ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

কবিতার শিরোনাম দেখে মগজ তড়পায়। স্মৃতির খোপে ডানা ঝাপটায় স্মরণের পায়রা। ‘প্রতীক্ষা’ অথবা ‘অপেক্ষা’ শিরোনামে একের পর এক গল্প, উপন্যাস, সিনেমা, গান, কবিতার নাম মনে পড়তে থাকে। প্রতীক্ষা এবং অপেক্ষা এমনই শব্দযুগল যা নিয়ে প্রায় সব লেখকই কিছু না কিছু লিখেছেন। বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে। তিনি লিখেছেন এক অস্তাচলগামী সূর্যের হাহাকার—

‘সকল বেলা কাটিয়া গেল

বিকাল নাহি যায়

দিনের শেষে শ্রান্ত ছবি

কিছুতে যেতে চায় না রবি

চাহিয়া থাকে ধরণী পানে

বিদায় নাহি চায়।’

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অপেক্ষা, মানসী)

মনে পড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। তখন সুনীলে বিলীন হয়ে থাকি অষ্টপ্রহর। নীরা কিংবা বরুণার জন্য করুণা পুষে রাখতে রাখতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াই অপেক্ষা শিরোনামের কবিতার সামনে। হায়! সুনীল তবে নীরা ও বরুণার বাইরেও কোনো একজনের জন্য অপেক্ষা করেন? কে সে?

‘সকালবেলা এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম একজন বৃদ্ধ আন্তর্জাতিক

ফরাসীর সঙ্গে দেখা করার জন্য, যিনি নিজের শৈশবকে ঘৃণা

করেন।’

(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অপেক্ষা, জাগরণ হেমবর্ণ)

চকিতে মনে পড়ে যায় রফিক আজাদকে।‘প্রতীক্ষাই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ… আমরা কী একে অপরের জন্য প্রতীক্ষা করব না?’— এই পঙক্তিগুলো কতশত আসরে কিংবা নিরালায় উচ্চারণ করে গেছি কত-কতবার তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে?

হেনরিক জ্যাকসনকে মনে পড়ে যায়। জার্মান এ কবি লিখেছেন—

‘রাত কখনো পায়না দিনের নাগাল,

শীতের সাথে গ্রীষ্মের দেখা হয় না কোনো দিন,

তবু তারা পরস্পরের দুরত্ব আর বৈপরীত্য নিয়ে

প্রবন্ধ রচনা করে,

রাত আর দিনের মাঝখানে অপেক্ষা ঘর

সেইখানে ভোর আর সন্ধ্যার নিত্য কলহ।’

(হেনরিক জ্যাকসন, অপেক্ষা ঘর, ওয়ার্টেজিয়াম)

কবিতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে এবার গল্প-উপন্যাস ঝাঁক বেঁধে এগিয়ে আসতে থাকে। প্রথমেই মনে পড়ে ‍হুমায়ূন আহমেদের ‘অপেক্ষা’ কে। এই উপন্যাস পড়ে কত দিন বিকেল বেলা উদাস বদনে বসে ছিলাম বাড়ির পাশের পুকুর পাড়ে, মনে নেই। শওকত আলীর অপেক্ষা’, শীর্ষেন্দুরঅপেক্ষা’, মঞ্জু সরকারেরঅপেক্ষা’, মঈনুল আহসান সাবেরের আদমের জন্য অপেক্ষা, সেলিনা হোসেনেরঅপেক্ষা’ কিংবা আহমাদ মোস্তফা কামালের আমরা একটি গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি পড়েও অনুরূপ বিহ্বলিত দিন গুনছি, মনে আছে।

অধুনা কণ্ঠশিল্পী মিনারের অপেক্ষা কিংবা ভাইকিংস ব্যান্ডের তন্ময়ের গলায় অপেক্ষা শুনেও শিহরণ জাগে অনুভবে, যেমনটা জেগেছিল ২০১০ সালে আবু সাইয়ীদ পরিচালিত অপেক্ষা চলচ্চিত্র দেখে।

আরও মনে পড়ে। আরও মনে পড়ে। কতকিছু মনে পড়ে, হায়! কেন এই অপেক্ষা কিংবা প্রতীক্ষা কেন্দ্রিক স্মৃতি মেদুরতা? নেপথ্য কারণ তরুণ কবি হানিফ রাশেদিনের প্রতীক্ষার রাত  কবিতাখানি।

