ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

২০১০ এর পর থেকে বাংলাদেশ চীন থেকে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের জন্য পাঁচটা নৌযান বা জাহাজ, ২ টা করবেট  ট্যাঙ্ক, ১৬ টা ফাইটার জেট, সারফেস টু এয়ার এবং জাহাজ বিধ্বংসী মিসাইল কিনেছে, এবং সাম্প্রতিক সংযোজন হিসেবে এসেছে ২ টা সাবমেরিন। যেগুলো ভারতের জন্য এমুহূর্তে কোন হুমকিই বলে বিবেচিত নয়। তারপরেও ভারতীয় মিডিয়া ভারত মহাসাগরে এর সুদূর প্রসারী প্ৰভাব নিয়ে চিন্তিত। এনিয়ে কিছু টক শো এবং প্রিন্ট মিডিয়ায়াতে এক্সপার্টদের কলাম দেখে  মনে হচ্ছে ভারত একে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছে না।

চীনের ভূরাজনৈতিক উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে জরুরি জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভারত মহাসাগরে তার শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সাথে এ জোগাজোগ ভারত মোটেও ভাল চোখে দেখছে না। বাংলাদেশের নেভাল চিফ  সম্প্রতি চাইনিজ মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যনকে বাংলাদেশের তাইওয়ান নীতি, শিয়ানচেন হিমবাহ এবং তিব্বত প্রশ্নে চায়নার সাথে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করায় চাইনিজ জেনারেল তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

চীন আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের সর্বভৌমত্ত্ব এবং সীমানা নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করার কথা বলায় ভারত  এমনিতেই জড়িয়ে যাবে বলে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এদের মধ্যে ছিলেন কানোয়াল শিবাল (প্রাক্তন বিদেশ সচিব)। তার মতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এরকম একটা বন্ধুপ্রতিম দেশ  চিনের সাথে আন্ডার সি ডিফেন্স নিয়ে কাজ করাতে তিনি বিস্মিতই হয়েছেন। তিনি স্পষ্টই বললেন বাংলাদেশ যদি চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন না কিনে যদি রাশিয়ার কাছ থেকে কিনত এটা ভারতের জন্য অনেক কম সমস্যার ব্যাপার হতো। এছাড়া রাশিয়ান সাবমেরিন টেকনোলজি চিনের চাইতে অনেক উন্নত। কিন্তু এটাও ওনারা স্বীকার করেছেন যে অনেক কম দামে (২০৩ মিলিয়ন ডলার) কেনা হয়েছে।  ওনাদের বিস্ময়ের আর একটা কারণ হলো যেখানে সমুদ্র সীমা নিয়ে মায়ানমার বা ভারতের সাথে  বিবাদ মিটে গেছে সেখানে এ সাবমেরিন কেনার যৌক্তিকতা কতটুকু? বাংলাদেশ এটা কার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে  মিয়ানমার  না ভারতের বিরুদ্ধে, যেখানে সমুদ্র সীমা নিয়ে দুটো  রায়ই বাংলাদেশের পক্ষে গেছে।

বিনা সিক্রি (প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত) বলতে চেয়েছেন, চীন উদ্দেশ্যপূর্ণ ভাবেই ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করছে। ওনার মতে ২০০৯ এর পর থেকে বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিসে প্রো চাইনিজ বুরোক্রেসির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে বলে বাংলাদেশিরাও মনে করছে। ২০০৫ সালে খালেদা জিয়া অর্থনীতির ক্ষেত্রে চীনমুখী নীতি নিয়েছিলেন আর ২০১০ এ শেখ হাসিনা এটাকে আরো জোরদার করেছেন। এটা ওনার ভাষ্য। এটা যদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা আসতো তাহলে ভারত এটা নিয়ে মাথা ঘামাত না। কিন্তু যখন ডিফেন্স কপোরেশনের বা সামরিক সহযোগিতার কথা আসছে তখন ভারত অবশ্যই একে অন্য চোখে দেখবে বলে উনি মনে করছে। উনি বললেন যখন নিরাপত্তার বা জঙ্গিবাদ মোকাবেলার কথা আসে তখন ভারতের সাথে ডায়ালগের কথা মনে হয়, অথচ বাংলাদেশের পুরো সেনা এবং নৌ বাহিনীর যাবতীয় অস্ত্রই আসছে চায়না থেকে। উনি এও বলেছেন অতীতে জিয়া বা এরশাদের সময়ে পুরো আর্মি এবং নেভি কে চাইনিজ অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র বানিয়ে ট্রেনিং দেয়া হতো। এখনও আর্মিতে চায়নামুখি নীতি দৃশ্যমান।

