ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

কিছু চিন্তাবিদ  বা সোজা বাংলায় বলতে গেলে বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে  প্রভাবিত হবার একটা ব্যাপার অন্য সবার মতো আমার মধ্যে সবসময়ই ছিল। সেটা দেশে এবং দেশের বাইরেও।  আহমদ ছফাকে আমি চিনেছি ওনার কিছু অনুসারীর মাধ্যমে। সেটা সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহার, বা আবুল কাশেম ফজলুল হক যেই হউন না কেন। বার বারই  একটা বই  এতবার আলোচনায় এসেছে, অনেকটা অমোঘ নিয়মেই বইটা পড়তে হয়েছে। বইটি হলো বাঙালি মুসলমানের মন। ফরহাদ মজহার বেশ কিছুদিন আগে থেকে এবং সলিমুল্লাহ খান হেফাজত প্রশ্নে সম্প্রতি  বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বটে কিন্তু বইটি পড়ার যে গুরুত্ব উনারা তৈরি করেছেন  সেটার জন্য  উনাদের প্রতি  যারপরনাই কৃতজ্ঞ । বইটি পড়লে অনেক কিছুরই  ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক সমাধান পাওয়া সম্ভব।

বইটির একদম শেষে এসে আহমদ ছফা এই সারমর্মই টেনেছেন –

মুসলমান সাহিত্যিকদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হয়তো চর্বিতচর্বণ, নয়তো ধর্মীয় পুনর্জাগরণ। এর বাইরে চিন্তা, যুক্তি এবং মনীষার সাহায্যে সামাজিক ডগ্‌মা বা বদ্ধমতসমূহের অসারতা প্রমাণ করেছেন তেমন লেখক-কবি মুসলমান সমাজে আসেননি। বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসা ভাবে অনেক কিছুই জানার ভান করে , আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙালী মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না। যেহেতু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশলাভ করছে এবং তার একাংশ সুফলগুলোও সে ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এঁচড়েপাকা শিশুর মতো। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোনো কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপন করতে জানে না। যখনই কোনো ব্যবস্থার মধ্যে কোনরকম অসংগতি দেখা দেয়, গোঁজামিল দিয়েই আনন্দ পায় এবং এই গোঁজামিল দিতে পারাটাকে রীতিমত প্রতিভাবানের কর্ম বলে মনে করে। শিশুর মতো যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে, তাই নিয়েই সে সন্তুষ্ট। দূরদর্শিতা তার একেবারেই নেই, কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামীকাল কি ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙালী মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতেই জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি-কালচার বলে পরিচিত করতেও কুণ্ঠিত হয় না।

আহমদ ছফার  মতে  বাঙালি মুসলমান তার  চিন্তার  সাবলকত্ত্বে উন্নীত হতে পারেনি । তাই উন্নত স্তরের সাহিত্য ,দর্শন বা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার স্ফুরণ ঘটেনি।  তিনি আরো বলেছেন যারা উন্নত বিজ্ঞান, সাহিত্য বা সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না তাদের দ্বারা উন্নত রাষ্ট্র সৃষ্টিও সম্ভব নয় । বইটির ভেতরে বলেছেন আর্যদের দ্বারা, ব্রাম্মনদের দ্বারা নির্যাতিত (দার্শনিক এবং আর্থিক), ইংরেজি শিখবে না বলে মরণপণ এ মুসলমান মোঘলদেরদের স্বজাতি (অন্তত ধর্মে) ভেবে তাদের দ্বারাও প্রত্যাখ্যাত হয়ে দিশেহারা হওয়াই ছিল তার ইতিহাস। তার মধ্যে কোন মুক্ত,স্বাধীন, চিন্তা গড়ে উঠেনি। সে হয়ত কাউকে অনুসরণ করতে যেয়ে এই উনুন থেকে ওই উনুনে নিজেকে নিক্ষিপ্ত করেছে।

তাই এই মুসলমান হেফাজতের দ্বারস্থ হবে, অথবা হবে কোন পীর ফকিরের। ইতিহাস তো তাই বলে। ইরানের মুসলমানরা যেমন তাদের স্বকীয়তায় বলীয়ান, আরবী মুসলমানের ভাষা, বা মোদ্দা কথায় বেহেশতী ভাষা হলেও তারা বর্ণমালাটিকে গ্রহণ করেছে মাত্র। নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে বেছে নিয়েছে অন্য ভাষাকে।

