ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

সাধারণভাবে ব্যাংকিং বলতে একপক্ষ থেকে অর্থ আমানত নেয়া এবং অন্যপক্ষকে ধার দেওয়াকে বুঝায়। বাস্তবে ব্যাংকিং এই দুই ধরনের কাজেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বাইরেও অসংখ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। যেমন- নানা ধরনের গ্যারান্টি, সনদপত্র এবং অর্থ ও অর্থের ব্যবহার প্রভৃতি। এইসব কার্যকলাপের জন্য প্রতিনিয়তই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। কারণ প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে ব্যাংকিং এর গতি ও প্রকৃতি। এই পরিবর্তনের পিছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে প্রযুক্তির পরিবর্তন। প্রযুক্তির পরিবর্তন মানুষের চাহিদা পাল্টে দিচ্ছে সাথে সাথে তাল মিলিয়ে আইনেরও পরিবর্তন হচ্ছে। খুব শীঘ্রই ব্যাংকিং এ বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটবে যার কয়েকটি তুলে ধরা হলো-

প্রথমত, কাগজি মুদ্রা ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হবে। কাগজি মুদ্রার বিলুপ্তি পৃথিবীর ইতিহাসকে পাল্টে দিবে। কারণ কাগজি মুদ্রার বিলুপ্তি শুধু মুদ্রার বিলুপ্তি নয় এর ফলে একটি দেশের পুঁজি যেমন কয়েকগুন বেড়ে যাবে একইভাবে ঋণ আমানত বাড়বে অসীম সংখ্যায়। কাগজি মুদ্রার জায়গায় স্থান নিবে ইলেক্ট্রনিক্স মুদ্রা। যে মুদ্রা শুধুমাত্র ব্যাংকের সার্ভারেই থাকবে। মানুষ শুধু তার প্রয়োজনে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে স্থানান্তর করবে। এখন যেমন পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয়ে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়, তখন শুধু এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হবে। এজন্য অনেক বেশি মাত্রায় বেড়ে যাবে মোবাইল ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং এর ব্যবহার। বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন অ্যাপস্ আসবে লেনদেন দ্রুত এবং সস্থায় করার জন্য। এটিএম মেশিন এর বিলুপ্তি ঘটলেও এটিএম কার্ড কিংবা ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের জন্য অধিক মাত্রায় পস মেশিনের ব্যবহার বাড়বে। এর ফলে সবার পকেটের টাকা চলে যাবে ব্যাংকের খাতায় তাই পুঁজি বাড়বে কয়েকগুন।

ঋণদান কিংবা অর্থের লেনদেন ব্যাংকের মোট আমানতে কোন প্রভাব পড়বে না। কারণ অর্থ তো সবসময়ই ব্যাংকের সার্ভারে থাকবে, পরিবর্তন হবে শুধু হিসাবের খাতায়। তাই ঋণ আমানত বাড়বে অসীম সংখ্যায়। যেমন- ২০ শতাংশ রিজার্ভ রাখলে একটি দেশের মোট আমানত বাড়বে ১/২০% = ৫ গুণ, আর ০ (শূন্য) শতাংশ রিজার্ভ রাখলে আমানত বাড়বে ১/০% = অসীম সংখ্যায়। ঋণের পরিমান বৃদ্ধি হবে মোট বর্ধিত আমানত থেকে ১ (এক) বাদ দিলে যা থাকবে তাই। সুতরাং খুব সহজেই বলা যায়, কাগজি মুদ্রার বিলুপ্তি পৃথিবীর ইতিহাসকে পাল্টে দিবে।