হানিফের কবিতা শুরু হয়েছে এভাবে: ‘কেউ একজন সুপ্ত আগুন উসকে দিক।’ অর্থাৎ আহ্বানের মধ্য দিয়ে কবিতার শুরু। কবি কোনো একজনকে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন তার ভেতরের সুপ্ত আগুনকে উসকে দেবার জন্য। কিন্তু কেন? আগুন কি নিজে নিজেই জ্বলে উঠতে পারে না? না, পারে না। বস্তুতঃ নরক ব্যতীত পৃথিবীর কোনো আগুনই স্বেচ্ছায় জ্বলে উঠতে পারে না। আগুনের ধর্মই এমন যে তাকে অপরাপর সাহায্য নিয়ে জ্বলে উঠতে হয়। তাই বারুদে ঘষা দিতে হয়, ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকে যে আগুন তাকেও উসকে দিতে হয় জ্বলে উঠবার তরে।

এর পরের চরণেই কবি সেই শুভাকাঙ্ক্ষীকে বলছেন, যেন সে রাতের দেয়াল ভেঙে দেয় এবং প্রাণের প্রদীপ হাতে এগিয়ে আসে। সে যেন প্রতিটি ঘরের বদ্ধ জানালা খুলে দেয় এবং ধীরস্থির হয়ে শোনায় নির্ভেজাল প্রেমের গল্প। চারটি চরণের মধ্যে প্রথম তিন চরণে নিপুণ শিল্পীর মতো কবি তার সময়কে এঁকেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাত বলতে কবি এক দুর্বীনিত দুঃসময়কে বোঝাচ্ছেন যে সময় তার চারপাশে কারাগারের মতো উঁচু দেয়াল তুলে আটকে দিয়েছে শুভবোধের প্রবেশকে। কবি তার কালপ্রবাহকে একটি ঘরের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, ঘরটির প্রতিটি জানালা কপাটআঁটা। তাই নিকষ আঁধার ছেয়ে আছে ঘরজুড়ে। এই দেয়াল ভেঙে কোনো একজনকে ঘরে প্রবেশের আহ্বান জানাচ্ছেন কবি। বলছেন, সে যেন নিকষ আঁধারঘেরা ঘরে প্রাণের প্রদীপ জ্বালায় আর খুলে দেয় ঘরের জানালাগুলো। কবি হয়ত ভালো করেই জানেন, শুধু প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে সবটা আঁধার দূর করা যাবে না; দরকার বাইরের আলোও। তাই তিনি জানালা খুলে দেবার আহ্বান জানান, যেমনটা ঈশ্বর আহ্বান জানান বাইবেলে— ‘লেট দেয়ার বি লাইট…।’

তো আলো এসে গেলে কী করবেন তিনি? কবি বলছেন, আলোয় আলোয় যখন ভরে উঠেছে ঘর, এবার তবে শোনাও প্রেমের গল্প। শুধু প্রেমের গল্প নয় ‘নির্ভেজাল’ প্রেমের গল্প। কবি হানিফ রাশেদীন কতটা সময়সচেতন তা এই ‘নির্ভেজাল’ শব্দ দ্বারাই বোঝা যায়। কবি দেখছেন, তাঁর সময়কালজুড়ে কেবলই ভেজাল প্রেমের ছড়াছড়ি। তাই তিনি চাইছেন, কেউ একজন নির্ভেজাল প্রেমের গল্প শোনাক।

 

hanif

পরের চরণগুলোতে নজর দেওয়া যাক। কবির আহ্বান শেষ হয়নি। তিনি বলছেন, কেউ একজন একটি প্রজাপতি উড়িয়ে দিক। নিঃসন্দেহে প্রজাপতি সুন্দরের প্রতীক। কবি চাইছেন, তার চারপাশে সুন্দর ওড়াউড়ি করুক। কেননা প্রতিদিন অসুন্দরের ওড়াউড়ি দেখে দেখে দু’চোখে কালি জমেছে বিস্তর। এবং কবি চান, তার চারপাশের বিরুদ্ধ বাতাস থামিয়ে দিক কেউ। এই চরণের মধ্য দিয়ে কবি আবারও স্পষ্টভাবে তাঁর সময়কেই নির্দেশ করলেন। বর্তমান সময় যে বিরুদ্ধ বাতাসে ভরপুর তা কবির চেয়ে বেশি আর কে জানেন? কবি তাই মনেপ্রাণে চান, এ বাতাস থামিয়ে দিক কেউ। তাঁর যে শ্বাস ফেলতে বড় কষ্ট হয় এ তপ্ত হাওয়ায়।

