ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ব্লগ সংকলন: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড

 

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক ভেবেছি। পত্রিকা ও টিভির ইসভেষ্টিগেটরি রিপোর্টগুলো খুবই দুর্বল ছিল। বেশিরভাগ টিভির রিপোর্টে তো দেখলাম ঘটনার গভীরে না যেয়ে হয়রানির ভয়ে পলাতক সামান্য বেতনের গার্ড ও সিকুরিটি ঠিকাদার, গ্রিলকাটা সিঁদেল চোরদের পিছনে দৌড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মুল্যাবান এয়ারটাইম নষ্ট করছে। পত্রিকাগুলোর একই অবস্থা। তবে বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু এসেছে। ভাবলাম, আমার কিছু লেখা উচিত।

তিন বছর পার হয়ে গেলেও তদন্তকারিরা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কোন কিনারা করতে সক্ষম হয়নি। দীর্ঘ তদন্তেও কোন ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ, ডিবি র‍্যাব, সিআইডির একাধিক তদন্ত টিম, পুনঃতদন্ত করেও কিছু পায়নি। মূলকথা হত্যার বিশ্বাসযোগ্য কোন মোটিভ পাওয়া যায়নি। খুনিকে খুঁজে পাওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার।

কিছু গোষ্ঠি কাল্পনিক কাহিনী ফেঁদে এটাকে রাজনৈতিক রঙ দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছে বছরব্যাপি। এজন্য দায়ী অবশ্যই ATN বাংলা চেয়ারম্যান নিজেই। লোকটিকে আমার মানসিক অসুস্থ মনে হয়, লন্ডনে একটি পত্রিকায় অকারনেই সাংবাদিক রুনিকে নিয়ে নোংড়া মন্তব্য করে, এছাড়াও টিভিতে তার বিশ্রী কথা শুনেছি। এই মানসিক অসুস্থ ব্যক্তিটি কিভাবে যে ২টি চ্যানেল চালায় ভাবতে অবাক লাগে।

আমার মনে হয়না এই জোড়া হত্যাকাণ্ড পলিটিকালি মোটিভেটেড। মাছরাঙ্গা টিভির সাগর এবং এটিএনের রুনির ডেস্ক তন্ন তন্ন করে কোন পেন্ডিং দুর্নীতির ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। এসব কাজ টিম ছাড়া একা করা সম্ভব হয় না কখনোই। কোন কাজ পেন্ডিং থাকলে তার সহকর্মিরা বা নিউজ এডিটরের অবশ্যই জানার কথা, এরকম কিছু হলে তা সার্ভারে থাকতো বা পোর্টেবল হার্ডডিস্কে থাকতো। দুর্মুখরা বলে তার ল্যাপটপে ছিল। এটাও একটা ফালতু কথা। গনমাধ্যমে যারা কাজ করে এদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন গুরুত্বপুর্ন নাজুক জিনিস কখনোই কপি না রেখে ল্যাপটপে রাখা হয় না। কারন এদের প্রায়ই গভীররাতে বাসায় ফিরতে যেয়ে ল্যাপটপ খোয়াতে হয়েছে ছিনতাইকারিদের হাতে। আর থাকলেই বা কী, খুনি কিভাবে শিওর হবে এই রিপোর্টের কপি অন্য কারো কাছে নাই? এইসব ফালতু কাহিনী কারা যে বানায়, কারা যে গেলায়। তবে অনেক শিক্ষিত আবাল এসব সত্য বলে বিশ্বাসও করে।

দু-তিন বছর ব্যাপি একাধিক টিভি রিপোর্ট ও পত্রিকায় প্রকাশীত অনুসন্ধানী লেখাগুলো পড়ে দেখেছি। খুনিকে পাওয়া তো দুরের কথা, খুনের মোটিভই পাওয়া যায়নি।

