ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

শ্রমিকদের কাজের ধরন অনুযায়ী দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে আছেন সাদা কালার, আর অন্যভাগে আছেন নীল কালার। সাদা কালারের শ্রমিকরা ব্যবস্থাপনার কাজে অংশগ্রহণ করেন আর নীল কালারের শ্রমিরা কায়িক পরিশ্রম করেন। শ্রমিকের অধিকার বলতে আমরা সাধারণত নীল কালারের শ্রমিকের অধিকারকেই বুঝিয়ে থাকি। যদিও বাস্তবে সাদা কালারের শ্রমিকরাও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হন। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা না বলার স্বাধীনতা তাদের থাকে না। যেমনটা কর্পোরেট জগতে দেখা যায় খুব কম ক্ষেত্রেই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপকরা তাদের ভাল লাগা না লাগা প্রকাশ করতে পারেন।

সাদা কালার এর শ্রমিক নির্যাতনে ব্যবহার করা হয় টার্গেট এর নামে উচ্চ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু খুব কম সময়ই উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ইনোভেশন কিংবা পন্য ও সেবার গুনগত পরিবর্তন করা হয়। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ছাড়াই শিল্পের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে অধিক মাত্রায় প্রবৃদ্ধির টার্গেট করা হয় আর সেই টার্গেট পূরণের জন্য চলে মানসিক নির্যাতন।

স্বজনপ্রীতি হল আরেকটি নির্যাতনের হাতিয়ার। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অধিক যোগ্যদের চেয়ে কম যোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় কিংবা দ্রুততম সময়ে পদোন্নতি দেয়া হয় শুধুমাত্র স্বজনপ্রীতির কারনে। স্বজনপ্রীতিতেও আসছে বিশেষ ধরনের পরিবর্তন। এক সময় স্বজনপ্রীতি বলতে কেবল আত্মীয়প্রীতিকেই বুঝানো হত, এখন অন্য এক ধরনের স্বজনপ্রীতি যোগ হয়েছে। আর তা হল ব্যবস্থাপনা সিন্ডিকেশন। ব্যবস্থাপনা সিন্ডিকেশন হল, কোন এক ব্যবস্থাপনার অধিনে সমমনা কিছু লোকের সিন্ডিকেশন। সাধারণত এরা প্রতিষ্ঠানের অন্যদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে এবং সময় সুযোগ পেলে অন্যদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে। এরা প্রতিষ্ঠানের ভাল-মন্দের সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে তৃতীয় কোন স্থানে। আনুষ্ঠানিকতা দেখানোর জন্য প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সভা করলেও অন্যদের কথা বলার সুযোগ দেয় না অথবা ঐ সিন্ডিকেট এর বাইরে কেউ কথা বললে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

সাদা কালার এর শ্রমিকদের নির্যাতনের তৃতীয় ধাপ হল লেটসিটিং। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় আট (৮) ঘন্টাকে কর্মের জন্য সর্বজন এবং আইন স্বীকৃত নির্ধারিত সময় হলেও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চলে লেটসিটিং এর প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতাকে বৈধতা দেয়ার জন্য প্রচালিত কিছু দুষ্ট বাক্য ব্যবহার করা হয়। যেমন, আসার সময় আছে কিন্তু যাওয়ার সময় নেই। জীবনে ভাল কিছু করতে হলে সময় গুনে কাজ করলে চলবে না ইত্যদি। মূলত যোগ্যতার সঠিক মাপকাঠি হয় না বলেই চলে লেটসিটিং এর প্রতিযোগিতা, যা পরক্ষণে সামাজিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন এবং পারিবারিক জীবনকে ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এতক্ষণ সাদা কালার এর শ্রমিক নির্যাতনের বিষয়ে কয়েটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল বর্ণনা করা হল মাত্র।