কবি হানিফ রাশেদীন চান, কেউ একজন হৃদয়ের বাসনা ছড়িয়ে দিক আর তাকে বলুক চাঁদের ঠিকানা। কবি এতটাই সৌন্দর্য্যপিয়াসী কিংবা এই বিরুদ্ধ বাতাসে এতটাই বীতশ্রদ্ধ যে তিনি আর এই পৃথিবী নামক গ্রহে থাকতে চান না। তাই চাঁদের ঠিকানা তালাশ করছেন। তারপরের চরণেই অবশ্য কবি পূর্বের অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে! অর্থাৎ পলায়নবাদীতা কোনো সমাধান নয়। সমস্যাকে মেকাবেলা করতে হয় সামনে থেকেই। পৃথিবী ছেড়ে চাঁদে গেলেই সব শান্তির পায়রা এসে বুকের খাঁচায় বাসা বাঁধবে—এমন তো নয়। তাই সবার আগে দরকার নিজের ভেতরের ঘুমন্ত বোধের জাগরণ। আমাদের মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠজুড়ে যে নিকষ রাত স্থায়ী হয়ে আছে সেখানে সকাল হওয়া জরুরি।

রাতের রঙ কালো। রাত মানে অন্ধকার। আমাদের মস্তিষ্কের করোটিজুড়ে শুধু কালো রঙের উৎপাত। এখানে এখন দরকার বাসন্তী রঙ। তাই কবিতার শেষ চরণে কবি হানিফ রাশেদীনের আহ্বান—কেউ আবাদ করুক বসন্তের রঙ।

এবার পুরো কবিতায় চোখ বুলানো যাক:

কেউ একজন সুপ্ত আগুন উসকে দিক

ভেঙ্গে ফেলুক রাতের দেয়াল

প্রাণের প্রদীপ হাতে এগিয়ে আসুক

খুলে দিক প্রতিটি ঘরের বদ্ধ জানালা

শোনাক নির্ভেজাল প্রেমের গল্প

একজন উড়িয়ে দিক অন্তত একটি প্রজাপতি

চারপাশে বিরুদ্ধ বাতাস থামিয়ে দিক

কেউ একজন ছড়িয়ে দিক হৃদয় বাসনা

উচ্চকণ্ঠে বলুক চাঁদের ঠিকানা

‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’

কেউ আবাদ করুক বসন্তের রঙ।

পুরো কবিতা পাঠের পর যে কেউ স্বীকার করবেন, কবি হানিফ রাশেদীন ছোট ক্যানভাসে বড় দৃশ্য আঁকেন। মাত্র এগারো লাইনের কবিতা, কিন্তু বক্তব্য কি সুগভীর। তিনি দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত শব্দের মারপ্যাচে পাঠককে ভড়কে দিয়ে সমীহ আদায় করতে চাননি— এটিও স্বীকার করে নিতে হবে। পাশাপাশি স্বীকার করে নেওয়া ভালো, তিনি নিপুণ শিল্পী বটে, তবে উত্তরাধুনিকতার নামে কবিতায় বিমূর্ত চিত্র আঁকেন না। তাঁর চিত্রকল্প বোধগম্য, স্পষ্ট এবং নান্দনিকতায় উত্তীর্ণ। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, হানিফ রাশেদীনের কবিতায় আহ্বান আছে তবে সেই আহ্বান তাঁর পূর্বসূরীদের মতো ‘কে আছ জোয়ান’ বলে হায়দরি হাঁক নয়। তিনি মৃদুকণ্ঠে আহ্বান জানান এবং তাঁর প্রতিবাদও মৃদু।

হয়তো এই মৃদু কণ্ঠই একদিন বাংলা কাব্যে পাথর খোদাইয়ের মতো স্থায়ী হয়ে যাবে। কেননা কণ্ঠটি মৃদু হলেও শাণিত, তেজদীপ্ত। লেখালেখিতে তিনি বহুপ্রজ নন; লেখেন হিসেব কষে, ধীরেসুস্থে। একটিমাত্র কবিতার বই বের হয়েছে তাঁর— নিকাশের দায় রেখে  আর সম্পাদনা করেন একটি ছোটকাগজ—প্রতিকথা । হানিফ রাশেদীনের জন্য শুভকামনা।