ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

১০ই ডিসেম্বর প্রতিদিনের মত সকালে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় একটি ছবি দেখে আমার শরীর শিউরে উঠল। ছবিটিতে দেখলাম এক নিরীহ পথচারীকে পাঁচ-ছয় জন মানুষরূপী হায়েনা নির্বিচারে আঘাত করছে। আঘাতে তার শরীর থেকে প্রবাহিত তাজা রক্তে রঙ্গিন হয়ে গেছে শার্ট, কিন্তু তারপরও পাষাণের মন ভরেনি। শেষপর্যন্ত তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে নিজেরা বীরদর্পে পালিয়ে গেছে। পত্রিকা পড়ে বুঝতে পারলাম এই নিরীহ বেচারীর নাম বিশ্বজিৎ দাস। পেশায় একজন দর্জি। কোন রাজনৈতিক দলের সাথে তার যোগসাজোশ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকান্ডের নির্মম বলি সে। বিশ্বাজিৎ একজন সাধারন দর্জি। কাস্টমারের ফোন পেয়ে টেইলার্সে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। আর এই বের হওয়াই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। মৃত্যুর মাধ্যমে সে দেশবাসীকে জানিয়ে দিয়ে গেল শুধু তার মত ‘বিশ্বজিৎরাই মরবে’। রাজনীতির ফাক-ফোকরে শুধু বলির স্বীকার হবে নিরীহরাই। কিন্তু বিশ্বজিৎদের যারা মারল তাদের কোন বিচার হবে কি?

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি এতটাই নোংরা পর্যায়ে পৌছে গেছে যে এর মাধ্যমে শুধুমাত্র স্বার্থ হাসিলের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। আর এই স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে অকাতরে ঝড়ে যাচ্ছে কিছু নিষ্পাপ প্রাণ, যাদের রাজনীতি নিয়ে কোন মাথাব্যথাই নেই। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি হল গরীবের পেঠে লাথি মারার রাজনীতি। একদল হরতাল দেবে, অবরোধ ডাকবে, অন্যদল প্রতিরোধ করবে, মাঝখান থেকে দিনমজুররা উপার্জণ করতে না পেরে থাকবে অনাহারে। বিশ্বজিৎ সেই অভাগাদের একজন যে দু’পয়সা উপার্জনের আশায় ঘর থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু হায়েনারা তাকে কর্মস্থলে যেতে দেইনি, চালিয়েছে তার উপর অজ¯্র নির্যাতন। শত কাকুতি মিনতি করেও বিশ্বজিৎ রক্ষা করতে পারেনি তার প্রিয় জীবনটিকে। হায়রে রাজনীতি, হায়রে সরকারি দল, হায়রে বিরোধীদল, যে জনগণের কল্যাণের কথা বলে তারা রাজনীতি করছে সেই জনগণই হচ্ছে আজ রাজনীতির নির্মম বলি।

কিন্তু জনগণ কি এই রাজনীতি চায়? জনগণ কি এই ছাত্রসমাজকে চায় যারা নির্বিচারে তার ভাইকে হত্যা করবে? যদি জনগণের কল্যাণেই রাজনীতি হয় তাহলে দু’পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় জনগণের এই দুর্ভোগ কেন? সহিংসতার মাধ্যমে কি কল্যাণ বয়ে আনা সম্ভব? কেনই বা রাজনৈতিক দলগুলো সহিংসতার পথ বন্ধ করে সমঝোতার পথ বেছে নিচ্ছেনা? উত্তর একটাই। সেটা হচ্ছে স্বার্থ এবং আধিপত্যবাদী মানসিকতা। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা আজ আধিপত্য বজায় এবং নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যস্ত। জনগণকে সুখের গল্প শুনিয়ে ভোট আদায় করাই তাদের বিশেষ চরিত্র। আজকের রাজনীতি শুধু দলীয় আনুগত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে জনকল্যাণের লেশমাত্র নেই। যে দলের জন্য চাপাবাজি করবে, যে দলের জন্য মানুষ খুন করবে, যে দলের জন্য রিভালবার, চাপাতি, হকিস্টিক ধরবে সেই হবে দলের ত্যাগী নেতা। এই হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনীতির বর্তমান চিত্র।

