ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

প্রবল বেগে হাওয়া বইলে তার ঝাপটা গায়ে এসে লাগে— এটাই স্বভাবিক। হাওয়া বইছে, তরুণরা কিচ্ছু লিখতে পারে না। তারা সাহিত্যের নামে ছাইপাশ উৎপাদন করছে! এদের হাত থেকে কলম কেড়ে নেওয়া উচিত।

এই হাওয়ায় সবাই মুষড়ে পড়লেও আমি পড়ি না। হাওয়া থেকে গা বাঁচিয়ে হাতের আড়ালে প্রদ্বীপের সলতে বাঁচানোর মতো করে নিজের পাঠচর্চা জারি রাখি। খুঁজে খুঁজে তরুণদের লেখাই পড়ি। বুঝতে কোশেশ করি, যে হাওয়া বইছে তা সত্যিই প্রাকৃতিক নাকি গুজবসৃষ্ট।

মাঝে মাঝে এমন হয়, কারো কারো লেখা পড়তে বসে দু’ছত্র এগোনোর পর আর পারি না। দুর্বল পাঠক আমি, তাই হয়তো শরীরে কুলোয় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, হাওয়া তো ঠিকই বইছে, যা রটে তা কিছুটা বটে! তবে হঠাৎ হঠাৎ চমকে ওঠার মতো ঘটনাও ঘটে। এই যেমন আজ এক লেখকের নতুন পরিচয় উদ্ধার করে রীতিমতো চমকে উঠি।

আহমেদ খান হীরক। এতদিন আমার কাছে তাঁর পরিচয় ছিল ‘রম্যলেখক’ হিসেবে। আজ জানলাম তিনি রম্যের বাইরেও ছোটগল্প লেখেন এবং শুধু লেখেন না, অসাধারণ ছোটগল্প লেখেন। এই নতুন পরিচয় উদঘাটনের পর আমি চমকে উঠি সহসাই।

হীরকের একটিমাত্র গল্প পড়লাম আজ। নার্গিসের কয়েকটি মৃত্যু গল্পের নাম। প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্য পোর্টাল গল্পপাঠ ডটকমে। গল্প পড়ে মনে হলো, হীরকের গল্পের ভাষা হীরক খণ্ডের মতোই দ্যুতিময়। ছোট ছোট বাক্য, কিন্তু বাক্যের ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার মতো। হীরককে আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি গল্পের ঘুরি ওড়ানো সেই বালক, যিনি তার হাত থেকে কখনোই নাটাই বেহাত করেন না। একটু একটু করে শুধু সুতো ছাড়েন আর পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে বেড়ান অনন্তে। গল্পের নামকরণের মধ্যেই রয়েছে তার প্রমাণ।

Capture

নার্গিসের কয়েকটি মৃত্যু নাম পড়েই বোঝা যায় নার্গিস নামের কেউ একজন একাধিকবার মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু কীভাবে সেই সব মৃত্যু ঘটেছে তার সুতো হীরক পাঠকের সামনে একবারে ছাড়বেন না, একটু একটু করে ছাড়বেন- এটা শুরু থেকেই বোঝা যায়। হীরকের মুনশিয়ানা এখানে যে, কখন কোন প্যারায় কতটুকু সুতো ছাড়তে হবে তা তিনি বেশ ভালোভাবেই জানেন। ফলে পাঠক এক মুহূর্তের জন্যও অন্যদিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ পায় না। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই মুনশিয়ানার ফলে হীরকের গল্প কোথাও এক মুহূর্তের জন্যও ঝুলে পড়েনি।

গল্পের অ্যাখ্যান বা পটভূমিতেও অভিনবত্ব আছে। একজন নারী, নার্গিস যার নাম, তিনি লেখকের স্ত্রী বটেন। গল্পলেখক জানাচ্ছেন, নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের পর তারা বেড়াতে যান গ্রামে। সেখানে পুনর্ভবা নদীতে ডুবে মারা যান নার্গিস, যদিও তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় না। এর দিন সাতেক পর গল্পকথক ঢাকায় ফিরে এসে নিজের ডেরায় ঢোকার পর দেখতে পান নার্গিস নিজের বিছানায় কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছেন। স্বামীর উপস্থিতি টের পেয়ে বলেন, এখন আসলা?

বিস্মিত গল্পকথক বুঝে উঠতে পারেন না, ঘটনা কি! এভাবে আরও বার কয়েক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে নার্গিসের। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে আবার ফিরে আসে সে।

বস্তুতঃ বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়। একজন মৃত মানুষের ফিরে আসা অলৌকিক, জাদুময় এবং পরাবাস্তব। তবু সেই ঘটনাই যখন সাহিত্যে ঘটে তখন সেই সাহিত্যকে বলা হয় পরাবাস্তব সাহিত্য। কেউ কেউ বলছেন, উত্তরাধুনিক সাহিত্য। বলা হয়, পরাবাস্তব গল্প সবচেয়ে বেশি প্রাণ পেয়েছে লাতিন সাহিত্যের কিংবদন্তী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের হাতে। বাংলাদেশে উত্তরাধুনিক সাহিত্যের চর্চাকারী হাতেগোনা। তাঁদের মধ্যে সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের বেশ নামডাক হয়েছে বলে পত্র-পত্রিকা মারফত জানা যায়। কিন্তু তরুণ সাহিত্যিকদের মধ্যে তথৈবচ তথৈবচ। সেই অভাব পূরণে কি এগিয়ে এলেন আহমেদ খান হিরক? তিনি কি হতে পারবেন বাংলার মার্কেজ? সময়ের কাছে প্রশ্নটি জমা থাক বরং। সে-ই উত্তর দেবে সময়মতো।

সাহিত্য নাকি সমাজের দর্পন। সময়েরও আয়না সে। লেখক সাহিত্যের আয়নায় দেখাতে চান সময় ও সমাজকে। পাঠককে দিতে চান সুস্পষ্ট বার্তা। নার্গিসের কয়েকটি মৃত্যু গল্পে লেখক কী বার্তা দিলেন তা অবশ্য বোধগম্য হয়। তিনি শুধু হিরকোজ্জ্বল ভাষায় ঘটনার পরম্পরা বর্ণনা করে গেছেন। পাঠকের পাওনা এটুকুই যে, হীরকের গল্পবয়ান নিষ্প্রাণ ও খরখরে নয়। গল্পপাঠের সময় পাঠকের আত্মা দুলে ওঠে নিঃসন্দেহে। এই দুলে ওঠাকেই হয়তো এক কালের প্রথিতযথা লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে।’ হীরক সফল, তিনি মানবাত্মা নিয়ে খেলা করতে পেরেছেন।

সবমিলিয়ে, কেন জানি মনে হচ্ছে, হীরক বাংলা ছোটগল্পে খুব দ্রুতই হীরার টুকরার মতো ঔজ্বল্য ছড়াবেন। হীরকের জন্য শুভকামনা।