এখন দেখা যাক নীল কালার এর শ্রমিকদের সাথে কি কি অন্যায় করা হয়। নীল কালার এর শ্রমিকরা সাধারণত কম শিক্ষিত, কখনও কখনও কোন প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই থাকে না। তাই এরা ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নিতে অন্যের দ্বারস্ত হয়। তবে একটা জিনিস খুব ভালোভাবেই এরা বুঝে, আর তা হলো শারীরিক নির্যাতন, কষ্ট দেয়া। ঘুমের অভাবে নির্যাতন হয় কিংবা অসুস্থতায় চিকিৎসা না হলে কষ্ট হয়। খাদ্যের অভাবে শরীর দুর্বল করে দেয়। ভালো বাসস্থান না পাওয়ার কষ্ট যন্ত্রণা দেয়। মূলত অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নীর কালার এর শ্রমিকরা তাদের আয় দিয়ে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না।

নীল কালার এর শ্রমিকদের নির্যাতনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ন্যায্য মজুরি না দেওয়া। আমাদের দেশের গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে অনেক কথা হলেও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকারের বিষয় তেমন কোন কথাই হয় না। যেমন, ইট ভাটায় যারা কাজ করেন তাদের কাজ শুরু হয় ভোর পাঁচটায় আর চলে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। অথচ একজন শ্রমিক মজুরি পান মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা! এই শ্রমিকরা ইচ্ছা করলেই অন্যত্র যেতে পারেন না। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় এরা মালিকের কাছ থেকে দাদন নিয়ে থাকেন অগ্রিম ভিত্তিতে এবং শ্রমের বিনিময় তা পরিশোধ করে থাকেন। অর্থাৎ দাদন তাকে বাধ্য করে অল্প পরিশ্রমে কাজ করতে।

একইভাবে আমরা দেখতে পাই নির্মাণ শিল্পেও শিশু এবং নারীদের ব্যবহার করা হয় কম মজুরির বিনিময়ে। পরিবহন খাতে বিশেষ করে টাউন সার্ভিস এ শিশুদের ব্যবহার করা হয় আর খুব সামান্যই মজুরি দেয়া হয়।

নির্যাতনের আর একটি ধাপ হল খারাপ ব্যবহার, নীল কালারের শ্রমিকদের সাথে মালিকপক্ষ খুব কমই ভাল ব্যবহার করে থাকেন। কেউ কেউ আবার বলে থাকেন শ্রমিক চালাতে হলে মুখ খারাপ করতে হয়। মুখের কথায় তাই বিষ মিশানো থাকে। খারাপ ভাষা যে কখনও কখনও মানুষকে মানুষিক অসুস্থ করে ফেলে সে কথা খুব কমই ভাবা হয়।

এতক্ষণ নির্যাতন এর কয়েকটি মাত্র উপায় বর্ণনা করা হল। এতসব নির্যাতনের পরিণতিতে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠানকে আর নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করেন না। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, কর্ম শুধুমাত্র আয়ের একটি রাস্তা মাত্র, প্রতিষ্ঠানকে ভালবাসেন না। অথচ পৃথিবীতে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে শ্রমিকরা বলে থাকেন “আমাদের প্রতিষ্ঠান”, “আমাদের ব্যবসা”। কারণ সেখানে নির্যাতন নয় বরং ইনোভেশনকে গুরুত্ব দেয়া হয়। মানুষের জীবনকে বুঝতে চেষ্টা করা হয়। ন্যায্য মজুরি দেয়া হয়। মাসের শুরুতেই বেতন দেয়া হয়। শ্রমিকের ঘাম শুকানেরা আগেই মজুরি দেয়া হয়। যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয়। সবার মধ্যে ঐক্য আর ভাতৃত্ব বোধকে জাগ্রত করে ধরে রাখা হয়। তাইতো শ্রমিকরা বলে আমি কাজ করি “আমাদের প্রতিষ্ঠানে”। অথচ আমাদের মত অনেক দেশেই বলা হয় কাজ করি মালিকের প্রতিষ্ঠানে। আমি শুধু কর্মজীবী, সদস্য নয়। স্বাভাবিকভাবেই যেখানে আন্তরিকতা থাকে না সেখানে দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি হয় না।