ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ বলতে এমন দেশকে বোঝায়, যাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৬ থেকে চার হাজার ১২৫ মার্কিন ডলারের মধ্যে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলার (সূত্র : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, মে ২০১৪) অবশ্য বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এক হাজার ৮০ মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী একটি দেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয় যদি সেই দেশের মাথাপিছু আয় চার হাজার ১২৬ থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়।

আমাদের এখন স্বপ্ন- কত দিন নাগাদ আমরা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক সূচক অনুযায়ী উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আরো কয়েকটি বিষয় অর্জন করা জরুরি। যেমন- শিশুদের বেড়ে ওঠার উপযোগী সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বৃদ্ধদের জন্য পারিবারিক আঙিনা ও সুচিকিৎসা এবং যৌবনের উদ্দীপনা। প্রশ্ন হলো, কী করে সম্ভব? পথ অনেক দীর্ঘ ও জটিল।

খুবই দ্রুত আমরা উচ্চ-মধ্যম আয়ে যেতে পারি, যদি আমরা আমাদের পুঁজির সঠিক ব্যবহার করতে পারি। বাংলাদেশের পুঁজি হলো (১) মানবসম্পদ, (২) অর্থসম্পদ, (৩) কৃষিসম্পদ এবং (৪) খনিজ সম্পদ। উচ্চ-মধ্যম আয়ে যেতে হলে চারটি সম্পদের ব্যবহার করে পঞ্চম কাজ- অর্থাৎ শিল্প ও ব্যবসায় কী করে সফল হওয়া যায় তা শিখতে হবে। ব্যবসা করতে হবে দেশের ভেতরে ও বাইরে। এ কাজ একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্ভব নয়। সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। সবার আগে উদ্যোগী হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রথমত, দেখে নিই আমাদের সম্পদগুলোর কী অবস্থা। যেমন- মানবসম্পদ। আমাদের মানবসম্পদ যে মানের আছে, এ অবস্থা থেকে কিছুটা উন্নতি করার প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে কিছুটা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন করারও। প্রথমত, ব্যবসায় সফল হওয়ার মূলমন্ত্র সবাইকে শিখতে হবে। ব্যবসার মূলমন্ত্র হলো তিনটি : যেমন- (ক) প্রতিযোগীদের চেয়ে তুলনামূলক উন্নত পণ্য ও সেবা সরবরাহ, (খ) প্রতিযোগিতামূলক দাম নির্ধারণ এবং (গ) সঠিক সময়ে পণ্য বা সেবার সরবরাহ। এ জন্য সবাইকে পরিশ্রমী হতে হবে। কাজের বিনিময়ে নেতৃত্ব- এই বিশ্বাসে বিশ্বস্ত হতে হবে। এর মাধ্যমে অর্জন করা যাবে এক অদৃশ্য শক্তি আর তা হলো, অন্যের বিশ্বাস। কিন্তু কখনোই যেটা করা যাবে না তা হলো, বিশ্বাসের ঘরে চুরি করা যাবে না। এই মূলমন্ত্র ধরে রাখতে হবে।

অনেকেই বলেন, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একাধিক ধারায় বিভক্ত। তাই উন্নয়নের জন্য সবাইকে এক ধারায় শিক্ষিত হতে হবে। বস্তুত শিক্ষার নানা রূপ আমাদের মানবসম্পদের বৈচিত্র্য প্রকাশ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেমন ভিন্ন ভিন্ন ধারার মানুষ রয়েছে, সেই ধারায় প্রবেশ করে ব্যবসায় সফল হওয়ার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা কাজে লাগানো যেতে পারে। এটা আমাদের মানবসম্পদের একটা শক্তিও বটে। তবে রাষ্ট্রকে সর্বদাই সচেষ্ট থাকতে হবে, যাতে সব শিক্ষার ধারায়ই জ্ঞানচর্চা হয়। মানুষকে পরিশ্রমী আর কৌশলী হতে শেখায়। মিথ্যা আর প্রতারণা যেন কারো শিক্ষার বিষয়বস্তু না হয়।