আমার ব্যক্তিগত ধারনা এই জোড়া হত্যাকাণ্ড কোন একক স্যাডিষ্ট উম্মাদের কাজ হতে পারে। আমার এই ভাবনা দু’তিন বছর আগেও এই বিডি ব্লগের বিভিন্ন জনের পোষ্টের কমেন্টে সংক্ষেপে বলেছিলাম। বিদেশেও এই ধরনের মোটিভলেস খুন এই ধরনেরই হয়ে থাকে। এ ধরনের একক খুনিরা খুব নির্বিঘ্নেই কাজ সারতে পারে। কারন অকারন হত্যা। খুনির কোন সহকারি থাকেনা, টাকা-পয়সা, গহনাগাটির প্রতিও লোভ থাকেনা। হতে পার খুনি এই বিল্ডিঙ্গেরই কেউ বা আত্নিয়স্বজন বা অন্য কেউ। মোটিভবিহীন হত্যাকাণ্ডের কোন কুল কিনারা পায় না তদন্তকারিরা। একক আততায়ি খুবই আত্নকেন্দ্রিক এবং নিরিহ-ভদ্র টাইপ হয়ে থাকে বলে এদেরকে খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের তদন্ত ও ময়না তদন্ত রিপোর্টেও এর সত্যাতা পাওয়া যায়। প্রাপ্ত স্পেসিমেনে একজন অজ্ঞাত ব্যাক্তির ডিএনএ পাওয়া যায় যার ডিএনএ সন্দেহজনক কারো সাথেই মিলেনি।(কালেরকন্ঠ)

আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এটি কোন পেশাদার খুনির কাজ নয়। খুনি আগেই ডুব্লিকেট চাবি জোগার করে বা অন্য ভাবে ঘরে লুকিয়েছিল। সারা দিন সারারাত কাজের পর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত সাগরকে ছুরিকাঘাতে ভূপাতিত করে বেধে ফেলে। তার আগে বা পরে রুনিকে মাত্র একটি ছুরির আঘাতে আহত করেছিল, পরে এই আঘাতেই রুনি রক্তক্ষরনে মারা যায়। খুনি পেশাদার কিলার না নিশ্চিত, কারন সে সাগরকে ২০-২৫টা ছুরিকাঘাত করেছিল, কিন্তু ভাইটাল জায়গায় (হার্ট, মেইন আর্টারি) একটাও লাগাতে পারে নাই, এতে ছুরির বাটও ভেঙ্গে যায় আবার মৃত্যু হওয়ার পরও বাট ভাঙ্গা ছুরি দিয়ে গলা কেটেছে, প্রতিটি আঘাতই আনড়ি হাতের! বোঝাই যায় উম্মাদ পাগলের কাজ।

খুনি আনাড়ি ছিল নিশ্চিত কারন ঘটনাস্থলে খুনের আলামত রেখে গেছিল। ছুরি, হাতের ছাপ, পায়ের ছাপ, ইত্যাদি .. না মুছেই চলে যায়।
আরো শিওর হলাম যখন জানা গেল এই স্যাডিষ্ট খুনি খুন করার পর দুই দুইটা লাশের সাথে রাতযাপন করেছে, ঘুমিয়েছে! (খোদ শয়তানেরও মনে হয় এত বড় কলিজা নাই!) সকাল সাতটায় ফ্রেস হয়ে দরজা লক দিয়ে ভদ্র ভাবে ল্যাপটপের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বিল্ডিঙ্গের অন্যান্ন অফিস যাত্রীর মত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেট দিয়া বের হয়ে গেছে। গার্ড কিছু জিজ্ঞেস করেনি, করার কথাও না। কেউ বের হওয়ার সময় সাধারনত কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় না, শুধু ঢোকার সময় সন্দেহ হলে চ্যালেঞ্জ করে।

কোন খুনি বা পেশাদার কোন খুনি রাত্রিযাপনের মত এই অদ্ভুত ঝুঁকি নিবেনা, পেশাদার আততায়ী কাজ শেষ করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করবে, সাধারনত এটাই হয়। এই ধরনের একক স্যাডিষ্ট ঊম্মাদ বিদেশেও উচ্চ টেকনোলজি ইউজ করে খুঁজে পাওয়া যায় না। সিরিয়াল কিলার হলে খুনি হয়তো ধরা পড়ত। আমাদের মাথা মোটা তদন্তকারীরা সেইরকম দক্ষ ও পেশাদার হয়ে উঠবে সেই সুদিন এখনো আসেনি। পুলিশ এই খুনিকে আর পাবে বলে মনে হয় না। যদিও এক অজ্ঞাত ব্যাক্তির হাত-পায়ের ছাপ ও ডিএনএ স্পেসিমেন এখনো হাতে আছে।
ডাকাতির জন্য খুন বা কোন মহলের ভাড়াটে খুনি হলে ৪৮ ঘন্টার আগেই খুনিকে খুঁজে বের করা যেত। ঘটনাস্থল গ্রীন সুপার মার্কেটের পেছনে পশ্চিম রাজাবাজারের মোবাইল বিটিএস এর সেই শেষ রাত্রের সকল মোবাইল কল তন্ন তন্ন করেও সন্দেহজনক কোন কথাবার্তা পাওয়া যায়নি।