কিন্তু আমরা যারা সাধারণ আমজনতা তারা এই অবস্থার পরিবর্তন দেখতে চাই। আমরা দেখতে চাই এমন রাজনীতি যেখানে সহিংসতা না থেকে থাকবে সমঝোতা। আমরা চাই এমন রাজনীতি যাতে বিশ্বজিৎদের আর নির্মম বলির স্বীকার হতে না হয়। আমরা চাই এমন রাজনীতি যেখানে মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। রাজনীতি হতে হবে গঠনমূলক। ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালিত হলে আমাদের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হতে পারে। তাই বিজয়ের এই মাসে আমাদের উচিৎ ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পরিত্যাগ করে পারস্পরিক সমঝোতার সম্পর্ক গড়ে তোলা। মনে রাখতে হবে এমন কোন সিদ্ধান্ত এই মুহুর্তে নেয়া ঠিক হবেনা যার মাধ্যমে দেশ বিশ্ব দরবারে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত হয়। সরকারি দলের উচিৎ হবে বিরোধী দলের দাবিগুলোকে সম্মান জানানো। আবার বিরোধী দলেরও উচিৎ হবে সরকারকে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনায় সহায়তা করা। দেশের জাতীয় স্বার্থগুলোতে দুই দলকে একই প্লাটফর্মে দাঁড়াতে হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যতদিন না মতানৈক্য দুরীভূত হবে ততদিন অস্থিতিশীলতা চলতেই থাকবে, যার নির্মমতার স্বীকার হবে নিরীহ জনগণ। যেটা কোনভাবেই মেনে নেয়ার মত নয়।

***
ফিচার ছবি: ভিডিও (লিংক) থেকে নেয়া ’স্ক্রিন ক্যাপচার’

১২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বিপ্লব সরকার বলেছেনঃ

    বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতালিপ্সু সকল রাজনৈতিক দলগুলোর নোংরা ও পৈশাচিক কর্মকান্ডের সর্বশেষ বলি হচ্ছে হতভাগা বিশ্বজিত দাস। এই কসাই দলগুলো ও তাদের গুন্ডা-মাস্তানদের হাতে আমাদের ততদিন নির্মম মৃতু্র মিছিল দেখতে হবে- যতদিন না আমরা আমরা এই জল্লাদদের প্রতিরোধ না করি।
    সবাইকে মনে রাখতে হবে, আপনার পাশের বাড়ির আগুনে কিন্তু আপনিও আক্রান্ত হতে পারেন-যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে।

  2. Bashar বলেছেনঃ

    মেনি মেনি থ্যাংকস ফর রাইট দিস। আওয়ার কান্ট্রি পিপল স্টিল ডু নট নো এবাউট আওয়ার কান্ট্রি’স কালিপ্রিট পলিটিশিয়ান’স হোয়াট দে লাইক টু ডু। দে অলওয়েজ লাইক টু সি নরমাল পিপল ব্লাড। দে আর কিলারস সো কিলার লাইক টু সি ওনলি ব্লাড। উই আর ভেরি স্যাড ফর ফ্যামিলি’স অফ বিশ্বজিৎ। আওয়ার গভমেন্ট ক্যান নট সেইভ হিম।
    থ্যাংকস
    বাশার
    সিংগাপুর

