ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তান সমঝোতার মাধ্যমে যে নিয়ন্ত্রণ সীমা তৈরি হয় তার নাম এল.ও.সি রেখা নামে মেনে নেয় দুই দেশ। ভারত ও পাকিস্তান। মূলত বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সেনাদের ভারত বন্দী বানিয়ে নিয়ে যায় তাদের দেশে । আর তখন পাকিস্তান ভেঙ্গে হয়ে গেল বাংলাদেশ । ১৬-১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানী বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর নিকটে অস্ত্র সমর্পণ করে পরাজয় স্বীকার করে নেয় । এর পর তাদেরকে ভারতে বন্দীদশায় পড়তে হয় । এমত অবস্থায় পাকিস্তানের ক্ষমতায় থাকা জুলফিকার আলী ভূট্টো যথেষ্ট প্রশ্নের সামনে পড়ে যান। যদিও যুদ্ধের পরাজয়কালিন সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইয়াহিয়া খান কিন্তু বাংলাদেশে তাদের সৈনিকদের পরাজয় শুধু যে বাংলাদেশের মধ্যে আনন্দের ধারা বইতে থাকে তা শুধু নয়, এর সাথে সাথে সমস্ত পাকিস্তান জুড়ে বইতে থাকে বিষাদের মেঘ। সেই মেঘের গর্জনে ইয়াহিয়া খানের পতন হয় , তিনি বন্দী হয়েছিলেন । আর বন্দীদশাতেই জনগণ তাকে পুলিশ ভ্যান থেকে নামিয়ে জুতাপেটা করতে থাকে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসেন জুলফিকার আলী ভূট্টো ।

স্বাভাবিক ভাবে তার উপর সকল দায় দায়িত্ব এসে যায়। পাকিস্তানের জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে জনাব ভুট্টো ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হোন । আর সে কারণেই ভারতের প্রতি শান্তির বার্তা প্রদান করেন ভূট্টো সাহেব নিজেই ।

২৩ এপ্রিল ১৯৭২ পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য পাক-ভারত শীর্ষ সম্মেলনকে কে মাথায় রেখে শিমলাকেই বেছে নেয়া হল বৈঠকের জন্য । ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবর্গ উপস্থিত ছিলেন, আর পকিস্তানের পক্ষে পাক রাস্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভূট্টো সহ তার মেয়ে বেনজীর ভূট্টো সহ পাক হাই কমান্ড উপস্থিত ছিলেন । অনেকটা দর কষাকষিই চলে এই চুক্তিতে । ২-৩ জুলাই ১৯৭২ সাল এই দুই দিন ছিল শিমলা চুক্তির আলোচনা ও হস্তাক্ষর ।

কী হয়েছিল সেই চুক্তিতে?

২ জুলাই ভারতীয় সময় ১০.৩০ মিনিট থেকে রাত ১২.৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে এই চুক্তি । চুক্তির জন্য আসা পাক প্রধান ছিলেন বিষন্ন ও হতাশাগ্রস্থ, অপরদিকে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বেশ ফুরফুরে মেজাজে । এমন সময়ে ভারতের জনগণ মনে করেছিল হয়ত কাশ্মীর বিষয়ের চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে চলেছে । আসলে পাকিস্তান খুব চাপে পড়েই এই চুক্তির জন্য ছুটে আসে । কেননা, পাকিস্তানী সেনাদের বড় চাপ ছিল ৯৩ হাজার বন্দীদের ফিরিয়ে নেয়া, দেশের জনগণকে সামলাতে আর পাক যোদ্ধা পরিবারকে শান্তনা দিতেই ভূট্টো সাহেব ভারতের মাটিতে ছুটে আসেন ।
৩ জুলাই ১৯৭২ , রাত ২.৩০ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তির খসড়া হয় ।

চুক্তিটি সাক্ষর হয় ২৮ জুলাই, এই চুক্তির জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীজি ২৭ জুলাই সিমলাতে পৌছে যায় । তিনি পরিস্থিতি নিজে চোখেই দেখেন এবং সাংবাদিকদের বলেন , আমরা এমন একটি চুক্তি ও সমঝোতায় পৌছাচ্ছি যার মাধ্যমে চিরদিনের মত পাক-ভারত সমস্যার সমাধান হবে এবং দুদেশের মধ্যে শান্তি স্থাপনে যা করার দরকার তা আমরা করবো ।

সিমলা চুক্তির সংক্ষিপ্ত বিষয়:
১. দুই দেশ সম্মিলিত ভাবে নির্ণয় করলো ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সর্বশেষ পাকিস্তান আর্মি ভারতীয় সেনাদের নিকট অস্ত্র সমর্পনের মাধ্যমে কাশ্মীর সীমান্তে যাদের সৈনিক যে অবস্থান গ্রহণ করেছে সেই সেই দেশের সীমানা মানা হবে । এই সীমানাকে ভারত পাকিস্তান এল.ও.সি বা লাইন আব কন্ট্রোল মেনে নিল ।

২. শিমলা চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানী ৯৩ হাজার বন্দী সেনাদের ভারত ছেড়ে দিল , এই শর্তে যে তাদের বিচার পাকিস্তান নিজেই করবে যারা পূর্বপাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে যুদ্ধকালীন অপরাধে জড়িত ছিল ।
৩. উপরন্তু, পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে ভারতীয় সৈনিক দ্বারা কজ্বাকৃত সীমানা ভারত ছেড়ে দিল বিনা শর্তে ।
৪. ভবিষ্যতে ভারত পাকিস্তান কোন সমস্যা সমাধানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা থেকে দুই দেশই বিরত থাকবে ।
৫. দুই দেশর সেনারা কোন ভাবেই এল.ও.সি সীমানা অতিক্রম করবেনা ।
৬. সাধারণ জনগণের আসা যাওয়ার জন্য বর্ডার থাকবে যাতে করে দুই দেশের জনগণের আত্বীয় পরিজনের সাথে মিলিত হতে পারে।
এই চুক্তি করার সময়ে ভারত যেমন সুবিধার পজিশনে ছিল, তেমনি পাকিস্তান ছিল বেশ বেকায়দায় । আর চুক্তি সাক্ষরটা ছিল ভূট্টোর কাছে এক বিরাট সাফল্য, কেননা তাদের বন্দী সেনাদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেয়া ছিল তার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার এক ওয়াদা এবং বড় চ্যালেঞ্জ । অপরদিকে পাকিস্তানকে বেকায়দায় ফেলে ভারতের কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের পথ বেড় করা, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী মনে হয় একটু বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছিলেন বলেই ভারতীয় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ।