ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

image-13537

প্রধান বিচারপতিকে শান্তি কমিটির মেম্বার বানানোর পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তিনি ১৮ই আগস্ট  নিউজ২৪ এর টক শোতে  বলে বসলেন বিচারপতি সিনহা  শান্তি কমিটির মেম্বার হয়ে পাকিস্তান আর্মিকে সাহায্য করেছেন। এর তদন্ত হওয়া উচিত। এরো আগে ডিবিসি নিউজের ১৫ই মার্চের একটা  শোতে তিনি বলৃলেন বিচারপতি  সিনহা একজন স্বঘোষিত রাজাকার এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একজন চরিত্র।

২০১৪’তে যুদ্ধপরাধী কামারুজ্জামানের শুনানি চলাকালে তার আইনজীবী বলেছিলেন কিভাবে একজন পিস কমিটির মেম্বারের বাসায় একজন মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন জাস্টিস সিনহা চার সদস্যের আপিল ডিভিশন বেঞ্চে ছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন তখন প্রতি পরিবারে একজন করে আওয়ামী  লীগ সাপোর্টার আর একজন করে পাকিস্তানের সমর্থক বা পিস কমিটির মেম্বার থাকতেন। দিনে তারা পিস কমিটির সাথে ওঠা-বসা করতেন আর রাতে সেসব তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের পাচার করতেন। বিচারপতি হাসান ফয়েজ ঐ চার সদস্যের বেঞ্চে ছিলেন তাৎক্ষণিক ভাবে তিনিও বলেছেন রাজাকারের লিস্টে নাম লিখিয়ে অনেকেই তাদের অস্ত্রগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন।

জাস্টিস মানিক চিফ জাস্টিসের ৭১ এর ভূমিকা নিয়ে কেন এই অর্ধসত্য বললেন এবং পুরো সত্য থেকে বিরত থাকলেন এর কারণ খুঁজতে হবে।

জাস্টিস মানিকের অবসরে যাওয়া নিয়ে চিফ জাস্টিসের সাথে তার দ্বিমত তৈরি হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী মানিকের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে ১লা অক্টোবর ২০১৫ তে অবসরে যাওয়ার কথা। এজন্য ওনাকে  শেষ কিছু সপ্তাহ কোন বেঞ্চে রাখা হয়নি। ওনার ওপর ৬৫টা মামলার রায় দেয়ার দায়িত্ব ছিল। তাই এই পেন্ডিং মামলাগুলোর রায় দেয়ার জন্য ওনাকে এই এক্সক্লুসিভ সময়টুকু বেঁধে দেয়া হয়েছিল। নিয়ম মাফিক আগস্টের শেষ সপ্তাহে চিফ তাকে চিঠি মারফত জানান, অবসরের সুযোগসুবিধাগুলো পাওয়ার জন্য ওনার পেন্ডিং মামলার রায়ের কাজগুলো শেষ করা উচিত। জাস্টিস মানিক কয়েকদিন পর পাল্টা চিঠি দিয়ে চিফের কাছে ওনার পাঠানো চিঠির  যৌক্তিকতা জানতে চান। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চিফ জাস্টিস আবারো চিঠি দিয়ে জাস্টিস মানিককে মামলার কাজগুলো শেষ করতে বলেন। জাস্টিস মানিক এর কয়েকদিন পর পাল্টা চিঠিতে চিফকে জানান যে তিনি যা করছেন তা সংবিধান লঙ্ঘনের সামিল। এরপর তিনি আরো ক্রোধান্বিত হয়ে অবিশ্বাস্যভাবে (সম্ভবত বাংলাদেশে এই প্রথম) রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধান লঙ্ঘনের কারণে চিফ জাস্টিসের পদত্যাগ দাবি করে বসেন।

ওনার বক্তব্য হল, আর্টিকেল ১০৭(৩) অনুযায়ী চিফ জাস্টিস বেঞ্চ গঠন করে দেন। কিন্তু সংবিধান তাকে ক্ষমতা দেয়নি একজন সিটিং জাজকে সরানোর। কারণ হিসেবে তিনি বলেন কিছু মামলার সিটিং জাজ তিনি ছিলেন এবং ওগুলোর শুনানি চলছিল। এরকম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে  চিফ জাস্টিস তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। চিফ জাস্টিসের প্রতি তার ব্যক্তিগত বিরাগের কারণে অনেক জাজই তার সমালোচনা করেছিলেন। অবসরে যাওয়ার পাঁচ মাস পর ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তে উনি সেই ৬৫টি মামলার কাজ শেষ করেন।

চিফ জাস্টিসের সাথে তার পুরোনো হিসেব চুকাতে জাস্টিস মানিক সরকারের সাথে জাস্টিস সিনহার টানাপোড়েনের এই মোক্ষম সময়টিকে বেছে নেন।

