ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

ময়মনসিংহে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত মাহবুবুল হক শাকিল বুধবার রাতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন কবরে। শহরের ভাটিকাশর পারিবারিক কবরস্থানে চির দিনের ঘরে তার লাশ শুইয়ে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি মাহবুবুল হক শাকিলের মরদেহ এ্যান্বুল্যান্সযোগে বুধবার বেলা আড়াইটায় ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারা নিজ বাসায় পৌঁছলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

mahbubul-hoque-shakil-last
পুত্রের অকাল মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ বাবা সত্তরোর্ধ পিতা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক এডভোকেট জহিরুল হক খোকা ও মা নুরুন্নাহার খানসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। শাকিলের ছেলেবেলার বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও সেসময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখতে ভিড় করেন বাঘমারার বাসভবনে।

বেলা পৌঁনে চারটার দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় টাউন হল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বাদ মাগরিব শহরের কাচিঝুলি কেন্দ্রীয় আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে ভাটিকাশর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজায় অংশ নেন ও ফুলদিয়ে শ্রদ্ধা জানান ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, ক্রীড়া উপ-মন্ত্রী আরিফ খান জয়, নাজিম উদ্দিন এমপি, এডভোকেট মোসলেম উদ্দিন এমপি, আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহীন এমপি, ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল এমপি, জুয়েল আরেং এমপি, আ’লীগের কেন্দ্রীয় নেতা অসিম কুমার উকিল, সাইফুজ্জামান শেখরসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

এদিকে শাকিলের অকাল মৃত্যুতে ময়মনসিংহের সর্বত্রই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুর খবর শুনে মঙ্গলবার থেকেই শহরের বাঘমারা নিজ বাসায় ভিড় করেন বাল্যবন্ধু, স্বজন, দলীয় লোকজনসহ সর্বস্তরের মানুষ। তার এই অকাল মৃত্যুকে কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

mahbubul-hoque-shakilgrave

ময়মনসিংহে লাশ আসার পর দাফনের আগে শহরের কাঁচিঝুলি আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লাশ এখানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কিছুক্ষণ রাখা হয়। এদিন তার প্রথম নামাজে জানাজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।

ময়মনসিংহের লতা চৌধুরী শাকিলের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি কলেজ রোডের বাসা থেকে বিলকিস নাজনিন প্রায়ই মোহাম্মা আলী রোডে যেতাম। নাজনিনের মামার বাসায়, কাছের বাসাটাই ময়মনসিংহএর আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিক ভূঁইয়ার বাসা, বাসার সামনে খোলা মাঠ, লম্বা বারান্দা, ফুট ফুটা ববছাঁটা চুলের টকটকা হলুদ ফর্সা সুইটি আর জেনিকে প্রায়ই বারান্দায় দেখতাম।

ওদের পাশের বাসাটাই আমার স্কুল বান্ধবি ডেইজির। ওর মধ্য দিয়ে সক্ষতা গড়ে উঠে সুইটি আর জেনির সাথে। আমরা খেলতাম জেনিদের মাঠে। একদিন জমে ওঠা খেলার মাঝে একটা রিক্সা এসে থামলো, দুই বোনই উল্লাস করে উঠলো কুলসুম খালা আর শাকিল এসেছে, ছোট হেংলা পাতলা একটা বাচ্চা ছেলে, দুই বোনই আদরে টানা টানি।

বিলকিসই বললো আপন ভাইনা তবু কি আদর। সেই প্রথম আমার শাকিলকে দেখা আমার থেকে আট বছরের ছোট হবে। এরপর কত কাল দেখিওনি জানিওনা।জেনি সুইটির সাথেও বেশী দেখা হতোনা। মোহাম্মদ আলী রোডে যেতে দিতনা আম্মা বলতো বড় হয়ে গেছো। সুইটি এরপর এসেছিল আমাদের বাসায়।

ওরা একেবারে চলে এলো ময়মনসিংহ ছেড়ে। শাকিলদের বাসা বাঘমারায়, ওর বাবাকে সমস্ত শহরের মানুষ চিনতো। আমি কিষ্টপুর। কোন এক কারনে আফাজ চেয়ারম্যান এর মেয়ে দের সাথে শাকিল এসেছিল আমাদের বাড়ি।

আমি তখন রনি শুচীকে নিয়ে ব্যাস্ত, উঠানে গাছভরা বড়ুই আফাজ সাহেবের মেয়েদের সাথে এ বাড়ীর সক্ষতার শেষ নেই, ওরা বড়ুই নিবে,শ্বাশুরী মা বললেন যতখুশী পেরে নাও। চিকন লম্বা বাঁশের কুটা দিয়ে শাকিল তার বোনদের জন্য গাছ খালি করে সব বড়ুই পেরে ফেললো।

