ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

জীবনে এটাই প্রথম ব্লগে লিখছি। তাই লেখাটিতে এলোমেলো ভাব, ধারাবাহিকতার অভাব, বাহুল্যতা ও সঠিক শব্দচয়নের অসতর্কতা থাকতে পারে। এজন্য এই নাগরিক ব্লগের সকল সদস্য, লেখক ও পাঠকের নিকট অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। দয়া করে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহকারে পাঠ করার জন্য বিনীত অনুরোধ রইল।

অশিক্ষিতরা মূর্খ হবে এটা স্বাভাবিক। কারণ তাদের জ্ঞানের অভাব আছে। কিন্ত বর্তমান সময়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাকে ‘শিক্ষিত মূর্খ’ শব্দটি ব্যাঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার করতে হচ্ছে। আমি তাদেরকেই ‘শিক্ষিত মূর্খ’ বলব যারা নিজেরা সুশিক্ষা কি ও কেন প্রয়োজন তা জানেনা। যারা লেখাপড়াকে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যবহার করে। আত্নীয়দের, প্রতিবেশীদের দেখানোর জন্য সন্তানদেরও সেই পথে ধাবিত করছে। সার্টিফিকেট অর্জন, লোকজনকে বলা এবং টাকার নেশা/সুনাম কামানোই যাদের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ যাদের একাডেমিক পড়াশোনা নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করেনা, আমিত্ব (ইগো-Ego) তৈরি করে।

প্রথমেই বলতে চাই আমার চাক্ষুষ দেখা কয়েকটি ঘটনা:

কেস-১: আমার ছোট ভাই অনার্সে এএমটি (অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং) নিয়ে পড়ছে। এক ক্লাসে তার জনৈক বিষয়ের শিক্ষক ৩৫ পৃষ্ঠার একটি এসাইনমেন্ট করতে দেয় যা পরের দিনই জমা দিতে হবে। আমার ছোট ভাই আমার নিকট এসে লিখে দিতে বলল। আমি বললাম, আমি লিখলে হবে? ও বলল, “হবে, স্যার এগুলো কখনও পড়বে না। কার হাতের লেখা, সঠিক কিনা তাও দেখবে না।” প্রশ্ন হচ্ছে এই এসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের কি শেখাচ্ছে?

কেস-২: আমি যখন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে মাস্টার্স করি তখন দেখতাম, কম্পিউটারে স্লাইড দ্বারা পড়ানো হতো। সিনিয়র শিক্ষক জুনিয়রদের দিয়ে কম্পিউটারে স্লাইড বানিয়ে নিত। কিন্তু তাতে নাম উল্লেখ থাকত সিনিয়র শিক্ষকেরই। এমনকি উক্ত সিনিয়র শিক্ষক ক্লাসে জুনিয়র শিক্ষকের তৈরি করা লেকচার স্লাইডটিই পড়াচ্ছেন। আমার প্রশ্ন, যিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক তার কাছে শিক্ষার্থীরা কি শিখছে?

কেস-৩: একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষক তিনি। তিনি আবার একটু যৌনকাতরও। তাই ক্লাসে সুন্দরী মেয়ে তার লেকচার না বুঝলে বলেন, ক্লাসের পরে আমার রুমে এসো। প্রথমদিন রুমে মেয়েটি গেলে তাকে বলা হল, একদিনে সব বুঝবে না তাই মাঝে মাঝে এসো। পরে অন্য সময় স্যার তাকে বলে, গরমে একটু পাতলা জামা পরে আসবে। এভাবে বেশি নম্বরের লোভে মেয়েটি একদিন নিজের দেহ………

কেস-৪: আরেকজন বিখ্যাত প্রফেসর। প্রাইভেট ভার্সিটিতে খুব হাক ডাক তার। তিনি যখন নিজের পাবলিক ভার্সিটিতে পড়ান, তখন বলেন প্রাইভেটে কোন পড়াশোনা হয় না। কিন্তু নিজেই একাধিক প্রাইভেট ভার্সিটিতে ও কোচিংয়ে, এমনকি শুক্রবারেও পড়ান।

তাছাড়া প্রশ্ন ফাঁস, ভাইভা পরীক্ষাতে পক্ষপাতিত্ব, অন্যান্য দুর্নীতি তো আছেই। এই হল দেশে উচ্চশিক্ষার অবস্থা। আমি অবশ্য এটা স্বীকার করছি যে দেশে এখনো সৎ, নৈতিক, অত্যন্ত আদর্শবান শিক্ষক রয়েছেন। তাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই কথাগুলো বলছি।

এবার আসি আমাদের জাতি ও সমাজের চিত্র নিয়ে।

(ক) অধিকাংশ ছেলেরা পড়ে চাকরির জন্য, মেয়েরা ভাল পাত্র পাবার জন্য। এটা অপ্রিয় নীরব সত্য। কারণ পরিবারে থাকে টাকার পিছুটান, কন্যাদায়গ্রস্থতা।

