ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

একজনের সাথে অন্য জনের মানসিক দূরত্ব বিভাজনের জন্ম দেয়। আমরা অনেকদিন থেকেই শুনে আসছি বাংলাদেশের সমাজে বিভাজন চলছে। সাম্প্রতিক কালে আমেরিকার নির্বাচনের পর এ বিভাজন সেখানেও শুরু হয়েছে বলে শুনা যায়। মার্কিন নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশটির বৃহত্তম ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু মানুষ এ কথাও বলা শুরু করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে যাবে। কারণ ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের যুক্তরাষ্ট্র এক নয়। স্বাভাবিক ভাবেই এ বিভাজন মানসিক, কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকও বটে।

বিভাজন সমাজ থেকে রাষ্ট্র কিংবা করপোরেট জগৎ সর্বত্রই বিদ্যমান। ২০০৬ সাল থেকে করপোরেট জগতের সাথে যুক্ত আছি, আর একটি কথা প্রায়ই শুনে আসছি সহকর্মী কখনও বন্ধু হয় না। কেউ কেউ আবার বলেন, যে ব্যবস্থাপকের অধীনস্থ কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ সে ভাল ব্যবস্থাপক নয়। অর্থাৎ কর্মীদের মধ্যে দন্দ্ব থাকবে আর তারা একে অন্যের দুর্বলতা ব্যবস্থাপককে জানাবে। ব্যবস্থাপক চার দেয়ালের মধ্যে বদ্ধ ঘরে বসে সব জেনে যাবে। বাস্তবতা হল অনেক কর্মী আছেন তারা কখনই অন্যের দোষ বলেন না। আর অনেক কর্মী আছেন তারা ফুলিয়ে ফাপিয়ে অন্যের দোষ গিয়ে ব্যবস্থাপককে জানান। ফলাফল ভুল ব্যবস্থাপনা। ভুল সিদ্ধান্ত আর বিভাজনকে উসকে দেওয়া।

এক সময় হয়তো অনেকেই ব্যস্ত হয়ে যায় একে অন্যের নামে কুৎসা রটাতে। এমনও বলতে শুনা যায় অমুক কর্মী ভালো কাজ করে তবে তার উদ্দেশ্য খারাপ এবং সুযোগ পেলে বা দায়িত্ব পেলে খারাপ হয়ে যাবে। অর্থাৎ তার লুকানো চিন্তাও চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়। যা এক সময় প্রতিষ্ঠানকে স্থবির করে দেয়। কর্মে ফাঁকি দেয়াকে উৎসাহিত করে। পরচর্চাকে প্রতিদিনের কর্মে যুক্ত করে। কর্মের গতি কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে পারস্পরিক বিশ্বাস, ঐক্য, ভালবাসার চর্চা আর আত্মসমালোচনার দ্বারা একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হত। ঐক্যবদ্ধ মানুষই সমাজকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। সে উন্নতি অর্থনৈতিক, মানসিক এবং সর্বপরি সুখের।

ক্যালিফোর্নিয়ার বিভক্তি কখনই ঐক্যবদ্ধ আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী হতে পারবে না। একই সূত্র ধরে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছিল যে বিভক্তি কাশ্মিরের জনগণ মেনে নিতে পারেনি। এখনো পারছে না। ফলাফল ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যত না ভৌগলিক বিভক্তি তার চেয়ে বেশি মানসিক বিভক্তি। আর পুরো কাশ্মির দখল করতে গিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সামরিক মহরা। অথচ এই অর্থ যদি দারিদ্র দূর করার জন্য ব্যয় করতো তাহলে একটি উন্নত (মানসিক ও অর্থনৈতিক) ভারত-পাকিস্তান হয়তো আমরা পৃথিবীর বুকে দেখতে পেতাম।

বিভক্তির যন্ত্রণা প্রচন্ডভাবে অনুভব করছে মধ্যপ্রাচ্য। সিরিয়ার বছরের পর বছর যুদ্ধ চলছে। এটি মূলত শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিভক্তির যুদ্ধ, তবে প্রক্সি যুদ্ধ। এটাও ঠিক, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল বাশার আল আসাদ এর সঙ্গে বিরোধীদের দন্দ্বের কারণে। বলা বাহুল্য, একটি অঞ্চলে বা দেশে নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধ চললে সেই দেশের উন্নতি হতে পারে না।

তাই যে কোন ধরনের বিভক্তি, মানবতার অকল্যাণ বয়ে আনে। সেটা ভাইয়ে-ভাইয়ে, বৌয়ে-শ্বাশুরি, সহকর্মীদের মধ্যে হউক কিংবা রাজনৈতিক বিভক্তি হউক। মানবতার কল্যাণের জন্য মানবতার জয়গাণ গাইতে হবে। আর ঐক্যবদ্ধ মানবতাই সুখী সমাজ গড়তে পারে। তাইতো খুব সহজেই বলা যায়, বিভাজন মানবতাকে ধ্বংস করে, খারাপের প্রতিনিধিত্ব বাড়ায়।

মোঃ মশিউর রহমান

ব্যাংকার