খুনি তো দুরের কথা, খুনের সাম্ভাব্য কারন, খুনের মোটিভ এসব কিছুই পাওয়া যায় নি। বহুল আলোচিত এটিএন বাংলা চেয়ারম্যানকে একাধিক বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল পুলিশ, র‍্যাব ও ডিবি, এটিএন বাংলা ও মাছরাঙ্গা টেলিভিশন কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছিল দফায় দফায়। কিন্তু কোন ক্লু পাওয়া যায় নি। সরকার ব্যার্থ এইটা সরকার মুখে বা বললেও অনেকটা মেনে নিয়েছে। তদন্তকারিরা কয়েক শত মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ ও দেশ বিদেশের প্রযুক্তির ব্যাপক সহায়তা নিয়েও কিছু পায়নি।

২০১২ সালে আদালতের নির্দেশে তদন্তভার গ্রহণ করে র‌্যাব। ২৬ এপ্রিল কবর থেকে নিহত দম্পতির লাশ উত্তোলন করে সংগ্রহ করা হয় ভিসেরা ও ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা। এরপর দুই দফায় ডিএনএ নমুনা পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। রক্তমাখা জামাকাপড়, বটি, ছুরি, মোজা ব্যবহার করা হয় ডিএনএর আলামত হিসেবে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে ডিএনএ রিপোর্ট আসে। এতে রুনির কাপড় থেকে তৃতীয় এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রফাইল পাওয়া যায়।
এক সময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ফ্ল্যাটের আরেক নিরাপত্তাকর্মী হুমায়ুন কবীর ওরফে এনামুলকে ধরিয়ে দিলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। পরে র‌্যাব এনামুলকেও গ্রেপ্তার করে, যদিও প্রথম দিকে দুই নিরাপত্তাকর্মী এনামুল ও পলাশ রুদ্র পালকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পর কিছু না পেয়ে ছেড়ে দিয়েছিল ডিবি।

এছাড়াও সে সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আরো সাতজনকে। তখন নতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রি মখা। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন ছিলেন রুনির পারিবারিক বন্ধু তানভীর রহমান।

গ্রেপ্তার দেখানো হয় ২০১২ সালের আগস্টে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সিঁদেল চোর রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণকে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় বহুল আলোচিত সাগর-রুনির বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পালকে।

কোন উপায় না পেয়ে মখার পরামর্শে একপর্যায়ে একজন কে জজ মিয়া সাজানোর প্রকৃয়াও চলে, কিন্তু সরকারে উচ্চ পর্যায়ে থেকে প্রবল বিরোধিতা থাকায় ‘জজ মিয়া’ র চিন্তা বাতিল করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে করা তৃতীয় এক ব্যক্তির (সাম্ভাব্য খুনি) পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রফাইল পুলিশের খাতার সর্বমোট ১১৬ জন সন্দেহভাজন ব্যাক্তির ডিএনএ নমুনার সংগে মিলিয়ে চেক করা হয়েছিল। কিন্তু কারো সাথেই মেলেনি সেই ডিএনএ প্রফাইল।

সুত্র: –
বেশীর ভাগ সুত্র ২০১২র দিকের দৈনিক কালের কন্ঠ থেকে নেয়া, বাকিগুলো আমাদের সময়, মানবজমিন ইত্যাদি থেকে সংগ্রহিত। এই লেখা ২০১৪ তে সামহোয়ারইনব্লগেও প্রকাশিত হয়েছিল।
কপিরাইট – হাসান কালবৈশাখী।