ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

ইলেক্ট্রনিক মুদ্রা হলো এমন এক মুদ্রা যা ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না কিংবা ছবির মতো দেখা যাবে না। তবে প্রয়োজনে ব্যয় করা যাবে অথবা অন্যের কাছ থেকে পাওনা হিসেবের খাতায় জমা করা যাবে। সর্বদাই এই জমা আর ব্যয়ের কাজ হবে কোন না কোন ব্যাংকের মাধ্যমে। এখন যেমন আপনার পকেটে, মানি ব্যাগে, ভ্যানিটি ব্যাগে, বালিশের নিচে, আলমারীতে টাকা রাখেন সেটা আর হবে না। টাকা সব সময়ই ব্যাংকে থাকবে। কি বড়, কি শিশু, কি প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র সবার টাকাই থাকবে ব্যাংকের খাতায়। আধুনিক এই খাতার নাম সার্ভার। যখনই কাউকে টাকা দিতে হবে তখনই আপনার মোবাইল ফোন, আইপ্যাড, ল্যাপটপ, প্লাষ্টিক কার্ড বা অন্য কোন ডিভাইস এর সাহায্যে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তর করে দিবেন। এই হয়ে গেল আপনার কাজ। আবার যখন টাকা পাবেন একইভাবে আপনার হিসাবে টাকা জমা হয়ে যাবে। এভাবেই চলতে থাকবে আপনার আয়-ব্যয় এর হিসাব। আপনার অর্থের মালিকও আপনি, তা ব্যয় করা বা না করার পূর্ণ স্বাধীনতাও আপনার।

এ ধরনের কাগজী মুদ্রার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে ইলেক্ট্রনিক মুদ্রা। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্র পেয়ে যাবে এক বিশাল শক্তি, তা হলো ভিনদেশ কিংবা সংস্থার কাছ থেকে অর্থ ধার না করার শক্তি। হয়তো ভাবছেন কি করে সম্ভব! কেউ কেউ হয়তো বলছেন অসম্ভব, কখনই হবে না। আপনার সব প্রশ্নের সমাধান একটি সহজ অংকের মাধ্যমে এখনই পেয়ে যাবেন।

প্রথমত কাগজী মুদ্রা বাজার থেকে বিতারিত হবে এবং ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এর ফলে একটি দেশের ডিপোজিট (সঞ্চয়) বেড়ে যাবে প্রচুর পরিমাণে। যেমন আমাদের বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের পকেটে গড়ে ১০০০ টাকা আছে, তাহলে প্রথমত যেটা হবে ১০০০ গুণ ১৬ কোটি মোট ১৬ হাজার কোটি পকেট মানি ব্যাংকে জমা হবে। বাস্তবে হয়তো এই সংখ্যা আরো কয়েক গুন বেশি হবে। দ্বিতীয়ত মানুষ টাকা খরচ করলেও ব্যাংকে টাকা জমা থাকবে, খরচ না করলেও ব্যাংকে থাকবে। সঞ্চয় নিয়ে কোন প্রণোদনা দেয়ারও প্রয়োজন হবে না। টাকা সব সময়ই ব্যাংকে থাকবে। কেবল হিসাবের খাতায় (সার্ভার) মালিকানা পরিবর্তন হবে মাত্র।

