ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

নীল আর্মস্ট্রং গত শতাব্দীতে যখন চাঁদে পা রেখেছিলেন তখন তার উক্তিটি ব্যাপক ভাবে প্রচারিত এবং জনপ্রিয় হয়েছিল, this is one small step for a man and a giant leap for mankind. আর এ শতাব্দীতে এটাকে পরিবর্তন করে বলা হয়েছে “it’s  one small step of people and a giant leap for humanity”. আমরা যেটাকে জেন্ডার ইনক্লুসিভ ইংলিশ বলি।  housewife না বলে homemaker, fireman না বলে firefighter, businessman না বলে businessperson, তেমনি salesman হয়েছে  salesperson,  policeman হয়েছে police officer. ইংরেজি ভাষায় এখন পারতপক্ষে ম্যান, উইম্যান, হি, শি এসব যত কম ব্যবহার করা যায়, মানে বিশেষ কোন জেন্ডার যাতে ল্যাঙ্গুয়েজে প্রাধান্য না পায় তারই চেষ্টা চলছে।  ভাষার ক্ষেত্রে জেন্ডার প্রভাব যেমন কমিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে, তেমনি সেটা সব ক্ষেত্রেই হউক এটা চাওয়া নিশ্চয়ই অন্যায় নয়।

মোনেম ভাই,  সবকিছুই  একটা দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে  দেখেন,  তাৎক্ষণিক কোন সমাধান যে নেই, সেটা বলতে চান। অবশ্যই মানছি সেটা। উনি ঠিকই বলেছেন ভাষা, ঐতিহ্য চিন্তার ঐতিহাসিক প্যাটার্ন এসব থেকে বের হওয়া কঠিন। তবে এসবের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তার মধ্যেই তো মুক্তি। উনি উনার লিখায় জুৎসই স্যাটায়ারও করেছেন (ওড়না নিয়ে তর্ক, ইসলাম ধর্ম থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গিয়ে ঠেকেছে।)

ওড়না তো  অতি তুচ্ছ ব্যাপার। ওড়না পরা না পরার সাথে প্রগতিশীলতাকে জড়ান, প্রগতির পথে বৃহত্তর চলাকে কিছুটা হলেও স্তিমিত করে দেবে বলে মনে হয়। ওড়না যখন সংস্কৃতিতে মানে দিনের কাজে অপরিহার্য মনে হবে তখন পরবে আর না মনে হলে অন্য কিছুই সই। কিন্তু এ নিয়ে ওয়াজ নসিহতের কি কিছু আছে তাও আবার পাঠ্য বইতে। যে বয়সে বাচ্চাটি ‘ও’ তে ‘ওড়না পর’ পড়বে, তখন তার ওড়না পড়ারও বয়সও হবে না। সে আশেপাশে তার সমগোত্রীয়দের যখন ওড়না পড়া অবস্থায় দেখবে না, তখন এই ওয়াজ তার কাছে অন্তঃসারশূণ্যই মনে হবে।

রাজ্জাক ভাই, আরো সিরিয়াস। মোনেম ভাইয়ের লিখায় এক মন্তব্যে বলেছেন জেন্ডার বৈষম্যের পাঠ যদি নাই বা থাকে তাহলেই একসময় ছেলেমেয়ের মধ্যে যে বায়োলজিক্যাল ডিফারেন্স সেটাও ভুলে যাবো বলে বলেছেন। অনাবশ্যকীয়  কালচার ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞান।

পরিচ্ছন্নতা (স্বাস্থ্য সম্পর্কিত) খাদ্যাভ্যাসের মতো সার্বজনীন বিষয় গুলোর চাইতে, শালীনতার মতো অসার্বজনীন বিষয় গুলো সসময়েই গুরুত্ব পায় আমাদেরই কারণে। এ যেন মার্কিনি ইলেকশন, বেকারত্ব আর অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যায় ইমেইল আর ফিমেইল বিতর্ক।