ভারতের কাছে এটা একটা প্রশ্ন যে খালেদা জিয়া সরকারের সময় ইন্ডিয়াকে একটা হুমকি হিসেবে দেখা হত, তখন সাবমেরিন না কিনে এখন এই বন্ধু ভাবাপন্ন শেখ হাসিনার সরকার কেন এটা কিনেছে। কমোডর উদয় ভাস্কর (ডিরেক্টর, সোসাইটি অফ পলিসি স্টাডিজ, দিল্লি) বললেন, সাবমেরিনকে দেখা হয় সি ডিনায়াল বা সমুদ্র পাহারাদার হিসেবে আর এয়ার ক্রাফট কেরিয়ারকে দেখা হয় সমুদ্রে কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি বললেন, সব আসিয়ান দেশগুলোই  আন্ডারওয়াটারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ হচ্ছে এটার একটা সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত। একটা সার্বভৌম দেশ এ পলিসি নিতেই পারে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বিরাট অংশই রপ্তানিমুখী, যেটা অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। তাই রপ্তানিকে বিভিন্ন হুমকি থেকে সেইফগার্ড করতে গেলে নৌ শক্তির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যদি দৃশ্যমান ওরকম হুমকি ওনারা দেখছেন না। তারমতে ভারত মহাসাগরে চীন যদি তার ফুটপ্রিন্ট রাখতে যায় তাহলে সে বাংলাদেশ এবং পাকিস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইবে। এটা তাদের পরিকল্পনার একটা অংশ।

এখন প্রশ্ন এসেছে, এই সাবমেরিনকে পরিচালনা করতে তার বার্থিং (নিরাপদ দূরত্বে চালাতে) সুবিধা, মেরামতের সুবিধা এবং ব্যাটারি রিচার্জের জন্য বাংলাদেশিদের টেনিং দেয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক ট্রেইনারের দরকার হবে। এতে বলা যায় আদতে চাইনিজ নৌ বাহিনীই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করবে। এটাকে শিবাল একটা বড় প্ল্যানের অংশ হিসেবেই দেখছেন।

চীন পাকিস্থানকেও ৬ টা সাবমেরিন দিতে যাচ্ছে। চীন সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে চাইলেও ভারতের চাপে বাংলাদেশ চীনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় এবং ২০১৪ তে  শেখ হাসিনা যখন চীন সফরে যেয়েও ডিপ সি পোর্ট নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন নি, তখন ভারত বলেছে শেখ হাসিনা সরকার তাদের সংবেদনশীলতা কে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু পরে শেখ হাসিনা সোনাদিয়া থেকে একটু দূরে মাতাবাড়িতে  জাপানের সাথে  গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য চুক্তি করেন। এতে চিন খুশি না হলেও ভারত চটলো না। কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর আপাতত না করতে পারলেও চীন কিন্তু এই সাবমেরিনের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করছে বলেই ভারত মনে করে। আর  বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দুটো নৌ ঘাঁটির দূরত্ব হচ্ছে মাত্র ৫০০ নটিক্যাল মাইল। আর অদূর ভবিষ্যতে চীন যদি বাংলাদেশের সাথে  সাবমেরিন সংক্রান্ত যৌথ মহড়ার আয়োজন করে সেটা ভারতের জন্য আরো ভয়ের কারণ হবে।

মংলার অদূরে পায়রাতে যখন আবারো সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য চিন আগ্রহ দেখালো, বাংলাদেশ তখন পায়রার ব্যাপারে ডাচদের সাথে চুক্তি করলো। ভারতের সংবেদনশীলতাকে পুনরায় গুরুত্ব দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারটি ভারত চীনের  টাগ অফ ওয়ারে কারো দিকে না হেলার নীতিই নিতে চাইল। বিনা সিক্রির মতে খালেদা সরকার কার্যত ২০০৫ এ চীন কে  ডিপ সি পোর্ট করার অনুমতি দিয়েই ফেলেছিলেন। যেখান থেকে বাংলাদেশ এখন সরে এসেছে।

চীন বেশ ফলাও করে এটা প্রচার করেছে যে বাংলাদেশ সরকার, তিব্বত, তাইওয়ান, শিয়ানচেন, এমনকি দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সাথে অভিন্ন নীতি পোষণ করে। এতে ভারতের বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করে মোদি সরকার যে এব্যাপারে অখুশি সেটা পাবলিকলি বাংলাদেশকে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভারত সরকার এক্ষেত্রে কোয়াইট ডিপ্লোমেসিকেই বেছে নিয়ে, সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। সে বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে এতটা ক্রিটিকাল হতে চায় নি। শেখ হাসিনা তার আসন্ন ভারত সফরে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে যে সব ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছেন তাদের সম্মানে বক্তব্য দেবেন।  এটা  তার পূর্বমুখী রাজনীতিকে সচল রাখার একটা চেষ্টা।

দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়ে ভারত যখন আন্তর্জাতিক ফোরামে কথা বলতে চাইলো তখন চীন এটা তার অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছিল। আর একইভাবে ভারত বঙ্গোপসাগরকে তার এলাকা বলেই মনে করে। এখানে চীনের উপস্থিতি সে কখনোই মেনে নেবে না। তাই বলা যায়, পূর্ব এবং পশ্চিমের এই বিরোধে শেখ হাসিনার সরকারের উচিত দু দেশের কাছ থেকেই সুবিধা নেয়া এবং সময়মতো  চায়না কার্ড দেখিয়ে ভারতের লাগাম টেনে রাখা।