(খ) অনেকে পড়ছে, মানুষকে বলার জন্য যে আমি অমুক পড়ি, তমুক পড়ি, এই ডিগ্রী করেছি, ওইটা পাস করছি। কারণ আমাদের চাই, ভাল একটা ভার্সিটির লেভেল। সাবজেক্ট যাই হোক।

(গ) মা-বাবা জোর করে সবাইকে ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার বানাচ্ছে। চাই সে তা পড়ার উপযোগী হোক বা না হোক। কারণ এদেশে টাকা খরচ করলেই সবাই ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে। আর চাকরিতে অধিকাংশ শিক্ষারই প্রয়োগ নেই।

(ঘ) বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর একমাত্র লক্ষ্য থাকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া। ফলে সে পাঠ্য বহির্ভুত পড়তে সময় পায় না। তার প্রভাব উচ্চশিক্ষায় পড়ে।

(ঙ) এছাড়া আমাদের আমিত্ববোধও অধিক। একটু ভাল প্রতিষ্ঠানে পড়লেই শিক্ষার্থীর পা মাটিতে পড়ে না। নিজেকে সে বিরাট বিদ্ব্যান মনে করে, সাথে তার অভিভাবকেরও ফাপড়ের শেষ থাকে না।

(চ) আর প্রায় ৯০% মেয়েরই অনার্সে পড়ে মানে তার বিয়ের সার্টিফিকেট হয়ে গেল। মানে মেয়ের বিয়ে দেয়া যায়, বা তাকে পুত্রবধু করা যায়।

বুঝতেই পারছেন, আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থাই ঘুনে ধরা। যা আমাদের নৈতিকতা বর্জিত শিক্ষকদেরই তৈরি। আর এই কথা বললাম এই জন্যই কারণে যে, মা-বাবা শিক্ষিত হওয়ার পরও দেখি তাদের সন্তানকে অন্য উদ্দেশ্যে পড়ানো হয়। পক্ষান্তরে এই সমাজই সুশিক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায়।

এতদিন জানতাম, জীবসত্তা হতে মানবসত্তায় উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। সম্মানিত পাঠকদের প্রতি আমার কয়েকটি প্রশ্ন থাকল-

(১) আমাদের ও শিক্ষকদের নৈতিকতা এমন হলে আমরা কি পুথিগত বিদ্যার দিকে অগ্রসর হচ্ছি না?
(২) আমাদের দেশে পিতৃতুল্য শিক্ষককে তারই শিক্ষার্থী লাঞ্ছিত/হত্যা করে। কারণ কি?
(৩) শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কেন বাড়ছে?
(৪) কেন একজন ছাত্র অারেকজন ছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করছে বা জোর পূর্বক ধর্ষণ করে ভিডিও তৈরি করে নেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে?

আসলে যতই উচ্চশিক্ষার কথা বলছি ততই নিচে নেমে যাচ্ছি। শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা কেন এগুলো করে? এর জন্য ঘুনে ধরা সমাজ ও অনৈতিক শিক্ষকরাই দায়ী।

এমতাবস্থায় যা করণীয় বলে আমি মনে করি:-

*সঠিক জ্ঞানার্জনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষকদেরকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

*যে শিক্ষার্থী যে বিষয়ে আগ্রহী তাকে তাই পড়াতে হবে। কোন বিষয় পড়লে মানুষ বাহবা দিবে আর মোটা টাকা কামাতে পারবে তার দিকে কর্নপাত বর্জন করতে হবে।

*শুধুমাত্র কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ে সেটাই যেন একটা ছাত্র-ছাত্রীর মেধার মাপকাঠি না হয়।

*রান্নাঘরই যেন মেয়েদের শেষ ঠিকানা না হয়

*পড়াশুনার পর চাকরির গ্যারান্টি থাকতে হবে।

*সঠিক বয়সে বিবাহ ফরজ হলে বিবাহ করাতে হবে।

কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ব্লগে লিখি নাই। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন ক্ষমা করবেন। শিরোনাম কি দিব তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ভাবতে হয়েছে। পরে শিরোনাম দিয়ে দিলাম একটা।

লেখাটি আপনাদের কেমন লেগেছে তা মন্তব্য করে জানানোর জন্য অনুরোধ রইল। আপনাদের মূল্যবান মতামত আমাকে সংশোধন করবে এবং ব্লগটিতে লেখার জন্য আরও আগ্রহী করে তুলবে। আর যদি কোন পরামর্শ থাকে জানাতে পারেন। সবাইকে কষ্ট করে মূল্যবান সময় বিসর্জন দিয়ে লেখাটি পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।