সঙ্গত কারণেই শালীনতাকে সার্বজনীন ব্যাপার বলে মানছি না। এটা ব্যক্তির উপরই ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। দৃষ্টিভঙ্গি তো আলাদা হতেই পারে। ইউনিভার্সাল ড্রেস কোড কোন সীমিত পরিসরে যেমন কোন ক্যাম্পাস, বাণিজ্যিক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্ভব। কিন্তু তাই বলে সামগ্রিক সমাজে বৃহৎ পরিসরে কতটুকু সম্ভব? একটা পাবলিক প্লেসের কথাই ধরি না কেন, হতে পারে কোন শপিং মল বা বিপনী বিতান। সেখানে কি আমরা পোশাকের ভিন্নতা দেখছি না। যে যার ভ্যালুজ নিয়ে চলছে, এটাই তো প্লুরালিসটিক সমাজের চেহারা। তাছাড়া ছেলেদের শালীনতা নিয়েই বা ক’জন কথা বলি? ছেলেরা যদি বুকের বোতাম খুলে, হিপ হপ জিনস পরে, শোল্ডার সুইং করে হাটে তখন আমরা বলি হ্যান্ডসাম, অশালীন বলি না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হা করে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকাটাও হতে পারে অশালীনতা। ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের কারণে শরীরের ফ্যাট ডিস্ট্রিবিউশন হয়ে যায় ভিন্ন। যেটা আপনাকে করবে রাউন্ড এন্ড ফ্যাট, তার সাথে খাবারে নিয়ন্ত্রণ না থাকলে, পোশাকে কি হবে? এই বায়োলজিগুলো না ভাবলে মানবিক ভাবে চিন্তা করা সম্ভব নাও হতে পারে।

এর চেয়েও গুরুতর ব্যাপার ছিল জীবনানন্দের “আবার আসিব ফিরে” কবিতাটি বাদ দেয়া হয়েছে। এখানে নাকি জন্মান্তরের কথা বলা হয়েছে।  নিঃস্বর্গ, প্রকৃতির মাঝে বার বার ফিরে আসার কবি মনের আকুতি আজকাল ধর্মদ্রোহিতার সামিল।

হুমায়ুন আজাদের কবিতা টি পঞ্চম শ্রেণীর বইতে ছিল। ইংলিশ মিডিয়ামেও বাংলা বিষয়টি যেখানে বাধ্যতামূলক সেখানেও এটি পড়ান হত।  “যে বই তোমায় ভয় দেখায় সে বই কোন বই নয়” এর মানে এই না যে আমাদের ধর্মগ্রন্থ টির কথাই এখানে বলা হয়েছে। কিন্তু এই কবিতাটি বাদ দেয়ায় এটা তো পরিস্কার যে ধর্মগ্রন্থ টিই এখানে টেনে আনা হয়েছিল এবং গ্রন্থটি ভয়ই দেখায়!

নজরুলের মত কবিকে নিয়ে টানাটানি! ওনার “সজীব করিব মহাশ্মশান” বাদ দিয়ে সজীব করিব গোরস্থান রাখা হয়েছে। পেটেন্ট রাইটের মাধ্যমে তো এই বইয়ের সংকলক গুলোকে হাজতে পুরা উচিত।

সেদিন টিভিতে একটা  ক্লাস থ্রির বই দেখানো হয়েছে যার কলেবর খুবই কম, দেখানো  হয়েছে ১৪ জন সংকলক কে। এরকম একটা হালকা পাতলা বইয়ের এতগুলো সংকলক। এক দু’জন দিয়ে যে কাজ অনায়াসেই করা যায়। তাহলে এরকম কেন। কারণ স্বজন প্রীতি, আর অর্থ। সংকলকরা  ভালোই কামাই করেন। আমরা কি এই সিস্টেমে পড়ে আসি নি? তখন কি একটা বইয়ের ফি বছর এতো পরিমার্জন হয়েছে? উত্তর একেবারেই না। আমাদের বিদ্যা অর্জন কি এতে ব্যাহত হয়েছে? তাহলে এসব কেন হচ্ছে? ব্যাপারটা রাজনৈতিক। রাষ্ট্র কি কাউকে খুশি করতে চাচ্ছে? যেটা কাজি রাশেদ তার লিখায় স্পষ্ট করেই বলেছেন।

এসব প্রেস্ক্রিপশনাল শব্দ কি আমাদের মূল্যবোধকে বাড়িয়ে দেবে, যেখানে সার্বক্ষণিক মিডিয়া হাঁ করে আছে তার বাণিজ্যিক উপকরণ নিয়ে। তাহলে এসব কেন? এটা আমরা সবসময়ে দেখেছি টেক্সট বই থেকে মানুষ কিছুই শেখে না। শুধু পরীক্ষায় পাশের জন্যই পড়া। ইন্টারনেট যেখানে অবারিত, সেখানে সরকার কর্তৃক এসব উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংযোজন বাচ্চাদের মানসপটে কতটুকুই বা দাগ কাটবে?