ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের “সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট” কর্তৃক আয়োজিত সুন্দরবন নিয়ে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হল।

ছাত্রফ্রন্টকে ধন্যবাদ।  আজকের এই সুন্দর আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য। এতক্ষণ যারা আলোচনা করলেন,  তারা অনেক গুরুত্বপূর্ন বিষয় আলোচনা করলেন। প্রিন্স, তানজীম, মিত্রা আলোচনা করেছেন। রতনও বিস্তৃত আলোচনা করেছেন, তানজীমও করেছেন। এর মধ্যেই আশা করি সবাই পরিষ্কার হয়েছেন যে, আমরা একটা প্রতারণা মুলক উন্নয়ন প্রকল্পের গল্প শুনছি। তাই আমাদের সকলের দ্বায়িত্ব। দ্বায়িত্বটা কেন সেটা এখানে ছাত্রছাত্রীরা আছেন, তারা বিষয়গুলো উপলব্ধি করেন। আমার ধারণা হয়েছে…যত মানুষের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয় কিংবা ফেইসবুকে, চিঠিপত্রে, টেলিফোনে, ইমেইলে এবং বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তায় যে যোগাযোগ হয়। তাতে আমরা যে ফীডব্যাক পাই, প্রতিক্রিয়া পাই, তাতে আমরা নিশ্চিত যে বাংলাদেশের শতকরা নিরানব্বই মানুষই-(একভাগ হলেও হতে পারে) এটা উপলবিব্ধ করেন সুন্দরবনকে বিনাশ করে, বিপর্যস্ত করে বিদ্যুতকেন্দ্রটা হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন। এবং আমি এটাও সরকারি দল আওয়ামী লীগ, ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগসহ সরকারের সাথে যে সমস্ত সানুষজন আছেন, তাদের সম্পকে আমার ধারণা তাদের বিভিন্ন জনের সাথে কথাবার্তা বলা সাপেক্ষে, তারা যদি নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা পান, তাহলে তাদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ট আমরা পাব এই বিদ্যুতকেন্দ্রের বিরোধী। আজকে যদি প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র নিরপেক্ষ থাকেন- যদি বলেন আমি নিরপেক্ষ আমার কোন মত নাই-আপনার বলেন- তাহলে তার দলের তার ছাত্রসংগঠনের কর্মীরাই বলবে এটা আমাদের দরকার নাই, এটা বন্ধ করেন। সুতরাং এখান থেকে আপনি সরে যান।

এই যে তারা অনেক কিছ বলেন সবকিছু যে বৈজ্ঞানিক, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থেকে বলেন তা নয়, অনেক কিছু কান্ডজ্ঞান থেকেই বোঝা যায়। আসলে কান্ডজ্ঞান যদি কাজ না করে, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কোন ভাবেই’কাজ করে না। কান্ড জ্ঞান হলো প্রাথমিক জ্ঞান, সেই প্রাথমিক জ্ঞানের ভিত্তিই যদি না থাকে তাহলে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে কিছু্রাই বানানো যায় না। তাকে ভারাটিয়া লোক বানানো যায়, মেশিন বানানো যায়, কম্পিউটার বানানো যায় কিন্তু তাকে মানুষ বানানো যায় না, তাদের জ্ঞানের কোন বিকাশ ঘটানো যায় না। কান্ডজ্ঞানই বলে যে, সুন্দরবনের মতো একটা ইকোসিস্টেম- সারা পৃথিবীর যারা প্রাণ প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেন-তারা অবাক হয়ে তাকে থাকেন-এটা একটা এক্সট্রা অর্ডিনারী ইকোসিস্টেম। লবণ পানি, মিঠা পানি, সমুদ্র এবং এর মধ্যে যে প্রাণবৈচিত্র্য আছে…সমস্ত কিছু মিলেই এটা একটা অসাধারণ প্রাণবৈচিত্র্যের আঁধার। তার কারণে এটা একটা খাদ্র চক্র, জীবন চক্র সমস্তকিছু মিলে এটা একটার সাথে আরেকটা এত সম্পর্কযুক্ত, যে তার নিজের অবস্থা একদিক থেকে খুবই নাজুক আরেক দিক থেকে খুবই শক্তিশালী। নাজুক এই কারণে যে যেটা তানজীন বলেছেন পানির উপরে তার নির্ভরতা।

