ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
বৃষ্টি হচ্ছে —ঘড়ির কাটায় তখন পৌনে দুইটা বাজে। আর একটু পরেই বন্ধ করে দেওয়া হবে হোলি আর্টিজন বেকারির অস্থায়ী বেদিটি ! ততোক্ষণে জনমানুষের দেওয়া— শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে বেদিটি । শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ভবনটি সর্বসাধারনের জন্য খুলে দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।  সকাল থেকেই নিরাপত্তা কর্মীরা ৭৯ সড়কটিতে ব্যারিকেড বসান, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন, উপস্থিত প্রতিটি মানুষকে চেক করে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয় । বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, দূতাবাস, দেশি-বিদেশি সাধারন মানুষ ঐ সময়টুকুর মধ্যে তাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিবেদন করেন। এক বছর আগের এই দিনটিতে— নৃশংস  জঙ্গী হামলায় শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন ২২ জন দেশি-বিদেশি নাগরিক। তারা জেনে যেতে পারেননি কী তাদের অপরাধ ছিল? সারা বিশ্ব সেই সময় প্রত্যক্ষ করেছে ১২ ঘন্টার সেই রুদ্ধশ্বাস জিন্মি সংকটের ঘটনা — স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল দেশবাসী, বিশ্ববাসী!
Snapseed(3)
ছবি: হোলি আর্টিজান বেকারির অস্থায়ী বেদিটির সামনে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন দুই বিদেশি । ১ জুলাই ২০১৭
নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই দিনটিতে—দেশি-বিদেশি মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা নিবেদনের পাশাপাশি তাদের প্রত্যাশার কথা বলেছেন— উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের। প্রায় সকলের বক্তব্যতেই ছিল এক রকম ; এ রকম ঘটনা যেন, আর না ঘটে । সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদের অবসান চান— সবাই। তরুণ প্রজন্ম মনে করে, মানুষের জীবনে হতাশার গল্প থাকবে।  তাই বলে বিভ্রান্তির পথ গ্রহণ করা উচিত নয়—কখনই। সত্য মিথ্যার পার্থক্যটা বুঝতে হবে।  বাবাকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন নওশীন নোভা; শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান— তখন সে আমেরিকাতে কর্মরত ছিলেন, ঘটনাটি টেলিভিশন চ্যানেলে লাইভ দেখেন এবং তার জন্য বিষয়টি ছিল খুবই— হার্টব্রেকিং। ছুটিতে দেশে ফিরেছেন এবার, আজ নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চলে এসেছেন এখানে।
শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বটি কাভার করতে আমি সেখানে গিয়েছিলাম।  থেমে থেমে পুরো চার ঘন্টার শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বটি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে আমার।  পর্বটি তখন শেষ পর্যায়ে—হঠ্যাৎ করেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হলো। যদিও সেই বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিল না! সঙ্গে ছাতা থাকায়—ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেকারিটির সবুজ লনের উপর বৃষ্টি পড়া দেখছিলাম! ফুলে ফুলে ভরা বেদিটি ততক্ষণে একটা নীল রঙের প্লাষ্টিক দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যাতে—ফুলগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে না যায় । আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন—নিরাপত্তা কর্মী, সাংবাদিক এবং শ্রদ্ধা জানাতে আসা কেউ কেউ।
তখন বৃষ্টির বেগ একটু কমে এসেছে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে— তারা প্রবেশ করলেন ! দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার—খুব ধীর পায়ে বেকারিটির সবুজ লেন এসে দাঁড়ালেন। যেখানে অস্থায়ী বেদিটি রাখা আছে। তারপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন— বেশ কয়েক মিনিট। তাদের চোখে মুখে ছিল বেদনার ছাপ— ষ্টপ্ট! দুজনের চোখ ছিল —কান্না ভেজা! বৃষ্টির পানি আর চোখের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল তখন! শ্রদ্ধা নিবেদনের পর; তারা ভবনটি ঘুর ঘুরে দেখছিলেন। সঙ্গে থাকা মোবাইলটি দিয়ে নারীটি ছবি তুললেন। হয়তো বা তাদের কোন স্মৃতি মনে পরছিল!  কিংবা  যারা এই হামলায় নিহত হয়েছেন, তাদের  পরিচিত কারো কথা বার বার মনে পরছিল তখন!
