ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

আমি বাহরাইন আসার দিন কেঁদেছি বিমানে বসে বসে এক প্রবাসী বোনের জীবনের করুণ কাহিনী দেখে ও শুনে। অথছ আমি তাঁর জন্যে কিছুই করতে পারলাম না। এ যেন আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্ট হয়ে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে।

রাত তিনটে চল্লিশ মিনিটে ওমান ইয়ার ফ্লাইটে ওমান হয়ে বাহরাইনের উদ্দেশ্যে উড়াল দিবে বিমান। আমি বিমানের বডিং পাস নিয়ে বিমানের বিতরে যেতেই বিমানবালা আমাকে বললেন স্যার আপনার সিট 32/A তে গিয়ে বসেন। অবশ্য ইংরেজিতে বলেছিলেন বুঝতে সমস্যা হয়নি। যাক গেলাম সিটের পাশে। সেখানে গিয়েই হলো যত বিপত্তি। গিয়ে দেখি আমার সিটের সাথে একজন মেয়ে। আমি পেরেশান হয়ে ভাবছি এখন কি করি।

এমনিতে আমি লাজুক টাইপের মানুষ। মেয়েটা বললেন ভাই বসেন দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যাক হাপ ছেড়ে কেঁপে বাঁচি এই বলে বসে পড়লাম। আমি বসতেই মেয়েটা বললেন ভাইয়া আমাকে আপনার মোবাইল টি দিবেন একটু? আমি বললাম মোবাইলে টাকা কম আমি এখনি বাড়িতে ছেলেমেয়ের কাছে শেষ কথা বলতে হবে। তারপরাও মেয়েটি বললেন ভাইয়া প্লিজ একটু দেন বাড়িতে মায়ের সাথে একটু কথা বলি।

মায়ের কথা বলাতে মোবাইল দিলাম। সে তাঁর কথা বলতে লাগলেন দুই মিনিট কথা বলার পড় মাকে বলছে মা রেখে দেই। আমি সাথে সাথে বলছি বোন আমার বাড়িতে ফোন করতে হবেনা। মোবাইলে ২২ টাকা আছে সবটার কথা বলে নাও, এ কথা বলছিলাম আর আমার দু চোখ দিয়ে অশ্রুজল আসতেছিল। মেয়েটা বলছিল মাকে, মা আমার দুনিয়ায় তুমি ছাঁড়া আর কেউ নেই। আমার মেয়েটাকে তুমি দেখে রাখিয়ো আর অঝরে কেঁদেছিলেন। এমনিতে বাচ্চা মেয়েটা বলছিলেন মা তুমি কই? তুমি এখনো আসছ না কেন। আমার জন্যে জামা কিনেছ?

এমনি বিমানবালা এসে বলছে যারযার মোবাইল বন্ধ করেন। আর মেয়াটা কথা বলছিলেন বাচ্চা মেয়ের সাথে। বিমান ছেঁড়ে দিল লাইন কেটে গেল। আমার আর কথা বলা হলনা বাড়িতে। দুঃখও নেই। কারণ আমিও এক বাবা, বাবা-মা ছাড়া কে বুঝবে সন্তানের দরদ? বিমান আকাশে চলছে মেয়েটা মোবাইল দিয়ে বলছে স্যরি। আমার জন্যে আপনি ফোন করতে পারেন নি।

তারপর দেখলাম চোখের পানি মুছে চুপ হয়ে আছে। আমি ভাবলাম কিছু কাহিনী শুনি তার জীবনের। জিজ্ঞেস করলাম এমন হয়েছে কেন আপনার বাচ্চা রেখে ওমানে যাচ্ছেন। বলতেই হাইহুতাশ করে শ্বাস নিয়ে বলছিল, আমার সব ছিল সাজানো গুছানো সংসার, স্বামী সন্তান, সুখ শান্তি। কিন্তু এ সমাজ আমাকে থাকতে দিলনা। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাকে ঘরছাড়া করেছে, স্বামীছাড়া করেছে এই সমাজ। এ সমাজকে আমি কোনদিন ক্ষমা করবো না।

চলে এলাম বাবার বাড়িতে। এখানেও সেই নরপশুর দলবল আমাকে ধর্ষিতার নজরে দেখতে শুরু করলো। সাথে আমার দুই বছরের মেয়ে নিয়ে চাইছিলাম কোন মতে মায়ের সাথে থেকে যাব। মা-বাবার অভাবের সংসারে চলতে সমস্যা হচ্ছিল, কিন্তু এ সমাজ আমার মেয়ের কাছ থেকেও আলাদা করে দিল। এ কথা যখন বলছিলেন আমার চোখ ভরা ভারি ভারি জল। আমার আর কিছু বলার ক্ষমতা ছিলনা। অনেক দুঃখের কষ্টেসৃষ্টের কথা বলতে বলতে মাস্কাট বিমানবন্দররে এসে গেলাম। মেয়েটা নেমে যাবে আর আমি এ ওমান ইয়ারের বিমানেই মানামা বাহরাইন আসবো।

বিমান থেকে নেমে যাচ্ছেন মেয়েটা। যতদূর পর্যন্ত দেখা গেল আমি মেয়েটার দিকে চেয়েছিলাম। আর নিজেকে মগেরমুল্লুক এর নাগরিক হিসাবে মেনে নিলাম।