02_ATM+Booth_140216_005

এজেন্ট ব্যাংকিং হবে আরেকটি পরিবর্তন। ইতিমধ্যে আমাদের দেশ শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০ এরও অধিক এজেন্ট বুথ রয়েছে আমাদের দেশে। এ সংখ্যা খুবই দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। কারণ এখানে প্রশাসনিক খরচ অনেক কম হয়। মাত্র একজন ব্যাংকের অফিসার থাকে বাকিদের নিয়োগ দেয় এজেন্ট মালিকগণ। এ ব্যবস্থাও সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার জন্য। আগামী দিনে হয়তো একই এজেন্টের দ্বারা পরিচালিত হবে একাধিক ব্যাংকের ব্যাংকিং কার্যক্রম। এখন যেমনটা এটিএম মেশিন আর মোবাইল ব্যাংকিং এর ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এর প্রসার কৃষি ঋণ এবং ক্ষুদ্র ঋণেরও প্রসার ঘটাবে এবং প্রান্তিক জনসাধারণকে ব্যাংকিং সেবা পেতে সহায়তা করবে।

আগামী দিমনের ব্যাংকিং এর আরেকটি ধারা হতে পারে বৈদেশিক শাখা স্থাপন। এখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র হল দু’টি যথা: তৈরি পোশাক শিল্প এবং শ্রমিক শ্রেনী যারা বিদেশে কাজ করেন। আগামী দিনে আরেকটি ধারা হবে ব্যাংক ও ব্যাংকিং। তাই রাষ্ট্রকে এ বিষয়ক প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার করে এগিয়ে আসতে হবে। বৈদেশিক শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথমে আমরা বেছে নিতে পারি ঐ সকল দেশকে যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে।

বর্তমানে সাধারণ কোন ফ্ল্যাট কেনার বিপরীতে ব্যাংক লোন দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মধ্যস্থ ভুগির আগমন ঘটে। স্বাভাবিক ভাবেই খরচ এর চেয়ে বিক্রয় মূল্য বেশি হয় যা ব্যয় করা ভোক্তার জন্য কষ্টসাধ্যও বটে। অনেকেই আছেন যারা যৌথভাবে ফ্ল্যাট নির্মান করে নিজেরাই বসবাস করতে চান। যৌথভাবে ফ্ল্যাট নির্মান করলে ভোক্তার ক্রয়ম্যূল খরচ এর সমান হয়। অর্থাৎ কমদামে ভোক্তারা ফ্ল্যাট কিনতে পারে। এধরনের বিনিয়োগে ব্যাংকগুলো খুব সহজেই এগিয়ে আসতে পারে। এর ফলে ঋণের পরিমানও ছোট হবে এবং ভোক্তার জন্য মাসিক কিস্তি পরিশোধ করাও সহজ হবে। তাই আগামী দিনের ব্যাংকিং এর আর একটি ধারা হবে গ্রুপ ভিত্তিক হাউজ বিল্ডিং লোন

ইতিমধ্যে প্রযুক্তির অনেক উৎকর্ষ হয়েছে। মানুষও প্রযুক্তির ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রযুক্তির উৎর্কষতাকে সামনে নিয়ে নতুন ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব চালু হবে আগামী দিনে। তা হলো যখন যেমন খুশি সঞ্চয়ী হিসাব। এক্ষেত্রে হিসাব ধারক মাসিক সঞ্চয় হিসাবের পাশাপাশি দৈনিক সঞ্চয়ি হিসাব পরিচালনা করবে। এ হিসাবে যখন যেমন খুশি অর্থ জমা দেয়া যাবে। দৈনিক ভিত্তিক মজুরে বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিকট এ হিসাব হবে আকর্ষনীয়। ব্যাংকগুলো খুব সহজেই প্রযুক্তির ব্যবহার করে দিনের শেষ ব্যালেন্সকে জমা ধরে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে আমানতকারীর প্রকৃত পাওনা বুঝিয়ে দিতে পারবে।

এভাবেই আগামী দিনের ব্যাংকিং হবে প্রযুক্তির ব্যাংকিং যা মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় আইনী সংস্কার করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে। আর যে যত তারাতারি এই পরিবর্তনকে মানিয়ে নিতে পারবে সেই ব্যাংকই হবে আগামী দিনের নেতৃত্বশীল ব্যাংক।

মোঃ মশিউর রহমান, ব্যাংকার