  3. শিকদার দস্তগির বলেছেনঃ

    ” কিন্তু আমরা যারা সাধারণ আমজনতা তারা এই অবস্থার পরিবর্তন দেখতে চাই। ”
    প্রিয় লেখক, আপনি সুন্দর একটা বাখ্য লিখেছেন । এরকম অনেক মূল্যবান বাক্য লিখে আমরা মনে করি, খুব ভাল একটা কাজ করে ফেলেছি । এই মূল্যবান কথাগুলো টিভি টকশো , পত্রপত্রিকায় বুদ্ধিজীবি বলে খ্যাত বুদ্ধির ফেরীওয়ালাদের বাহারী বাহারী সব কথা মালা -পথে , ঘাটে, মাঠে , বাটে, অফিসে, আদালতে, চায়ের আড্ডায় — এমন কোন স্থান নেই যেখানে আলোচিত হয় না, বড় বড় শিরোনাম দেখি নামকরা সব গবেষকদের বিশাল বিশাল কলামজুড়ে । অথচ আমরাই ঘুরে ফিরে টাউট বাটপার, চরিত্রহীন লোকদেরকে ভোট দেই । কাউকে পাঠাই আ,লীগ রূপে, কাউকে পাঠাই বি এন পি রূপে । তাহলে বলুনতো জনাব, আমরা কি চাই ? চলমান এই অবস্থার পরিবর্তন দেখতে চাই ? অতএব, কথা খুব পরিস্কার- আসলে আমরা আমজনতা, আমাদের নিজেদের মত করে পরিবর্তন চাই, অতটুকু পরিবর্তন চাই, যতটুকু আমার স্বার্থের অনুকুলে থাকবে । আমরা ভাল মানুষ হতে চাইনা, ভাল মানুষ সাজতে চাই । তাই আমরা ভালমানুষরা নেতৃত্ব দিতে চাই না , আমরা চাই নেতৃত্ব দিক গুন্ডা-পান্ডারা , রাষ্ট্রপরিচালনার ঝুকি নিক তারাই । আমরা ভাল মানুষরা ভাল ভাল মজাটা পেতে চাই । অসুস্থ্য মানুষকে নেতৃত্বের চেয়ারে বসিয়ে সমাজ সুস্থ্য থাকুক, আমরা তা চাই । বিষয়টা হাস্যকর নয় কি ? এ কি মামু বাড়ির আব্দার ? কেন এই হিপোক্র্যাসী ? আর এই হিপোক্র্যাসীর শাস্তিই কিন্তু এখন আমাদের সবাইকে গ্রাস করছে । কোন ভাল মানুষেরই এ থেকে পরিত্রাণ নেই । এটাই বিধির বিধান । এ বিধান লংঘিত হবার কোন উপায় নেই । অতএব, আমরা যারা ভালমানুষ সেজে বসে আছি , আর থিওরি লিখছি, তাদের ঘুম না ভাংলে আরো ভয়াবহ পরিণতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ।

  4. mashudahmedemon বলেছেনঃ

    আমােদর মেতা নাগিরকেদর এ িবষে আফসুস করা ছাড়া আর িক ই বা করার আেছ। তারপরো আশা িনেয় বুক বািধ এই জন্য েয একিদন হয়েতা বা এই সব মানুষ রুিপ হােয়নােদর মেনর দরজা খুেল আবার মানুষ হেয় িফেের আসার অেপক্ষায় থাকেবা।

  5. সজীব বলেছেনঃ

    একটু কষ্ট করবেন প্লিজ? গুগলে এটা লিখে সার্চ করবেনঃ “খালেদা জিয়ার যাত্রাবিরতি”। তারপর সার্চ রেজাল্টে আসা খবরগুলো ক্লিক করে পড়ুন (২০-২২ নভেম্বরের পুরানো খবর)। ছবিগুলো (মানবজমিন,নয়া দিগন্ত) দেখুন তো! আরে!! এতো ধারালো অস্ত্রসহ আটক বিশ্বজিৎ! ছবিগুলো এবার মিলিয়ে নিন “নিরীহ/বেচারা/সাধারণ” বিশ্বজিৎ এর সাথে। ছবিতো মিললো, কিন্তু হিসাব মেলাতে পারছি না ভাই। পলিটিক্স ইজ এ ডিফিকাল্ট থিং টু আন্ডারস্ট্যান্ড…ইউ নো।

    প্রথম প্যারাটি ছাড়া পুরো লেখার সাথে সহমত পোষণ করছি। প্রথম প্যারাটি জোকস হিসেবে নিলাম। কিন্তু বাকিটুকু ১০০ ভাগ সত্যি। নির্মমতার স্বীকার হবে নিরীহ জনগণ এটা কোনভাবেই মেনে নেয়ার মত নয়। লেখককে ধন্যবাদ।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...