দ্বিতীয়টি হলো অর্থসম্পদ। অনেকেই বিশ্বাস করে, আমাদের অর্থসম্পদ অপ্রতুল। অন্যদিকে আমাদের জমানো অর্থ নিয়ে গর্বভরে প্রচারণা চালাই। যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ ২৫ হাজার ৪৬৪.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ইত্যাদি। বস্তুত উন্নয়নের জন্য সঞ্চয়ের চেয়ে অর্থের ব্যবহার শিখতে হবে। সীমিত সঞ্চয়ের প্রয়োজন হলেও উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো ভোগ; অধিক ভোগ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। ভোগ না থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষের আয়ও কমে যাবে। আপনার কাছে ১০ টাকা আছে, পকেটে রেখে দিলে কোনো উন্নয়নই হবে না, ব্যয় করলে ব্যবসা হবে, সঙ্গে উন্নয়নও হবে। পুঁজি বাড়ানোর আরেকটি কৌশল হলো, কাগজি মুদ্রা বিলুপ্ত করে ইলেকট্রনিকস মুদ্রা চালু করা। পূর্ণমাত্রায় ইলেকট্রনিক মুদ্রা চালু হলে অর্থ ব্যয় করলেও ব্যাংকের খাতায় জমা থাকবে, না করলেও থাকবে; পুঁজির কোনো ঘাটতি হবে না। বিদেশ থেকে ঋণ কিংবা ভিক্ষা দুটিই সীমিত পর্যায়ে নিতে হবে।

তৃতীয়ত, কৃষিসম্পদ- আমাদের কৃষকরা অনেক ভালোভাবেই এ দায়িত্ব পালন করছে। আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। টোটাল জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৭ শতাংশ। এত সফলতার পরও কৃষিক্ষেত্রে আরো নতুন নতুন উদ্ভাবনের প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে কৃষিজমির পূর্ণ ব্যবহারের। প্রায়ই শোনা যায়, এখানে কিছু সুবিধাবাদী মানুষ কীটনাশক, সার, মৎস্য ও পশুখাদ্য, বীজের ক্ষেত্রে কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। রাষ্ট্রকে এ ক্ষেত্রে দুর্বল হলে চলবে না, শক্ত হাতে সুবিধাবাদীদের দমন করতে হবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে মানবসম্পদ উন্নয়ন আর কৃষি- এ দুই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বিশেষ জোর দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ভর্তুকিও দিতে হবে। কারণ এরা হলো ভিত্তিমূল। ভিত্তি নড়বড়ে হলে বাকি সব চিন্তা নষ্ট হয়ে যাবে।

চতুর্থত, খনিজ সম্পদ- আমরা এখানে অনেক বেশি মাত্রায় বিদেশিদের কাছে নির্ভরশীল। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি এবং উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যকও বটে।

পঞ্চম স্তরে এসে আমাদের যে কাজটি করতে হবে তা হলো, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ব্যবসায় মনোযোগী হওয়া। আমাদের একটি নতুন পরিচয় হতে পারে, আমরা ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ের মধ্যেই একটি জাতির উন্নয়ন নির্ভর করে। এ জন্য ব্যবসায়ের মূলমন্ত্র ধরে রাখতে হবে। আর দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে হবে ব্যবসার জন্য। ইতিমধ্যে সারা পৃথিবীতে আমাদের শ্রমিকরা কাজের জন্য ছড়িয়ে আছেন। আমাদের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় কাজ করছে। আমাদের জনগণের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষা। এখন আমাদের পুঁজির একটা অংশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর উদ্যোক্তাদেরও ছড়িয়ে পড়তে হবে আন্তর্জাতিক বিশ্বে। নিজস্ব পরিচয়ে ব্যবসা করতে হবে। অন্যের সরবরাহকারী হিসেবেই শুধু নয়, নিজস্ব ব্র্যান্ড নিয়ে যেতে হবে বিভিন্ন দেশে। অনেকেই পুুঁজি স্থানান্তরের কথা বললে আঁতকে ওঠেন আর ভাবেন, এই বোধ হয় আমরা নিঃশেষ হয়ে গেলাম। কিন্তু আমরা সবাই এও জানি, সফল উদ্যোক্তারা স্বল্প সময়েই পুঁজিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে ফেলতে পারেন। আমাদের ব্যাংক আর ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা একসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে যে পরিমাণ পুঁজি স্থানান্তর হবে তার চেয়ে অনেক বেশি ওই সব দেশ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো মূলের দিকে ফিরে আসা। এর প্রমাণ করতে চাইলে আপনি আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন, তাঁরা কতটা অস্থির হয়ে আছেন দেশে ফিরে আসার জন্য।

এভাবে আমরা একটা উন্নত দেশে পরিণত হতে পারি। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারি। আর যাঁরা দেশের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত হানাহানি নিয়ে অস্থির আছেন, তাঁদের বলছি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি না হলে এসব আরো বাড়বে। প্রগতির বিকাশের জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক বিকাশ। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া প্রগতির মুক্তি আসে না।

মো. মশিউর রহমান, ব্যাংকার