারাদেশের বিখ্যাত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিখ্যাত আবৃত্তিকার ও গায়কদের আগমনও উল্লেখ্য। এসব ঘটনা, চুনারুঘাটের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।চুনারুঘাটকে দেশের আলোকিত জনপদে উন্নীত করেছিল।এসবের মাঝে লালিত পালিত হয়েছেন চুনারুঘাটের কৃতি সন্তানেরা, যাদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত প্রকৌশলী-কবিয়াল, বিজ্ঞানী এবং দেশের সর্বোচ্চ পদবীধারী বিচারক, চিকিৎসক, রাজনীতিক, সেনা কর্মকর্তা, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ দানশীল ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। সবটুকু মেধা, শ্রম ও তিতিক্ষা দিয়ে মাতৃভূমির ঋন মেটানোর চেষ্ঠা করেছেন সকল গুণীরা। স্বাভাবিকভাবেই,ইতিহাসের ধারাবাহিকতা পাঠাগারকে, সমাজ ও শিক্ষার প্রধানস্থল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত করে। তাই, এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, ১৯৬৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত সময়ে চুনারুঘাট সদরে তিনটি পাঠাগার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে ২০১৭ সালে উপজেলায় অন্তত ত্রিশটি পাঠাগার আছে। হাটে-বাজারে না থাকলেও, অত্র উপজেলার ছয়টি স্কুল এন্ড কলেজ, শতাধিক হাই স্কুলসহ হাজার খানেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে পাঠাগার থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

pic of pathagar 002
ঘটনা উল্টে গেল। ২০১৭ সালে এসে চারশো বাইশ বর্গকিলোমিটারের চুনারুঘাট উপজেলায় উল্লেখ করার মত একটি মাত্র পাঠাগার আছে। তাও, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ এ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার যাত্রা শুরু করে। ১৯৬৮ থেকে ‘৯১ পর্যন্ত ২৩ বছর দেশে অস্থিতিশীলতার টানা যুগেও চুনারুঘাটের শিক্ষা ও প্রগতির চাকা সচল ছিল। কিন্তু, জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ে গঠিত সরকারের শাসনকালেই বন্ধ হতে থাকে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই দুই যুগের নবীন-প্রবীণ সকলের ধ্যানজ্ঞান ছিল শিক্ষা ও মেধাভিত্তিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরী করা। ‘৯১ এর পর কলেজপড়ূয়ারা আর বিতর্ক-সাহিত্য সভা করে না। দেয়ালিকা-পত্রিকা প্রকাশ করে না। জ্ঞান আহরণ ও চর্চার সকল দরজা বন্ধ হয়ে যাবার ১৭ বছর পর ১৯৯৩ সালের এসএসসি ব্যাচের বন্ধুরা স্থাপন করেন- ‘পদক্ষেপ গণপাঠাগার’। ‘গ্রন্থাগার- জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়’ বাণীকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় নিয়ে চুনারুঘাট উপজেলার একমাত্র পাঠাগার হয়ে পাঠাগারের ধারণা ও নমুনা ধরে রাখার চেষ্টা করছে ‘পদক্ষেপ গণপাঠাগার’।