তাই একজন আবুবাকার  একটি  সাংস্কৃতিক  দাসত্বেরই বাই প্রোডাক্ট মাত্র। তারা মোমবাতি প্রজ্জলনকে মনে করে  হিন্দুয়ানী ব্যাপার, কিন্তু এটা যে অন্ধকারের মধ্যে আলো ছড়িয়ে দেবার একটা এলিগরী বা রূপক এটা বোঝার মত  সামান্য মুক্ত চিন্তাও তাদের নেই।

আজকে ব্রিটিশ ডেইলি মেইল  যখন  আবুবাকারকে নিয়ে লিখল  (রীতিমত হাইলাইট করে ), তখন আমরা নড়ে চড়ে উঠছি। একাংশ আবার একে একটা স্বীকৃতি মনে করে প্রশান্তিতে আছি। একবারও কি দেখেছি  এটা একটা রক্ষনশীল পত্রিকা, এরা  এ ধরণের চিন্তারই প্রচারক। আজকে যদি  লেবার সমর্থক  গার্ডিয়ান এটা করতো তাহলে আলোচনার ব্যাপার হত। এই ডেইলি মেইল মেলানিয়ার  অতীত জীবন নিয়ে কথা বলে ক্ষমা চেয়ে এখন জরিমানা গুনছে। মনে রাখতে হবে মেলানিয়ার অতীত এসকর্ট জীবন ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে যায়।  আর বিদেশি যেনতেন মিডিয়া কিছু বললেই আমরা নড়ব এটাও একটা দৈন্যতা।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের  একটা সাক্ষাৎকারে আবুবাকার বলছিলেন যখন মল্লিক ব্রাদার্স এ তিনি বই বিক্রির কাজ  করতেন তখন তিনি তরুণ তরুণীদের লক্ষ্য করতেন, তাদের আবেগ ওনাকে স্পর্শ করত।  আমরা জানি  এই আবদ্ধ সংস্কৃতির ঘেরাটোপে ধর্ম একটা ব্যবসা সফল জিনিষ, আর এর সাথে যদি যৌনতা যোগ হয়  এবং তাও যদি হয় সুড়সুড়ির আকারে, তাহলে তো কথাই নেই ।

এই আবুবাকারের তরুণ তরুণীরা  সমাজ পরিবর্তন এ কোন অবদানরাখবে না এটাই স্বাভাবিক। এরা মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ বা বিজ্ঞান মনষ্কতা দিয়ে তাড়িত নয়। এরা ধর্মীয় আচারের ভাসা ভাসা ব্যাপারেই জীবন যাপনের স্বার্থকতা খোঁজে ।

নারীদের হিজাবকে আমি একটা নিরাপত্তাহীনতা থেকে নিজেকে রক্ষার কৌশল হিসেবেই দেখতে চাই। যেখানে স্বয়ং রাষ্ট্রই  ইভটিজারদের থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে বাল্যবিবাহকে জায়েজ করে , বিকেল পাঁচটার পরে উৎসবের দিনেও ঘরে যেতে বাধ্য করে সেখানে নারীর হিজাব ছাড়া উপায় কি!  আর এই প্রচণ্ড আদ্র আবহাওয়ায়  চুলের গোড়া ঘেমে এবং তা না শুকিয়ে  অকালেই চুল পড়ে যাওয়ার যে অবস্থা  তৈরি হয় সেটা হিজাব পরিধান করা নারী মাত্রই বোঝেন।  একজন আবু বাকার সেটা হয়ত বোঝেন না। দু’হাজারের পর থেকে বিশেষ করে এই সেক্যুলার সরকারের সময়ে রাষ্ট্রকে যতটা  ইসলামিকরণ বা ইসলামাইজড করা হয়েছে সেটা  স্বৈরাচার  এরশাদের সময়েও হয়নি । সে জন্যই  শহুরে নারীদের মধ্যে  হিজাবের বাহুল্য , রাষ্ট্রের ধর্ম চিন্তার মধ্যেই নিহিত ।

একজন আবুবাকারের সাহিত্য নিয়ে  আলোচনা আমার লিখার লক্ষ্য  ছিল না । ওনার লেখার পেছনে যে মনস্তত্ব এবং এর জনপ্রিতার কারণ সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি মাত্র। আমার কাছে  একজন আবুবাকারের  সাহিত্য  একটা  সাংস্কৃতিক দাসত্বের  উপজাত ছাড়া আর কিছুই নয় ।