ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

বাঙালি জাতির ঐতিহ্যময় ও গৌরবের ভাষা আন্দোলন এর মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতার উপর তার প্রকৃষ্ট প্রভাব অনস্বীকার্য। কেবল তাই -ই নয় ভাষার জন্য আন্দোলন করে এরূপ জীবন উৎসর্গ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

ভাষা আন্দোলন অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগনের গৌরবজ্জ্বল একটি দিন। এটি আমাদের কাছে ঐতিহ্যময় শহীদ দিবস । বিগত এক দশক ধরে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেও সুপরিচিত সারা বিশ্বে। জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষনা করায় বাঙালি জাতির জন্য এই দিনটি বাড়িত এক গর্ব বয়ে এনেছে সুনিশ্চিতভাবেই।

১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৯) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন দেশপ্রেমিক তরুণ ভাষার জন্য শহীদ হন। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে মহান মহীমায়।

বঙ্গীয় সমাজে বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালি মুসলমানের আত্ম-অম্বেষায় যে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে, তারই সূত্র ধরে বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার চরম প্রকাশ ঘটে।

ঐদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার ও আবদুস সালামসহ কয়েকজন ছাত্রযুবা হতাহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবী জানাজায় অংশগ্রহণ করে। ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা তৎকালীন সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানেরর অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ক্যানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙ্গালী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা দিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।

জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে (http://www.un.org/en/events/motherlanguageday/) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বদৌলতে আজ শোভা পাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যময় শহীদ মিনারের চিত্র। দেশপ্রেমিক বাঙালি মাত্রই এ চিত্র দেখে গর্বে গর্বিত হবেন। একই সাথে সেখানে এই দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভাষাআন্দোলনের ভূমিকাও উল্লেখিত আছে।

এখানে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারির মূল পাতার ভূমিকাটুকুর বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো। (অনুবাদ করেছি আমি মামুন ম. আজিজ, ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি)

“’মাতৃভাষার জাগরণে তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বের স্থানান্তরিকরণ লক্ষ্যমাত্রা রক্ষায় এবং জ্ঞানের সকল উৎস এবং প্রকাশের সকল রূপ এর জাগরণে উন্নয়নের সকল শক্তিকে সংঘব্দ্ধ করতে হবে। এগুলোই সেই সূতো যা মানবতার কারুকার্য বুনবে।’

ইরিনা বোকোভা, ইউনেস্কোর মহা-পরিচালক।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০১১ এর বাণী।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০১১: ভাষা এবং ভাষাজনিত স্থানান্তরিকরণের জাগরণ ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন তথ্য এবং যোগযোগ প্রযুক্তি

১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের শিক্ষা , বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক সংস্থা ( ইউনেস্কো) এর সাধারণ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর ঘোষনা দেয়া হয়। ( ৩০সি/৬২)

২০০৯ এর ১৬ই মে জাতি সংঘের সাধারণ সভা এর এ/আরইএস/৬১/২৬৬ নম্বর রেজ্যুলেশন এ সদস্য রাষ্ট্র সমূহের প্রতি “ বিশ্বের সকল মানুষের ব্যবহৃত ভাষাগুলোর সংরণ এবং উন্নয়নের ” প্রতি আহ্বান জানায়। ঐ একই রেজ্যুলেশন এ সাধারণ সভা বহুমাত্রিক ভাষার চর্চা ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতায়ন এর মাধ্যমে ডাইভারসিটিতে একতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার উন্নয়নের জন্য ২০০৮ সালকে আন্তর্জাতিক ভাষা বর্ষ হিসেবে ঘোষনা দেয়।
.
ফেব্রুয়ারি ২০০০ থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে পর্যবেক্ষণ করা হয় ভাষগত এবং সাংস্কৃতিক ডাইভারসিটি এবং বহুমাত্রিক ভাষার চর্চার উন্নয়নের জন্য। এই দিনটি ১৯৫২ সালের দিনটিকে প্রকাশ করে যখন ছাত্ররা তৎকালিন পাকিস্তানের দুটি জাতীয় ভাষার মধ্যে তাদের মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদ করে এবং পুলিশের গুলির শিকার হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নিহত হন।

ভাষা হলো আমাদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান ঐতিহ্য আর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপকরন। মাতৃভাষা বিস্তারের উন্নতিতে সকল প্রকার কর্ম কেবল মাত্র ভাষাগত ডাইভারসিটি এবং বহুভাষাগত শিক্ষার প্রতিই উৎসাহিতক করে না বরং বিশ্ব জুড়ে ভাষাগত সচেতনা ও সাংস্কৃতিক প্রথার প্রতি পূর্ণ সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং বোঝাপড়া, উদারতা ও কথা বার্তা উপর নির্ভর সহমর্মিতার প্রতি উৎসাহিত করে।”

দুঃখের বিষয়, যে বাংলা ভাষার ঐতিহ্যময় আন্দোলনের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করা হয়েছে সেই ভাষাতেই ওয়েবসাইটটি পড়া যায়না , যদিও ইংরেজী, রাশিয়ান, ফ্রেঞ্চ, স্পেনিস , আরবী , চাইনীজ ইত্যাদি ভাষায় ওয়েবসাইটটি পড়া যায় ঠিকই।

তবুও আমরা ভীষন গর্বিত নিঃসন্দেহে।

———————————————————————————————
ফিচার ছবিঃ নুরুর রহমান এর ফ্লিকার থেকে সংগৃহিত