অবাক বেপার, এক গামলা বড়ুই। পড়ে ভাগাভাগি করে মজার সে বড়ুই সবাই বিলি করে নিল। আর কোন দিন আমি সামনা সমনি বড় হলে শাকিলকে দেখিনি।ফেস বুকের কল্যানে কথা। ওর সব কবিতা লিখা আমি পড়তাম। ম্যাসেজে লিখতাম মিত্যুকে যখন ভয় পাচ্ছ আর একটু গুছিয়ে চলো।

লিভারে সমস্যা হসপিটালে ছুটে রিপোর্ট মন্দ আসেনি বলে আবার মন্দ ছুটাছুটি। আজকাল প্রায়ই কবিতার অংশ মিত্যু নিয়ে। আঁচ করেছিল কি বাঁচবেনা? তাই বলে মাত্র ৪৮বছরে বিদায়। মনের দিক থেকে এক উদার সৎ ভালো মানুষ ছিল।বাবা মাকে ভিষন শ্রদ্ধা করতো। মাত্র অল্প কটাদিন আগে মা কে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ করে পৌছে দিয়ে এলেন বাড়ী।

আর আজ নিজেই অসুস্থ নয় একেবারে মরদেহ হয়ে যাচ্ছে মা বাবার কোলে। বাবার কাঁথে ছেলের লাশ পাহাড় সমান ভার।আল্লাহ পরিবারের সকলকে এ শোক সইবার ক্ষমতা দিন।রাব্বুল আলআমিন শাকিলকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।

পমাহবুবুল হক শাকিলের মৃত্যুতে তার নিজ জেলা ময়মনসিংহে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পিত্রালয় ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারাস্থ ৩৮ নং প্রাণোচ্ছ্বল বাসভবনটি গতকাল মঙ্গলবার তার মৃত্যুর খবরে যেন শোকে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

এই বাসভবনে শাকিলের শৈশব কেটেছে। এখানে স্কুলজীবন এবং ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত শহরের আনন্দ মোহন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছেন শাকিল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে থেকে সততা ও নিষ্ঠার গুণে খ্যাতিমান কবি ও পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

শাকিলের পিতা অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক। মা নুরুন্নাহার খানম শহরের প্রিমিয়ার আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। ছোট ভাই রিপন দি ডেইলি স্টার পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক।

শাকিলের মৃত্যুতে ময়মনসিংহের সর্বত্র এসেছে শোকের ছায়া। এলাকার মানুষ তার এই মৃত্যুকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ পরিবারের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ছুটে আসেন ময়মনসিংহস্থ বাঘমারা ৩৮ নং রোডের বাসভবনে।

বাসভবনে আসা সকল মানুষের চোখেমুখে শোকের ছাপ। কোনো সাড়াশব্দ নেই পুরো এলাকায়। ভক্ত আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠে তার বাসভবন এলাকাটি। রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংগঠনসহ সকল শ্রেণির মানুষ বলছেন, প্রিয় মুখ শাকিল আমাদের কাছ থেকে এভাবে চলে যাবেন আমরা তা বিশ্বাস করতে পারছি না।

এবাসায় এসে বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন, ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, গৌরীপুরের এমপি মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ, বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহউদ্দিন, রেঞ্জডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, এডিশনাল ডিআইজি ড. আক্কাস উদ্দিন ভূইয়া, জেলা প্রশাসক মো: খলিলুর রহমান, জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক আ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, মহানগর আওয়ামীলীগ সভাপতি এহতেশামুল আলম, জেলা পরিষদ আওয়ামীলীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান পৌরসভার মেয়র ইকরামুল হক টিটু, শহর আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি আ্যাডভেকেট সাদেক খান তজু মিল্কি, আওয়ামীলীগ নেতা প্রদীপ ভৌমিক প্রমুখ।

কি হলো, কিভাবে হলো নানা প্রশ্ন– শাকিল বিষয় জানতে চাওয়ার পর, মেঝেতেই ছেলের নাম ধরে চিৎকার করে বসে পড়ছেন মা। বার বার ডুকরে ওঠছেন। বাবা-মা বলছেন, ও নানা স্বপের কথা বলত আমাদের। ও ছিলো আমাদের স্বপ্নের কারিগর। ওকেই কেড়ে নেয়া হলো।

মা মাথা ঠুকছেন আর অসংলগ্ন কথা বলে চলেছেন। বাড়ির সকল সদস্য শোকে নির্বাক। চোখের পানি মুছতে দেখা গেল বাড়িতে আসা প্রায় সকলকেই। পুত্রের মৃত্যু সংবাদ চারপাশটা শূন্য করে দিয়েছে। ঘরে টাঙানো ছেলের ছবি দেখিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে মা স্মৃতিচারণ করছেন।