সেই পানি প্রবাহ যদি না থাকে, পানি  দূষিত হেয়, তাহলে সুন্দর বনের পক্ষে বেঁচে থাবা খুব কঠিন।  যদি খাদ্যচক্রের কোন একটা বিন্দুতে দূষণ ঘটে, তাহলে বহুদূর পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে। মানে খুবই নাজুক অবসস্থা, শিশুর মতো দুর্বল। সেকারনে আপনাদের যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা জানেন, সুন্দরবনের ভূমিহীন মানুষ, প্রধান মন্ত্রী যাদের নামের সাথে একটা অপবাদ দিয়েছেন, আমরা প্রতিবাদ করেছি। সেই ভেতরে যারা আছেন বনজীবি, মৎস্যজীবি। তারা যখন আমাদের বনের ভেতরে নিয়ে যান, তথন কথা বলতে নিষেধ করেন, তারা বলেন শব্দ করবেন না, ফিসফিসিয়েও কথা বলবেন না।  এমন একটা নিরবতা ঐখানে লাগবে, যেটাকে শহরের সাথে তুলনা করা যাবে না। তার মানে একটু শব্দ হলেই যে সেখানে সমস্য হবে, সেটা ওখানকার একজন নিরক্ষর মানুষ যিনি ওখানকার পরিবেশের সাথে একাকার হয়ে আছেন। এবং ঐখান প্রকৃতি একজন আরেকজনকে রক্ষা করে, তিনিও বুঝতে পারেন একটু শব্ধও করা যাবে না। পরিবেশটাকে কিংবা সুন্দরবনকে বাচিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু আমাদের অনেক বিশেষজ্ঞরা বলেন “১০ হাজার টন কয়লার জাহাজ যাবে সেখানে কোন শব্দ হবে না। যতটুকু হবে তাতে কোন সমস্যা হবে না।” এটা হচ্ছে আমাদের জ্ঞানী, ডিগ্রীওয়ালা পন্ডিতদের কথা। ডিগ্রী থাকলেই তো আর বিশেষজ্ঞ হয় না। সে লোক যদি কোন কোম্পানির ভাড়াটিয়া হয়, কিংবা কোন বেতনভুক্ত লোক হয়, তার থেকে যে কথা শোনা যায়, সেটা কোন বিশেষজ্ঞ’র কথা হতে পারে না। সেটা কোম্পানীর বিজ্ঞাপনি প্রচারনী মাত্র।

আমরা গত ৫ বছর ধরে সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন করে দেখছি সরকারের বা এই কোম্পানির লোকজনের আরগুমেন্ট’ বা যুক্তি’র পরিবর্তন হচ্ছে।  তাদের দুই ধরনের যুক্তি- একটা হল সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। আর অন্যটি হল সুন্দর বনের ক্ষতি হলে কি আসে যায়। একে একে তাদের সব যুক্তি খন্ডনের সাথে সাথে আমরা যেকোনটির ক্ষতির কথা বলি না কেন, তারা বলে আমরা এটি পুষিয়ে নেব টেকনোলজির মাধ্যমে।

এদিকে বায়ু প্রবাহের ক্ষমতা যখন তাদের হাতে নেই..তখন তারা বললো..বায়ু ঐদিকে প্রবাহই হবে না। কিংবা তারা বলে…পানি এমন বিশুদ্ধ হবে যে পানি পানও করা যাবে। (যা হাস্যকর)!!!! এ থেকে বোঝা যায় তাদের কাছে ’সুন্দরবনের গুরুত্বই কম।

বক্তব্যের অন্যন্য অংশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরো বলেন—

