ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

06Ele

বাঙালি মুসলিমই পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল, পাকিস্তানকে ভালোবাসাও দিয়েছে তারা৷ অনূঢ়া যুবতী যখন কোন বখাটের প্রেমেে পড়ে কুমারী মাতা হয় তখন তার যা অবস্থা হয় বাঙালি মুসলমানের হাল তার চেয়ে খারাপ হয়েছিল৷ এই জন্যই যে বাঙালি মুসলিম লীগ গড়লো তাকেই আবার আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়েতে হয়েছিল৷ এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অনিবার্য ছিল, ভারত সেটা ত্বরান্বিত করেছে৷ ব্যক্তি ইন্দিরা আর মানুষ ভারতীয়দের সহানুভূতি পেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামীরা, তবে রাষ্ট্র ভারত একেবারেই নিঃস্বার্থ ছিল বলে বিশ্বাস হয় না৷

তবু ১৯৭১ সালের জন্য ভারতকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়৷ তাছাড়া প্রতিবেশি তো বটেই৷ কোন ভালো মানুষ তার প্রতিবেশির সাথে সম্পর্ক খারাপ করে না৷ আমরাও করবো না৷ ফারাক্কাসহ ভারতের নদীশাসন ব্যবস্থা, সীমান্তেহত্যা, চোরাকারবার এইসব নৈমিত্তিক পুরোনো কথা৷ এই নিয়ে অনেক কথা, অনেক লেখা হয়েছে, হচ্ছে, হবে৷

কথা হচ্ছে একটি বন্য হাতি নিয়ে, প্রশ্ন হচ্ছে বন্য হাতির দেশ থাকবে কেন? বাংলাদেশের রয়েল বেঙ্গল টাইগার যখন পশ্চিমবঙ্গে যায়, কাউকে তো বলতে শুনি না বাংলাদেশি বাঘ বলে? এপার হোক ওপার হোক, বাঘ সুন্দরবনেরই৷ হাতি কেন ভারতের হতে যাবে? বন্যপ্রাণীর নাগরিকত্ব দিবার ক্ষমতা কার? বাংলাদেশের মগজবিহীন মিডিয়াগুলোর আচরণে আমি হতাশ; হামেশা তাদের গোলামীপূর্ণ আচরণ দেখে লজ্জিত৷ ভারতীয় হাতি বলে বলে মুখে ফেনা তুলেছে বাংলাদেশি মিডিয়াগুলো৷ সরকারের আমলা-মন্ত্রীগুলো সে চুকা ঢেকুর তুলে হৈ হৈ করে উঠল হাতি ভারতের৷

শীতের সময় কত অতিথি পাখি আসে আমাদের দেশে, আবার শীত শেষে চলেও যায়৷ কাউকে তো বলতে শুনি না এই পাখিটি আফ্রিকার, ওই পাখিটি সাইবেরিয়ার! হাতি দলবদ্ধপ্রাণী, একটা হাতি দলছুট হয়ে বানের পানিতে ভেসে আমাদের দেশে এসেছে৷ পথ হারিয়েছে সে, আবার পথ খুঁজে চলেও যাবে৷ মন চাইলে রয়ে যাবে এদেশে৷ হাতির তো পাসপোর্ট ভিসার দরকার হয় না, এমন কোন আইনও পৃথিবীর কোথাও নেই৷ কোন আইনে বন্যপ্রাণীর জাতীয়তাও নির্ধারণ হয় না৷

তাহলে হাতিটি ভারতীয় হবে কেন? অথচ সে প্রথম দিন থেকে ভারতীয় হাতি বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে মিডিয়াগুলো৷ তার সাথে সুর মিলিয়েছে সরকারও৷ দলছুট হাতিটি তাণ্ডব চালাতেই পারে, হাতির স্বভাবই এমন, সে যে বনেরই হোক৷ প্রয়োজনীয় আহার জুটলে সেও শান্তশীল হয়ে যায়৷ আমরা সে দিকে খেয়াল না করে হৈ হৈ কাণ্ড করে বসলাম৷ হাতি ধরে নিতে নিয়ে এলাম আসাম বনবিভাগের লোকদের৷ কেমন গদগদ ভাব, দাদা, তোমাদের হাতিটি আমাদের অনেক জ্বালাচ্ছে, ওকে নিয়ে যাও৷ দাদারা এলেন এবং ব্যর্থ হলেন৷ হাতিটি কোন জাতীয়তার শৃঙ্খলে জড়ালো না৷

শেষ পর্যন্ত চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে হাতিটিকে বন্দি করা হলো৷ অপেক্ষায় রইলাম, অচেতন হাতিটিকে নিয়ে আর কী কী তামশা হয়৷

পরিশেষে বলতে চাই, হাতিটি কোন রাষ্ট্রের নয়, বনের, এই সত্য উপলদ্ধি করুন৷ এই হাতির ভরণপোষণ করার ক্ষমতা না থাকলে ক্ষমতা অর্জন করুন৷ মনে রাখবেন, বানের পানিতে ভেসে এসেছে বলে ফেলনা হয়ে যায়নি হাতিটি, ওকে দেশের কোন সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দিন৷ আর আপনার সুন্দরবনের বাঘগুলোর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন৷ বন্ধ করে দিন সুন্দর বনের নিকটে গড়ে উঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গুলো৷ রামপালের কথাও ভুলে যান, ওখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজন নেই৷ বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যাবে, সুন্দরবন সরানো যাবে না৷

কয়লা আনয়নের জন্য যদি নদীপথই উত্তম হয়, দাদাদের বলুন পদ্মার পানির স্রোতধারা ঠিক রাখতে৷ পদ্মায় জাহাজ চললে রাজশাহীতেও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে৷

হরিণ খুব ভীতুপ্রাণী, নিজের পেটের শব্দেও সদলে লাফিয়ে ওঠে, আপনার বিদ্যুৎকেন্দ্রের শব্দ তার সইবে না৷ আপনার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়ায় শ্বাসপ্রশ্বাসে ব্যাঘাত করবে সুন্দরবনবাসিদের৷ কালো চিকচিকে ক্ষত তৈরি হবে বনের বৃক্ষরাজির পাতায় পাতায়৷ ঝরে যাবে চিরসবুজ পাতাগুলো৷ বিশ্বের সেরা ম্যানগ্রোভ বনটিকে ইতিহাস করে দিবেন না৷

আপনাদের অত্যাচার আর খামখেয়ালিপনার কারণে ইতিমধ্যেই সুন্দরবনের অনেক প্রাণী ভারতে পাড়ি জমিয়েছে৷ এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই সুন্দরবন প্রাণহীন হয়ে যাবে৷ এতে লাভ হবে দাদাদের৷

আপনারা সুন্দরবনের মরাগাছগুলো কেটে লাকড়ি বানিয়ে বিক্রয় করবেন, আর দাদারা বিক্রি করবে সুন্দরবনের সৌন্দর্যদশনের টিকেট৷ আমাদের আগামী প্রজন্মকে বাঘ-হরিণ দেখতে ভারতে গিয়ে টিকেট কাটতে হবে৷

আপনাদের বন ধ্বংস করে নগরায়ণ-শিল্পায়ণের এই ভয়ানক খেলা বন্ধ করুন৷ আমাদের আগামী প্রজন্ম যেন বনের সৌন্দর্য বনে দেখতে পায়, চিড়িয়াখানা আমাদের কাম্য নয়৷