ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

ব্যাংক হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার মূলধনের তুলনায় দায়ের পরিমাণ ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি হয়। অন্য সাধারণ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেখানে ঋণ ও মূলধনের অনুপাত ১:১ কে মানসম্মত ধরা হয়, সেখানে ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঋণ (আমানত) ও মূলধনের ১০:১ অনুপাতকে মানসম্মত ধরা হয়। অর্থাৎ এক টাকা যেখানে মূলধন সেখানে দশ টাকা পর্যন্ত ঋণ (আমানত) গ্রহণযোগ্য। এটাই হচ্ছে অন্য সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংক এর একটি মৌলিক পার্থক্য।

যেহেতু ব্যাংক সাধারণ মানুষের টাকা নিয়ে ব্যবসা করে তাই তার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভিন্ন হয়। স্বাভাবিক ভাবেই ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্থ হলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় আমানতকারীরা এবং পরোক্ষভাবে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ব্যাংকসমূহের সংগঠন ব্যাসেল কমিটি অন ব্যাংকিং সুপারভিশন ১৯৭৪ সাল থেকে কাজ করে আসছে। এই সংগঠনটি সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেল শহরে অবস্থিত এবং সে অনুযায়ী এর নামকরণ করা হয়েছে।

যাই হোক, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক পতনের পর ব্যাসেল কমিটিও অনুভব করল ব্যাংকগুলোকে সুপারভিশনের জন্য ব্যাসেল- আর সক্ষম নয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাসেল- নামক নতুন গাইড লাইন প্রকাশ করে তারা। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১৫ সাল থেকে ব্যাসেল-৩ গাইডলাইন বাস্তবায়ন করে আসছে।

Flags of international countries hand from poles outside the headquarters of the Bank for International Settlements (BIS) in Basel, Switzerland, on Tuesday, June 25, 2013. Mark Carney, chairman of the Financial Stability Board (FSB) and the next Bank of England governor, said global regulators will set up a task force with banks in a bid to repair or replace tarnished benchmarks in the wake of Libor and other rate-rigging scandals. Photographer: Gianluca Colla/Bloomberg

‘টাওয়ার বিল্ডিং’, ব্যাসেল, সুইজারল্যান্ড

ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে তাদের ঝুঁকিকৃত সম্পদের যথাক্রমে ১০.০০%, ১০.৬২৫%, ১১.২৬%, ১১.৮৭৫% এবং ১২.৫০%। যেখানে ব্যাসেল-২ অনুযায়ী ব্যাংক সমূহকে তাদের ঝুঁকিকৃত সম্পদের ১০% মূলধন সংরক্ষন করতে হত, সেখানে ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ব্যাংক সমূহকে ক্রমান্বয়ে ২.৫০ শতাংশ মূলধন বাফার সংরক্ষণ করতে হবে। আর এটাই হচ্ছে ব্যাসেল-২ এবং ব্যাসেল-৩ এর একটি মৌলিক পার্থক্য।

এখন দেখা যাক বাংলাদেশের ব্যাংক সমূহের একটি তুলনামূলক চিত্র এবং ব্যাংক ফেল করার কারণ।

প্রথমেই নজর দেয়া যাক মন্দ ঋণের দিকে। বাংলাদেশে বর্তমানে নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) বা মন্দ ঋণের পরিমাণ হল ৬৫,৭৩১ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ১০.৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট অবলোপনকৃত মন্দ ঋণের পরিমাণ ১,১০,০০০ কোটি টাকা। আমরা যদি এই অবলোপনকৃত ঋণকে হিসাবায়ন করি তাহলে মোট মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১,৭৫,৭৩১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৩.৫৬ শতাংশ। এ থেকে স্পষ্টভাবেই বলা যায় বাংলাদেশে মন্দ ঋণের অবস্থা বেশ খারাপের দিকে।

মন্দ ঋণের কারণে ছয়টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় পরিমাণ আয় থেকে জমা সংরক্ষণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো হল- সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক। স্বাভাবিক ভাবেই মন্দ ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, আর বেশি পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়।

পরক্ষণে আমরা দেখতে পাই, নয়টি ব্যাংক ব্যাসেল-অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো হল- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামি ব্যাংক।

AAEAAQAAAAAAAASUAAAAJDczM2Q3NjgyLTQ1ZmUtNDA0Mi05ZWZjLTVmMzk3NDZmMTg3NQ

.