banking

এতো গেল সঞ্চয় বাড়ার হিসাব। ব্যাংক তো আর সঞ্চয় নিয়ে বসে থাকবে না। সঞ্চয়কে বিনিয়োগ করবে অথবা ধার দিবে। বর্তমানে ব্যাংক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রেখে বাকি টাকা ধার দেয়। একই সূত্র ধরে কোন দেশের ব্যাংক যদি শতকরা ২০ টাকা জমা রেখে ৮০ টাকা ধার দেয় তাহলে ১০০ টাকা বিপরীতে ৮০ টাকা হবে ধার বা ঋণ। যেহেতু ঋণ গ্রহিতা ৮০ টাকা নগদ তুলতে পারবে না (কারণ কাগজী মুদ্রাতো আর নাই) তাই ৮০ টাকা তার হিসাবে জমা হবে। ব্যাংকের ভাষায় ৮০ টাকা আবার সঞ্চয় হবে। অর্থাত্ প্রকৃত ১০০ টাকা সঞ্চয় হবে ১৮০ টাকা (১০০+৮০ = ১৮০)। এরপর ৮০ টাকা থেকে শতকরা ২০ টাকা জমা রেখে ব্যাংক বাকি টাকা আবার ধার বা ঋণ দিতে পারবে। এক্ষেত্রে আবার ৬৪ টাকা হবে ঋণ আর ১৬ টাকা হবে জমা। এভাবে চলতেই থাকবে। যখন জমা রাখার মতো আর কিছুই থাকবে না তখন ব্যাংক তার ঋণ দেয়া বন্ধ করবে। শেষ বিন্দুতে এসে ১০০ টাকা সত্যিকারের সঞ্চয় হবে ৫০০ টাকা আর ঋণ হবে ৪০০ টাকা। (উল্লেখ্য ব্যাংক কখনোই ঋণ দেয়া বন্ধ করবে না কারণ প্রথম দিকে যাকে ঋণ দিয়ে ছিলো ইতোমধ্যে সে তা ব্যবহার করে ফেরত দিবে।) একইভাবে ব্যাংক যদি শতকরা ২০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা জমা রেখে বাকি টাকা ঋণ বা ধার দেয় তাহলে সঞ্চয় হবে ১০০০ টাকা আর ঋণ হবে ৯০০ টাকা। অন্যদিকে শতকরা ০ (শূন্য) টাকা জমা রাখলে সঞ্চয় এবং ঋণ অসীম সংখ্যায় বাড়বে। সঞ্চয় বাড়ার হিসাবটা আমরা সূত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারি যেমন, জমা যদি ২০% হয় তাহলে সঞ্চয় বাড়বে ১/২০% = ৫ গুণ (যদি প্রকৃত সঞ্চয় হয় ১ টাকা)। ২০% এর জায়গায় ০% লিখলে উত্তর হবে অসীম।

এক্ষেত্রে হয়তো অর্থনীতির কিছু অনুসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। যেমন অনেকে নিশ্চয় মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেবার বিষয়টি নিয়ে ভাববেন। এবিষয়টিও এ পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। তবে কাগজী মুদ্রার বদলে ইকেক্ট্রনিক মুদ্রার প্রচলন হলে অনেক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। যেমন, কাগজী মুদ্রা ছাপানোর ঝামেলা থাকছে না। ব্যাংকের শাখায় অর্থ রাখার ভল্ট এর প্রয়োজনীয়তা কমবে। গ্রামে-গঞ্জে ব্যাংকের শাখা খুলতে নিরাপত্তার সমস্যা হবে না। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান-এর অর্থ ব্যবস্থাপনা খুব সহজেই ব্যাংকের মাধ্যমে করা যাবে। সঞ্চয় এর বিপরীতে কোন প্রণোদনা দেয়ার প্রয়োজন হবে না। কারণ সবার টাকা সব সময় ব্যাংকে থাকবে। সরকার খুব সহজেই রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারবে।

এরকম অসংখ্য সুবিধা পাওয়া যাবে, এজন্য প্রয়োজন হবে একটি নিরাপদ এবং সবার জন্য ব্যবহার উপযোগী সফটওয়ার। যার মাধ্যমে ১ পয়সার লেনদেন থেকে শুরু করে শতকোটি টাকার লেনদেন করা যাবে নির্দ্বিধায়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, অন্ধ, পঙ্গু, সুস্থ-অসুস্থ সবার জন্যই ব্যবহার উপযোগী হবে সেই সফটওয়ার। সফটওয়ার ব্যবহারের জন্য থাকতে পারবে একাধিক ডিভাইস। যেমন মোবাইল ফোন, আই প্যাড, ল্যাপটপ, প্লাস্টিক কার্ড বা অন্য কোন ডিভাইস। এসব ডিভাইসে ব্যবহার করা যেতে পারে সাধারণ এ্যাপস্। যেমন টাকা এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে স্থানান্তর ও শেষ ব্যালেন্স দেখা যাবে শুধু এমন এ্যাপস।

কেউ কেউ হয়তো হ্যাকিং নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে পারেন। হ্যাকিং বন্ধ হবে কারণ কেউই টাকা গোপন করতে পারবে না। এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে টাকা স্থানান্তর হলে হিসাবের খাতায় (সার্ভার) তার বিবরণ থাকবে। কোন হ্যাকার যদি বিবরণ না লিখেই অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তর করে ফেলে সেক্ষেত্রে অন্য আরেকটা রিপোর্ট বের হবে যার মাধ্যমে যানা যাবে সোর্স অথবা লিংক ছাড়া কোন কোন হিসাবে লেনদেন হয়েছে। যে যে বিবরণগুলো পাওয়া যাবে তাদেরকে খুব সহজেই আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেয়া যাবে। তাই হ্যাকিং নিয়েও অনেক বেশি দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

মোঃ মশিউর রহমান, ব্যাংকার