ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

Banking_130413

.

যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গ ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এর বাইরে অবস্থান করছেন তাদেরকে ব্যাংকিং নেটওয়ার্কে নিয়ে আসার নামই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একদিকে যেমন সঞ্চয় সংগ্রহ করে মূলধন বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তরান্বিত করে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং এর বাইরে উদ্ভাবনী ব্যাংকিং এর প্রয়োজন। উদ্ভাবনী ব্যাংকিং হতে হবে কম ব্যয়বহুল, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং নিরাপদ। ব্যয়বহুল ব্যাংকিং সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করবে না, তা যতই আধুনিক হোক না কেন। অন্যদিকে সহজে ব্যবহার করা না গেলে অর্ধশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করবে না। আর নিরাপত্তা হল ব্যাংকিং এর শক্তি কিংবা বিশ্বস্ততার প্রতীক। অনিরাপদ ব্যাংক এ কেউ টাকা জমা রাখে না।

বর্তমানে বিকাশ কিংবা রকেট এর মত মোবাইল ব্যাংকিং এর বহুল প্রচলন হলেও তা অনেক ব্যয়বহুল এবং অর্থ স্থানান্তরের জন্যই মূলত ব্যবহার হয়। তাই মোবাইল ব্যাংকিং যথেষ্ট আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। অপরদিকে সহজ ব্যবহার উপযোগী নয় বলে ইন্টারনেট ব্যাংকিং এর ব্যবহারও জনপ্রিয় নয় আমাদের দেশে।

তবে আশার কথা হল, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭৬ শতাংশের বিদ্যুৎ সুবিধা রয়েছে, মোট মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৩∙১৯ কোটি এবং ইন্টারনেট ইউজার প্রায় ৬∙১৩ কোটি। (সুত্রঃ বিটিআরসি ও ২০ তম জাতীয় কাউন্সিল)। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে ব্যাংকগুলো খুব সহজেই প্রযুক্তি আর কম দামের শ্রমিকের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক এবং উদ্ভাবনী ব্যাংকিং এর মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি তরান্বিত করতে পারে। এখানে তারই কয়েকটি সম্ভাবনা বর্ণনা করা হল-

প্রথমত, সমস্ত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু হিসাব খোলার মাধ্যমে একজন গ্রাহক আর ব্যাংকের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং ব্যাংক হিসাব খোলা তেমন কোন কঠিন কাজ নয় তাই ব্যাংকগুলো খুব সহজেই এ কাজে হাত দিতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নির্বাচন কমিশনের ভোটারলিস্ট তৈরি করা কিংবা মোবাইল কোম্পানিগুলোর সিম রেজিস্ট্রেশন এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। অর্থাৎ অল্প অর্থের বিনিময় বেকার জনগোষ্ঠী কিংবা ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের হিসাব খোলার ব্যবস্থা করতে পারে। ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সামান্য অর্থের বিনিময় শুধু ছবি আর জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে হিসাব খুলতে পারে। ছবি তোলার জন্য ব্যাংকগুলো নিজস্ব ক্যামেরা কিংবা কামেরাসহ ট্যাব ব্যবহার করতে পারে।

এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো হিসাব খোলার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো কিছু স্লোগাল যেমন- আর নয় ট্রাঙ্কে, টাকা রাখুন ব্যাংকে; নিরাপত্তায় আর বিশ্বস্ততায় ব্যাংক- ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারে।

উল্লেখ্য যে, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন লেনদেন যদি ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সম্পন্ন করে থাকে তাহলে ব্যাংক খুব সহজেই অল্প খরচে অর্থ পেয়ে যাবে। যত বেশি ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার হবে ব্যাংক তত বেশি কম খরচে অর্থ পাবে। আর সমস্ত মানুষ যদি তাদের সমস্ত লেনদেন ব্যাংকের ম্যাধমে করে তাহলে ব্যাংকগুলো অসীম পর্যায় তাদের ঋণ ও আমানত বাড়াতে পারবে, যা হবে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোকে প্রাথমিক পর্যায় কিছু খরচ করতে হবে যা ভবিষ্যতে লাভ আকারে ফেরত আসবে। এই অর্থ ব্যয় করতে হবে হিসাব খোলার জন্য মানব সম্পদের পিছনে, হিসাবের তথ্য ধারণ করার জন্য সার্ভার এর পিছনে এবং সফটওয়্যার ক্রয় করার জন্য। এজন্য ব্যাংকগুলোকে ‘বর্তমানে ব্যয় কর আর ভবিষ্যতে আয় কর’ এই তত্ত্বে পরিচালিত হতে হবে।

তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলো সহজ আর নিরাপদ লেনদেনের জন্য নতুন ধরনের অ্যাপস (অ্যাপ্লিকেশান) তৈরি করতে পারে যা সপ্তাহে ২৪/৭ খোলা থাকবে এবং যেকোনো প্রয়োজনে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে। এ ধরনের অ্যাপস এর একটি উদাহরণ হতে পারে নিম্নরূপ-

হিসাব নং …………………

টাকা ………………………

স্থানন্তরের কারণ …………

পাসওয়ার্ড ………………..

এন্টার

এভাবে একটি সহজ অ্যাপ এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খুব সহজেই এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে যেকোন প্রয়োজনে অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা দিতে পারে। অর্থ স্থানান্তরের পর প্রয়োজনে মেসেজ এর ব্যবস্খাও থাকতে পারে, যা অর্থের নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে দিবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি লেনদেনের কারণসহ বর্ণনা থাকবে বিধায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় এবং আধুনিক এমআইএসও তৈরি করতে পারবে যা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিতে কাজে আসবে।

এভাবেই ব্যাংকগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়কে আরও তরান্বিত করতে পারে, যা অনেক বেশি কার্যকর ও দেশের জন্য অর্থনৈতিক মঙ্গল বয়ে আনবে।

মোঃ মশিউর রাহমান, ব্যাংকার