এখানে দেখা যাচ্ছে যে ব্যাংকগুলো মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জমা সংরক্ষণ করতে পারছে না তাদের বেশিরভাগই আবার ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না। তাই এই কথা বলা যায় কোন ব্যাংক তখনই ঝুঁকিগ্রস্থ ব্যাংকে পরিণত হয় যখন মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। মন্দ ঋণ একসময় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্থ করে, যেটা আমরা দেখেছি ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী।

এখন দেখা যাক মন্দ ঋণের কারণ কি?

২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি মন্দঋণ আছে এমন ২০টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে এক বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে বেসরকারী ব্যাংকের এক এমডি জানান “বড় কয়েকজন গ্রাহক ঋণ নিয়ে পাচার করেছে। তারা মালয়শিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধায় বাড়ি কিনে সেখানে বসবাস করছেন, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারছি না।”

গত কয়েক দিন আগে পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে অন্য এক ব্যাংকের এমডি জানান, “ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা।” এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাই এক সময় মন্দঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

গত ৫ এপ্রিল, ২০১৭ তারিখে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরস্পরের জোগসাজোসে ৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চার কর্মকর্তা সহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। অন্য আরেক রিপোর্টে উঠে আসে ভোগ্যপণ্যে অন্যতম জায়ান্ট নূরজাহান গ্রুপের বিরুদ্ধে ৬২৮ কোটি টাকা অনাদায়ে মামলা করেছে রূপালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা। একই সময় দেখা যায় বেসিক ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কামার্স ব্যাংক মন্দ ঋণের কারণে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। রিপোর্টটি প্রকাশ হয় বনিক বার্তায়।

সবগুলো কারণ কে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মন্দ ঋণের অন্যতম কারণ হল নৈতিকতার অধঃপতন। কিছু মানুষের অতিরিক্ত ধন অর্জনের চেষ্টা তাদের নৈতিকতা বিসর্জন দিতে বিবেক কোন অবস্থাই বাধা না দেয়া এবং এই সমস্ত অনৈতিক মানুষদের দেখাদেখি আরও বেশি সংখ্যক মানুষ নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে।

নৈতিক অবক্ষয় দুইদিক থেকেই হচ্ছে। একদিকে যেমন কিছু অসৎ ব্যাংকারদের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। অন্যদিকে নৈতিকতাবিহীন কিছু ব্যবসায়ী গড়ে উঠছে, যারা ব্যাংক ঋণ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে সামন্যই পাত্তা দেয়। তাই যতদিন পর্যন্ত না মানুষের মধ্যে নৈতিক ভিত্তি দাঁড় করানো যাবে কিংবা যে কোন ধরনের অর্থ উপার্জনের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া যাবে, ততদিন পর্যন্ত মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, ব্যাসেল-কিংবা ব্যাসেল-এর কোথাও নৈতিক সংস্কৃতি বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলা হয়নি যেটাকে আমরা সংক্ষেপে বলি ইথিকাল ব্যাংকিং বা নৈতিক ব্যাংকিং। তাই খুব সহজেই বলা যায় ব্যাসেল-৩ ও ব্যাসেল-২ এর মত ব্যর্থ হবে। খারাপ মানুষগুলো আবার নতুন করে পরিকল্পনা করার জন্য একটু দম নিচ্ছেন হয়তো।

মোঃ মশিউর রহমান, ব্যাংকার।