ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

ব্যাংক সাধারণ জনগণের অর্থের আমানতদারি এবং সে অর্থ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ধার দিয়ে থাকে। অন্য সাধারণ ব্যবসায় থেকে ব্যাংক ব্যবসায়ের একটি মৌলিক পার্থক্য হল ব্যাংকের দায়ের পরিমান মূলধন অপেক্ষা ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি হয়ে থাকে, পক্ষান্তরে অন্য সাধারণ ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে দায়ের পরিমান সর্বোচ্চ মূলধনের সমান থাকাকে কাম্য মনে করা হয়। উল্লেখ্য যে, ব্যাংকের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান সম্পদ হল মানবসম্পদ এবং তথ্যপ্রযুক্তি। এ দুটি সম্পদ যার যত ভাল সে ব্যাংক তত উন্নত। মানবসম্পদের ক্ষেত্রে যেমন দক্ষতা প্রয়োজন তেমনি দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োজন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে ব্যাংক মূলত দুর্বল ব্যাংকে পরিণত হয় যখন মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে মন্দ ঋণ বাড়ার প্রধানতম কারণ ঋণ দেয়ার পূর্বে দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ঋণ মনিটরিং এর অভাব। এ দুটি কারণকে প্রভাবিত করে আরেকটি কারণ, আর তা হল নৈতিকতা। এ থেকে বুঝা যায় ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার গুরুত্ব কত বেশি! এখন দেখা যাক ব্যাংকিং এর বিভিন্ন ধাপে কি ধরনের নৈতিকতা অনুসরণীয়-

গ্রাহকের প্রতি প্রতিশ্রুতি:

কথায় আছে, সৃষ্টির সেবায় স্রষ্টার সান্নিধ্য। গ্রাহক সে তো ব্যাংকারের জন্য অনেক বেশি আকাঙ্ক্ষিত, তাই দায়িত্বশীল আচরণ অবশ্য কর্তব্য। এ কারণে প্রতিটি প্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে। ব্যাংকারকে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে কি করে আরও উন্নত সেবা দেয়া যায়, এজন্য প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। যারা পরিচালনায় থাকবেন তাদেরকেও লক্ষ্য রাখতে হবে মানবসম্পদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয় এবং একইসাথে দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়ও। গ্রাহকের কাজ থেকে কোন অভিযোগ আসলে যত দ্রুত সময় সম্ভব তার সহজ ও আইনসম্মত সমাধান দিতে হবে। একই ভুল যেন বার বার না হয় সে বিষয়ও ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।

সততা ন্যয়পরায়নতা:

ব্যাংকারকে সর্বোচ্চ মানের সততা ও ন্যয়পরায়নতা ধরে রেখে গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা উচিৎ। গ্রাহকের মনে এই বিশ্বাস জন্মাতে হবে যে, ব্যাংকার সততা ও দক্ষতার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ব্যাংকারেরও এই নিশ্চয়তা থাকতে হবে যে, গ্রাহক তার সাথে সর্বোচ্চ মানের সম্মানের সাথে আচরণ করছে। ব্যাংকারকে অবশ্যই ব্যক্তিগত বিতর্কের উর্ধে উঠে গ্রাহক ও মালিক পক্ষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ধরে রাখার স্বাধীনতা ব্যাংকারের থাকতে হবে। প্রয়জনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট অবৈধ লেনদেনের বিষয় অবহিত করার স্বাধীনতাও থাকতে হবে।

গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা:

গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যা অন্যান্য সম্পর্ক থেকে ব্যাংকার ও গ্রাহকের সম্পর্ককে আলাদা করে। কোন অবস্থাতেই গ্রাহকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত অথবা আইনসঙ্গত কারণ ব্যতীত তৃতীয় কোন পক্ষের নিকট গ্রাহক সম্পর্কে কোন তথ্য দেয়া সঙ্গত নয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকারকে গোপনীয়তা সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন ও আইন যথাযথ ভাবে অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকারকে যদি তৃতীয় কোন পক্ষের নিকট থেকে সহায়ক সেবা নিতে হয় সেক্ষেত্রেও একই ধরনের গোপনীয়তা বজায় রাখার চুক্তিতে সেবা নিতে হবে।

সকল গ্রাহকের প্রতি সমান ন্যায়সঙ্গত আচরণ:

ব্যাংকারকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে, সকল গ্রাহকের প্রতি সমান ও ন্যায় সঙ্গত আচরণ করা হচ্ছে। ব্যাংকারকে এ ক্ষেত্রে বিনয়ী ও সদাচারী হতে হবে এবং একইসাথে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতিও দৃষ্টি রাখতে হবে।

স্বচ্ছতা:

ব্যাংকিংয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উত্তম পন্থা হল ব্যালেন্সিং ও স্বচ্ছ এমআইএস। এর বাইরেও ব্যাংকার যে সকল পণ্য ও সেবার প্রস্তাব করবে সে বিষয়ের সুবিধা ও ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা থাকতে হবে। গ্রাহকের সাথে যেকোনো চুক্তি করার পূর্বে চুক্তির বিষয়বস্তু স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং লিখিত হতে হবে। চুক্তির কোন বিষয় কিংবা ঋণের পরিবর্তনের বিষয় গ্রাহককে জানাতে হবে এবং গ্রাহকের সম্মতি পাওয়ার পরেই তা কার্যকর করতে হবে। যেকোনো ধরনের ফি ও চার্জ সংক্রান্ত তথ্য ব্যাংকের নোটিশ বোর্ডে ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

উপহার গ্রহণ:

পৃথিবীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে উপহার দেয়ার প্রক্রিয়ায়ও পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাই ব্যাংকারকে উপহার গ্রহণের বিষয় সচেতন থাকতে হবে এবং কোন ধরনের উপহার গ্রহণ না করাই যৌক্তিক। বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কোন ব্যাংকার উপহার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে না পারে সেক্ষেত্রে তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে কোন অবস্থাতেই উপহারের কারণে সিদ্ধান্ত যেন পরিবর্তন না হয়।

কর্পোরেট গভর্নেন্স:

ভাল ব্যাংকের পূর্বশর্ত ভাল কর্পোরেট গভর্নেন্স। যে ব্যাংকের কর্পোরেট গভর্নেন্স যত ভাল সে ব্যাংক তত উন্নত। তাই ‘কাজের বিনিময় দায়িত্ব’ এই স্লোগান কর্পোরেট গভর্নেন্সকে শক্তিশালী করে। এক্ষেত্রে প্রতিটি বিভাগ ও শাখার দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা থাকতে হবে এবং সে অনুযায়ী জবাবদিহিতাও থাকতে হবে। একজন কর্মী অন্য আরেকজন কর্মীর সাথে কিরকম আচরণ করবে তারও স্পষ্ট গাইডলাইন থাকতে হবে।

মোঃ মশিউর রহমান, ব্যাংকার