চিফ জাস্টিস সিনহাকে শুধু শান্তি কমিটির সদস্য বানিয়েই তার সাধ মিটছিল না। গত শনিবার উনি বললেন চিফ জাস্টিস কি আদৌ ষোড়শ সংশোধনীর এমেনমেন্ডের রায়টা লিখেছেন কিনা! উনি অবাক হয়েছেন মাত্র ২৫ দিনে কি করে ৪০০ পৃষ্ঠার রায় লেখা সম্ভব!  এ রায় আগেই লেখা হয়েছিল প্রথমে উনি আইএস লিখেছে বলে জানালেন। পরে শব্দ চয়ন দেখে বলেন কোন ভেস্টেড গ্রুপ বা স্বার্থান্বেষী মহল এটা লিখেছে। পরে ইঙ্গিতে ডেইলি স্টারকেই বোঝাতে চাইলেন। ব্যাপারটা সরকারি এমপি, মন্ত্রীরাও লুফে নিলেন। কারণ বিরোধিতার জন্য  ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, আইএস, পাকিস্তান,  তাদের কাছে খুব পছন্দের শব্দ। জাস্টিস মানিক ও তাদের খাইয়েছেন এই শব্দগুলো দিয়ে। মন্ত্রী এমপিদের কাছে যে শব্দগুলো পছন্দের, জনগণের কাছে এখন সেটা ক্লিশেইড (বহুল ব্যবহারে আক্রান্ত)।

স্বাধীনতার এত বছর পর পাকিস্তান পাকিস্তান বলে চ্যাঁচানোকে জনগণ তার আসল সমস্যাগুলোকে আড়াল করানোকেই বোঝে। সেজন্যই আওয়ামী লীগ প্রধান বিচারপতির মূল পর্যবেক্ষণ (মানি লন্ডারিং, ব্যাংকিং খাতে ধস, অপরিপক্ক সংসদ, সীমাহীন দুর্নীতি) নিয়ে সুবোধ বালকের মতো চুপচাপ আছে। বলছে শুধু ক্লিশেইড পাকিস্তান নিয়ে, পিস কমিটি নিয়ে। এমনকি ফাউন্ডিং ফাদার নিয়েও চিফ জাস্টিস বিতর্কে জাননি। বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ কারো একার নেতৃত্বে হয়নি। যেটা প্রধানমন্ত্রীও তার বক্তৃতায় বলেছেন আপামর জনগণের কথা। এ নিয়ে অহেতুক বিতর্কে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের পেইড এমপ্লয়ি এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ফাউন্ডিং ফাদার নিয়ে রাজনীতি করছে আওয়ামী লীগ।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে যাওয়ার জন্য নওয়াজ শরিফ কে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। তার পার্টি (পিএমএল-এন) কিন্তু এখনো ক্ষমতায়। অনেকে বলছে আর্মি চেয়েছে তাই এটা হয়েছে। এটা হলে তো আর্মি ক্ষমতায় আসত। সেটা তো হয় নি। এরকম ঘটনা আগেও হয়েছে। ২০১২ তে সুপ্রিম কোর্ট  প্রধানমন্ত্রী গিলানিকে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টর স্বামী জারদারি কে (দুর্নীতির মামলায় অভিজুক্ত) সমর্থন  করার অভিযোগে সরে  যেতে বলায় উনি পদত্যাগ এ বাধ্য হয়েছিলেন। নওয়াজ শরিফ ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেও থাকতে পারেন নি। আর  চিফ জাস্টিস যখন পাকিস্তানের এই ভালো উদাহরণ টি  টানলেন অমনি জাত গেল জাত গেল বলে স্লোগান তুলল  সরকারি দলটি! পাকিস্তান নামক দেশটির ভালো নজির থাকলেও উল্লেখ করতে নেই, যদি সেটা নিজের  বিরুদ্ধে যায়। আপনি রাজাকার, পাকিস্তানপ্রেমী এসব অভিধায় চটজলদি অভিযুক্ত হয়ে যাবেন। যেটা চিফ জাস্টিস সিনহার ক্ষেত্রেও হয়েছে। চিফ জাস্টিস কে এসব অভিধায় অভিযুক্ত করার জন্য এমপি বা মন্ত্রীদের  কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। কারণ বিচারপতিদের কোন দল থাকতে নেই। ওনারা রাস্তায় নেমে মিছিল, মানব বন্ধন করবেন না। তাই যত পারা যায় বলো। এই সরকারই ১৩ জন পাকিস্তানীকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিয়েছেন।

বিচারপতি সিনহার পর্যবেক্ষণে সরকারের স্ববিরোধিতার আরেকটি নজির উঠে এসেছে। এ সরকার  সেনা (জিয়া)  সরকারের সময় করা হয়েছে বলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (যেটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিয়েছিল) বাতিল করেছে কিন্তু জিয়ার বিসমিল্লাহ আর এরশাদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঠিকই রেখে দিয়েছে।

আজকে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বিএনপি আস্ফালনও সরকারের গাত্রদাহের কারণ। অথচ প্রধান বিচারপতি জিয়ার আমলকে ব্যানানা রিপাবলিকের (একনায়কের দ্বারা চালিত) সাথে তুলনা করেছেন। আর এটা কে না জানে ২০০১ এর বিএনপি সরকার বিচার বিভাগকে আলাদা করার বিলটি বার বার আলোচনায় এনেও দীর্ঘ সময় এটা ওটা করে পাশ কাটিয়ে গেছে। পরে ২০০৬ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে তাকে বাস্তবায়ন করেছে। আজকে তাই মির্জা ফখরুল বা রিজভী দের  বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মায়াকান্না হাসির খোরাক জোগায়।

আজকে বিচারপতি সিনহা যদি বলে থাকেন সব প্রতিষ্ঠান ডুবে গেলেও বিচার বিভাগ কোন রকমে নিমজ্জিত অবস্থায় নাক উঁচু করে শ্বাস নিচ্ছে, এটা কি খুব ভুল বলা হবে?
তথ্য সূত্র: ডেইলি স্টার। ৩১.৮.২০১৭