ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

গত দু’তিন দিন ধরে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের সাপ ও সাপের ঝাঁপি বিষয়ক বিতর্ক মোটামুটি জমে ওঠেছে । ২৬ ডিসেম্বর বিএনপির জনসংযোগ ও পথ সভায় বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর দলের নেতারা আওয়ামী লীগকে সাপ বলে অভিহিত করে সাপ তাড়ানোর ব্যবস্থা করার জন্যে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন,‘আগেও আওয়ামী লীগ আপনাদের আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতায় গেছে। এবারও নির্বাচনের আগে নতুন নতুন আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু সাপকে বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না। বিএনপি প্রধানের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে একই কথা বলেছেন, বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলামও। তিনিও এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগকে সাপের সাথে তুলনা করে বলেছেন। আমরা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি, তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমেই এ সাপকে বিতারিত করতে হবে।

এর পর দিনই বিএনপি নেত্রী ও সে দলের নেতাদের উদ্দেশ্য করে ঢাকা মহানগরী আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,‘বিরোধী দলীয় নেত্রীই সাপ নিয়ে খেলছেন। সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছেন। যুদ্ধাপরাধী ও একাত্তরের গণহত্যাকারীদের সঙ্গে নিয়ে আপনি আওয়ামী লীগকে সাপ বলেন। তবে যুদ্ধাপরাধীরা কী? তারা ওনার কাছে ফেরেশতা ? উন্নত কোনো জীব? একাত্তরের যারা গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণ করেছিল তারা উনার কাছে অত্যন্ত উন্নত জীব! যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় উনি বিজয়ের মাসে মাঠে নেমেছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেও তিনি তা পারেননি।
যুদ্ধাপরাধীদেরও তিনি রক্ষা করতে পারবেন না। ওরা এবং ওদের সাথীরাই হলো সাপ, বেগম জিয়া শুধু সাপ নয় সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছেন।’
এ প্রসংগে ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন,‘ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এখন ঝাঁপি খুলেই মাঠে নেমেছেন। উদ্দেশ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ঠেকানো। ছাব্বিশে ডিসেম্বর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত পথসভায় জামায়াত-শিবিরকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল অচল করারও হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি।’

সাপ বিষয়ক এ বিতর্কটি এখন বেশ জোরেসোরেই চলছে কে সাপ, আর কে সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলছে তা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা চলছে। তাদের কথা হলো সাপ অতি নিরীহ প্রাণী, মানুষ দেখলেই সাপ পালিয়ে বেড়ায়, কেউ তাকে আঘাত না করলে সে ছোঁবল মারে না। আর গোঁখরো সাপ যা ফোঁসফাঁস করে মানুষকে ভয় দেখিয়ে আত্মরক্ষার জন্যই করে থাকে। আওয়ামী লীগ যদি সত্যিকারের সাপ হতো তা হলে এবার ক্ষমতায় এসে ২০০১ সালের শালসা মার্কা নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণের আগেই বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা যে ভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সমর্থক ও সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে হত্যার রামরাজ্য কায়েম করেছিল; হিন্দু মেয়েদের ধরে এনে মায়ের সামনে ধর্ষণ করেছিল, মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীদের হামলা মামলার মাধ্যমে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য করেছিল এবং আহসান উল্লাহ মাস্টার, এসএমএস কিবরিয়া মমতাজ উদ্দিন , খুলনার মঞ্জুরুল হকসহ তাদের ২৩ হাজার নেতা কর্মীকে হত্যা করেছিল, সর্বোপরি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ও হাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষ মদদে ইতিহাসের নৃশংসতম গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৩ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। ভাগ্যগুণে শেখ হাসিনা সে পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা থেকে রক্ষা পেলেও তিনি তার শ্রবনশক্তি হারিয়েছেন। প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছিল এখনো সে গ্রেনেড হামলার প্লিন্টার গায়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন ও দুঃসহ জীবন যাপন করছেন তার প্রতিশোধ নিতেন। আওয়ামী লীগ সাপ হলে ২০০৯ সালে ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে সেসব নেক্কারজনক হামলা হত্যা, ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের চরম প্রতিশোধ নিতেন। আওয়ামী লীগ সাপ নয় বলেই তারা সে প্রতিশোধ নিতে যাননি। যদি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ প্রতিশোধ নিতে চাইতো তা হলো বিএনপি ও তাদের মিত্র জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশে রাজনীতি করাই হয়তো মুশকিল হতো। আওয়ামী লীগ সেটা পারেনি বলেই এখন তারা আওয়ামী লীগকেই উল্টো সাপ বলে অভিহিত করছেন।