এটা নিশ্চিত রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল হবেই। শুধু যত তাড়াতাড়ি আমরা আন্দোলনকে বেগবান করতে পারব তত তাড়াতাড়ি এ প্রকল্প বাতিল হবে। এখন দরকার আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।’ আন্দোলনরত জাতীয় কমিটিকে যারা সমর্থন করেন তাদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে যেভাবে পারেন সেভাবেই আন্দোলনে অংশগ্রহন করুন। সবাইকে যে একই পদ্ধতিতে আন্দোলনে আসতে হবে তা নয়, যার ভেতরে যে ক্ষমতা আছে তার সে ক্ষমতাকেই কাজে লাগাতে হবে। আমাদের আন্দোলনকারীদের অনেকে সুন্দরবনের পক্ষে লেখালেখি করছেন, অনেকে গান বানাচ্ছেন, অনেকে নাটক লিখছেন, মোট কথা নিজের ভেতরের ক্ষমতাটাকে কাজে লাগাতে হবে।’

জাতীয় কমিটির আন্দোলনের অর্থের জোগান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তোলা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রেস কনফারেন্সে আন্দোলনের অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কুৎসা রটনা করেছেন। বিএনপি-জামাতের সময় আমরা যখন ফুলবাড়ী আন্দোলন করেছিলাম তখন আপনি সে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলেন, তখন অর্থের জোগান যেভাবে হত এখনও অর্থের জোগান সেভাবেই হয়। আর আমাদেরতো অর্থের তেমন একটা দরকারও হয় না। আন্দোলনকারী বিশেষজ্ঞরা, ছাত্ররা, তরুণরা নিজেদের গায়ে গতরে খেটে আন্দোলন করছে। আপনারা রামপালের পক্ষে যে কাজ করতে লাখ লাখ কোটি কোটি টাকায় ব্যায় করেন আমাদের আন্দোলনকারীরা সে কাজ করছে বিনা টাকায়।’

রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র সমর্থনকারী বিশেষজ্ঞদের ব্যাপারে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোন বিশেষজ্ঞের যত বড় ডিগ্রীই থাকুক না কেন, সে যদি কোন কোম্পানীর চাকুরে হয় সেটা বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নয় বরং বিজ্ঞাপনী প্রচার। কান্ড জ্ঞান না থাকলে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কোন কাজে আসে না। টাকা দিয়ে ভাড়াটিয়া বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায়, কিন্তু যারা সুন্দরবন রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন তাদের কেনা যাবে না।’

সুন্দরবন ও পরিবেশ সম্পর্কে দেওয়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও আমলাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন নিয়ে তারা যখন বিভিন্ন অযৌক্তিক ও হাস্যকর কথা বলছেন তখন বোঝা যায় সুন্দরবনের ব্যাপারে তাদের আসলে কোন আন্তরিকতাই নেই।’

সরকারের উন্নয়নের ধারণার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বলা হয় উন্নয়ন করতে গেলে পরিবেশের একটু-আধটু ক্ষতি হবেই। সরকারের উন্নয়নের ধারণাটা বদলাতে হবে। যে উন্নয়নে পরিবেশের বিপজ্জনক মাত্রায় ক্ষতি হয় সেটা তো কোন উন্নয়নই না। অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে যদি সমৃদ্ধি অর্জন করা যায় সেটাই উন্নয়ন।’

রামপালে প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অথনৈতিক বিবেচনায়ও এটা একটা ব্যাড প্রজেক্ট।’

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন, বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা ও তানজিম উদ্দিন খান, ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স। সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জাবি শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাসুক হেলাল অনিক।

রবিবার সন্ধ্যায় সাড়ে সাতটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে শুরু হয় আলোচনা সভাটি। আলোচনা সভার শেষে বটতলা থিয়েটারের পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘সুন্দরবন গাঁথা’। রাত পৌনে এগারটায় শেষ হয় আলোচনা সভা ও নাটকের অনুষ্ঠান ।

slide