আমি তাদের দেখছিলাম—তাদের চোখে মুখে ছিল নানা প্রশ্ন। না, আমি তাদের কোন প্রশ্ন করিনি বা জিজ্ঞেস করিনি— তারা কারা, কোথায় থাকেন, কী করেন। আসলে আমার ইচ্ছা হয়নি এসব প্রশ্ন করে— তাদের বিব্রত করতে! থাকুন না তারা, তাদের মতো করে। আর তাদের চোখ- মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছিল — তাদের ভাষা, তাদের জিজ্ঞাসা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তারা তাদের মতো  করে  স্বরণ করুক দিনটিকে! হয়তো বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রে কাজ করতে এসে—তাদের স্বজন, বন্ধু বা পরিচিত কেউ তার জীবনটি হারিয়েছেন।
২০১৬ সালে পহেলা জুলাইয়ের গুলশান হোলি আর্টিজানের ঘটনাটি ছিল আতঙ্ক এবং উৎকন্ঠার— একটি রাত!  সারারাত ধরে কিছু নিরিহ দেশী-বিদেশী মানুষকে জিম্মি করে চালানো হয় নৃসংশ হত্যাকান্ড, পরেরদিন সেখানে রাষ্ট্রর পক্ষে থেকে চালানো হয়—সেনা অভিযান, যা ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে পরিচিত হয়। সংবাদ সম্মেলন করে অভিযানটি সম্পকে বিবৃতি পাঠ করে— আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ অধিদপ্তর ।
দূতাবাস  এবং নিহতদের পরিবার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল— আমাদের  রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছে কাছে তাদের নাগরিকদের কখন এবং কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল? বিশেষ করে জাপান এবং ইতালি নাগরিক বেশি সংখায় নিহত হয়েছিলেন। দেশি-বিদেশি মিডিয়া থেকে এই নৃসংশ ঘটনার নানা খণ্ড চিত্র পাই আমরা। কিন্তু সাধারনে জিজ্ঞাসা বা নিহত স্বজনদের প্রত্যাশা, আসলে কী ঘটেছিল সেদিন? কেন তাদের স্বজনদেরকে হত্যা করা হলো? কেউ কেউ যখন বেকারিটিতে জিম্মি অবস্থায় থেকে যোগাযোগ চেষ্টা করছিলেন, তাদের শেষ আর্তি কী ছিল?  কিন্তু সেই বিষয়ে এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি, কারণ বিষয়টির এখন  তদন্ত শেষ হয়নি!  হয়তো—কোন একদিন সেই  বিভীষিকার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত  চিত্রটি আমরা জানতে পাবো!
হোলি আর্টিজানে হামলার পর আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র  যদিও আগের থেকে যথেষ্ট নড়েচড়ে বসেছেন!  ইতিমধ্যে বেশ কিছু জঙ্গি বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছেন,  কিছু কিছু সফলতাও পেয়েছেন কিন্তু সাধারন মানুষের মনের  উদ্বেগটি থেকে যাচ্ছে! বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের একাধিক কর্তাব্যক্তিরা দাবি করে বলেছেন,এই জঙ্গিদের ক্ষমতা অনেকটাই নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান! তারা বিষয়টিকে সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত আকারে দেখতে চান। সাধারন মানুষ প্রত্যাশাও তাই।
ইতিমধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে! আর কর্তৃপক্ষে বেধে দেওয়া— চার ঘন্টার শোক পালনের  কর্মসুচী সময় শেষ হয়ে গেছে! আমরা উপস্থিত যারা, তারা একে একে বেড়িয়ে আসছি। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল—অস্থায়ী বেদিটি সামনে একটি ফুলদানিতে রজনীগন্ধা ফুল আর সাদা গোলাপ সাজিয়ে রাখা হয়েছে! আর সেই ফুলদানিটির  পাশে  অস্ত্র উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন—আমাদের নিরাপত্তা কর্মী বাহিনীর একজন সদস্য। আমার মনে তখন একটা প্রশ্ন জাগলো—বন্দুক আর ফুল কি সহাবস্থান করতে পারে?  এর উত্তরটি  হয়তো পাঠক খুঁজে  নেবেন কোন একদিন . . .।
লেখক : সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী

slide