ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

নানা বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও অন্তত একটি বিষয়ে ঐকমত পোষণ করেছেন বার্নি স্যান্ডার্স ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁরা দুজনেই বলেছেন, ব্যবসার বেসাতি আমেরিকার স্বপ্নকেই হত্যা করছে। এ জন্য তাঁরা দুষছেন ওয়াশিংটনকে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতিমালা সম্পর্কে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করেছেন এই দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী–‘মধ্যবিত্ত সমাজকে একটি গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে এইসব নীতিমালা; এমনকি এসব নীতির কারণে চাকরিও খোয়াচ্ছে মার্কিনিরা।’

গত বছর মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম সিএনএন আয়োজিত এক বিতর্কে অংশ নিয়ে বার্নি স্যান্ডার্স ও ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন।

কিন্তু প্রকৃত সত্য আসলে কী? যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিই কী সেই বিষবৃক্ষ?

চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে নাফটা চুক্তির মতো বাণিজ্য চুক্তিগুলোর কঠোর সমালোচনা করছেন ট্রেড ইউনিয়ন ও বামপন্থী চিন্তকরা। অন্যদিকে কনজারভেটিভরা, বিশেষ করে মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, এই বাণিজ্যনীতির ফলে দৃশ্যত লাভবানই হয়েছে মার্কিনীরা।

আসলেই কী লাভবান হয়েছে? প্রকৃত সত্য সম্ভবত অন্য কোথাও। বিদেশিদের সরাতেই মূলত কারখানাগুলোকে বন্ধ করতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। আর এই সিদ্ধান্তকেই এক শ্রেণির মানুষের ওপর আঘাত বলে মনে করছেন বামপন্থীরা। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববাণিজ্যের শর্তগুলোর কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি মোটেও কোনো সমস্যার মধ্যে পড়ছে না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার বিভাগের অধ্যাপক রবার্ট লরেন্স বলেন, ‘বাণিজ্য একটি অনুঘটক বটে, তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

160309175241-trade-costing-jobs-780x439

এই কথা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মধ্যবিত্তদের চাকরির বাজার কেন সংকুচিত হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবিত্তের সংখ্যা এখন মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম। এটা এখন ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৭১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬১ শতাংশ। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি অর্থনীতির মই বেয়ে নিচ থেকে উপরে উঠতে চায়। আর এটা করতে গিয়ে বেশিরভাগ মানুষ নিম্নবিত্তের কাতারে পড়ে যায়।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির অধ্যাপক এডওয়ার্ড লেমার বলেন, একটা সময় পণ্য উৎপাদন কারখানাগুলো ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের পথ। ষাটের দশকে ২৮ শতাংশ মার্কিনীরা পণ্য উৎপাদন কারখানায় চাকরি করত। সেটা কমতে কমতে বর্তমানে এসে ঠেকেছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে।

এখন অভিযোগ করা হচ্ছে, বাণিজ্যনীতি, বিশেষত: নাফটা চুক্তি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের অন্তর্ভূক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কারখানাগুলোয় চাকরি হ্রাসকরণকে তরান্বিত করেছে।

কিন্তু পরিসংখ্যান তা বলে না। পরিসংখ্যান বলছে, কারখাগুলোয় চাকরির ক্ষেত্র আরও বেড়েছে। ১৯৯৪ সালে নাফটা চুক্তির পরের ছয় বছরে ২৩ মিলিয়ন পদ সৃষ্টি হয়েছে। লরেন্স আরও বলেন, ২০০১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত কারখানাগুলোয় চাকরির ক্ষেত্র সংকুচিত হয়নি।

এদিকে চীন এক গবেষণায় দেখিয়েছে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কারখানাগুলোয় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন চাকরির পদ সংকোচন করা হয়েছে। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার অর্থনীতির অধ্যাপক জন ম্যাক লারেন বলেন, আমেরিকান কর্পোরেটজীবীরা ইতিমধ্যে চাকরির খোঁজে অপেক্ষাকৃত কম বেতনের দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। চীনের কারখানাগুলো (সোয়েটার থেকে শুরু করে আইফোন তৈরির কারখানা) কম বেতনের শ্রমিক খুঁজছে। এমন কারখানায় যোগ দিচ্ছে অনেকেই।

যে যাই বলুক, সবচেয়ে বড় ঘাতকের নাম প্রযুক্তি। যদিও পণ্যকে সামনে এগিয়ে দেয় প্রযুক্তি, কিন্তু এই প্রযুক্তিই আবার পণ্যের উৎপাদন খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়। মনে রাখা দরকার, আজকের দিনে চাকরির শর্ত হিসেবে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কারিগরি দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

 

লেখক : জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, সিএনএন
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : মারুফ ইসলাম
সূত্র : সিএনএনমানি