আমরা যদি একটু পিছন ফিরে তাকাই তা হলে বাংলাদেশে সাপের রাজনীতিতে কে শুরু করেছিল তা দেখতো পাব। পর্দার অন্তরালে থেকে কুখ্যাত খন্দকার মোশতাক, ফারুক-রশিদ ও ডালিমদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। খন্দকার মোশতাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল যে জেনারেল জিয়া তিনি স্বার্থসিদ্ধির পর গলাধাক্কা দিয়ে মোশতাককে ক্ষমতা থেকে বিতারিত করে পরবর্তীতে নিজেই স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট বনে যান। খন্দকার মোশতাক এর প্রতিবাদের (ডিএল) ডেমোক্রেটিক লীগ নামক দল গঠন করে জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বায়তুল মোকাররম মসজিদের গেইটে প্রথম জনসভা করতে গেলে জেনারেল জিয়ার দোসরা সে জনসভায় বেশ কটি বিষাক্ত গোঁখরো সাপ ছেড়ে দিয়ে ও বোমা হামলা করে সে জনসমাবেশকে পন্ড করে দিয়েছিল। আজ যারা পঞ্চাশ বয়স্ক রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি জীবিত আছেন তাদের সবারই সে ঘটনাটির কথা মনে আছে। তাই সত্যি কথা বলতে গেলে বেগম জিয়ার জেনারেল স্বামীই বাংলাদেশে প্রথম সাপের রাজনীতি চালু করেছিলেন।

কাজেই বিতর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেই বিএনপি নেত্রী মতে আওয়ামী লীগ সাপ, তা হলে তারা হলো ডোরা সাপ। আর বিষধর গোঁখরো কারা তা সবারই কমবেশী জানা। কাজেই কেঁচো খুড়তে গেলে সাপ বেড়িয়ে এলে তখন সাপ তত্বওয়ালাদের মুখ দেখানো পথ থাকবে না। আর শেখ হাসিনা যে খালেদা জিয়াকে সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা বলেছেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে তাঁর জনসংযোগের পথ সভাগুলোতে তাঁর গাড়িকে ঘিরে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের স্লোগান থেকেই। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেশের মানুষ গভীর উদ্বেগের সাথে প্রত্যক্ষ করেছে, বেগম খালেদা জিয়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে জনসংযোগের কর্মসূচি পালন করলেন তাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের দাবিতেই সোচ্চার ছিল জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। তাদের স্লোগানে স্লোগানে চাপা পড়ে গিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি। খালেদা জিয়া যেখানেই গেছেন সেখানেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার গাড়িকে ঘিরে দাবি করছিল যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের দাপটে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ির ধারে কাছেও ভিড়তে পারেনি বিএনপির প্রকৃত নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বরং শিবিরের নেতাকর্মীরাই সব সময় খালেদা জিয়ার গাড়ি ঘিরে রেখে স্লোগান দিয়েছেন ‘ঘেরাও ঘেরাও ঘেরাও হবে, ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও হবে।’ ঘেরাও হবে ঘেরাও হবে ভূয়া ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও হবে।’ ‘নিজামীর কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।’

বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার ছবিতেও শুধু দেখা গেছে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দাবি সম্বলিত পোস্টার ব্যানার ও ফেস্টুন। তাই সেদিন জামায়াত-শিবিরের দাপটে তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি নের্তৃত্বাধীন ১৮ দলের জনসংযোগ এক রকম ব্যর্থ হয়েছে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। কেননা, বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে জামায়াত-শিবির তাদের কর্মসূচি ঠিক মতো পালন করতে না পারলেও ১৮ দলীয় জোটের ব্যানের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে জামায়াত-শিবির তাদের শক্তি ও সামর্থ্যের মহড়া দিতে পারছেন সহজেই। এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেই হয়তো শেখ হাসিনা বলেছেন,‘বিএনপি নেত্রী সাপের ঝাঁপি’ মাথায় নিয়ে ঘুরছেন।

পরিশেষে এই বলেই শেষ করতে চাই, আমরা সবাই জানি ‘ঢিলটি ছুড়লে, পাটকেলটি খেতে হয়’ বিএনপি নেত্রী আওয়ামী লীগের ওপর যে ঢিল ছুড়েছেন, পাটকেল ছুড়ে শেখ হাসিনা হয়তো তাঁর জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তা না হলে দেশের নতুন প্রজন্মের সাধারণ মানুষ যে আওয়ামী লীগকে প্রকৃত সাপ বলেই মনে করবে।