ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমি ওমানেও ভালো ছিলাম। স্বপ্ন ছিল ওমান থেকেই ভাগ্যরেখা বদলে বাড়ি ফিরবো। কিন্তু না,কিছু নরপশু আমার সেই স্বপ্নের মাঝে বিষাক্ত ছোবল মেরে আশাহত করে দিয়েছিল। আজও সেই বিষাক্ত ছোঁবলের আওয়াজ আমার দর্পণে বেজে চলেছে। জানি না কবে সেই আওয়াজ থেকে মুক্তি পাব?

প্রতিদিনের মত সকালে ওঠে বাড়িতে ফোন দিলাম। ফোন দিতেই চারিদিক থেকে চেঁচামিচির আওয়াজ আসতেছে। বারবার হ্যালো হ্যালো বলার পরেও কেউ আওয়াজ দিচ্ছেনা। আমি লাইন কেটে আবার করলাম, করতেই মা চিৎকার করে বলছিল বাজান সব বাড়িঘর লুটপাট, ভাংচুর করছে। তখন আমার আর বুঝতে বাকি ছিলনা।

গ্রামের মানুষ শুরু করে দিয়েছে খুনাখুনির এ রক্তের হোলি খেলা। যে খেলার শেষ নেই, যে খেলার পরাজয় নেই। পরাজয়বরণ শুধুই আমাদের মত শান্তিকামী মানুষের। বছরের পর বছর আমাদের শিলাউর গ্রামের দুই গোষ্ঠীর হিংসা বিদ্বেষ লেগেই আছে। যার ফায়দাটা নিচ্ছে গ্রামকেন্দ্রিক দুই গোষ্ঠীর ঘুষখোর সর্দার মাতবররা। সাথে থানা-পুলিশ। আমি মাকে বলেছিলাম, মা আমাদের কী ভাংচুর করেছে? মা বলছিল, ঘরে আসে নাই, দোকানগুলা লুটপাট করে নিয়ে গেছে।

আবার সন্ধ্যার দিকে ফোন দিলাম। ফোন দেয়ার সাথে সাথে যেসব আকুতি-মিনতি করছিল আমার মা, বোন,প্রাণপ্রিয় স্ত্রী ও ছেলেরা, ইচ্ছে হয়েছিল এসব শোনার আগে কেন আমাকে বিদেয় করা শেষ হলনা! আর এদিকে বাহির থেকে দরজা জানালার মধ্যে আমারই ভাই-বেরাদার-বন্ধুরা-চলার পথের সাথিরা মিলে ভাংগার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। বাঁচাবার জন্যে না লুটপাট করার জন্যে। ভিতর থেকে চিৎকার আর বাচাঁবার আবেদন ছিল সবার কাছে! কই কেউ তো আসল না!  আমার বড় চাচার উঠানে ছিল শতশত মানুষের অপেক্ষা। কবে দরজা ভাংগা হবে? লুটপাট চালাবেন আমার গরিব ঘরে। যে ঘরে মা, বাবা, প্রাণপ্রিয় স্ত্রী আর দুই ছেলের ভালোবাসার ছাড়া আর কিছু নেই।

অনেক চেষ্টার করার পরে সেদিন রক্ষা পেয়েছি। ভাগ্যিস দরজাগুলো অনেক মজবুত ছিল। তাঁর কিছুদিন পরেই আবার হামলে পড়লেন আমার ঘরের উপর গ্রামের চেনা মুখগুলো। আর ছিন্ন করে দিলেন শান্তিতে ঘুমাবার ঘরটুকু। কি দোষ ছিল রে আমার? আমি সেই ২০০২ থেকেই বিদেশ বিদেশ ঘুরছি একটু শান্তির আশায়। মনের বিতরে এতো হিংসা জমিয়ে রেখেছিল আমার চেনাজানা মানুষগুলো জানাই ছিলনা।

তাঁরপর চলে গেলাম ওমান থেকে দেশে সবকিছু ফেলে। দেশে গিয়ে বাড়িতে যেতে পারিনি, গিয়েছিলাম শশুরবাড়িতে। সেখানে ছিলাম প্রায় ১৪ মাস। আমার ওমান থেকে যাওয়ার উদ্দেশ্য একটাই ছিল। গ্রামের যুবকদের সংঘটিত করা, গ্রামের এই অপশাসন থেকে মানুষকে শান্তির পথে আনা। ঘুষখোরদের কাছ থেকে মানুষজনকে নিরাপদ দূরত্বে আনার আপ্রাণ প্রয়াস চালাতে কথামতো কাজ শুরু করলাম। সঙ্গি হিসাবে গ্রামের কিছু ছেলে পেলাম, যা আমাকে অনুপ্রাণিত করলো। যারা এতোদিন মানুষের দুঃখ কষ্টের কারণ ছিল,তাঁদের কাছে যেতে শুরু করলাম দিনেরাতে। মনেমনে বিশাল ভয় কাজ করছিলো। সাহস বলতে সাথী ছিল ’ডর কে আগে জিৎ হ্যায়’এই বাণী। গ্রামের পাড়ামহল্লায় গিয়ে ছোট ছোট মিটিং করে যুবকদের বোঝাতে শুরু করলাম। আর তাঁদের কাছে প্রশ্ন করতে লাগলাম যে, আমরা যারা দলবাজ, ঘুষখোর, ধর্ষকদের কথামতো ঝগড়া বিবাদে জড়িয়েছি, আমরা কি পেয়েছি?

আমাদেরকে সবসময় ব্যাবহার করে ঘুষখোরেরা বিশাল টাকার মালিক বনে গেছেন। তুমি কি পেয়েছো? হ্যাঁ জানি আমার প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই। এও জানি তোমাকে ঝগড়ার মধ্যে খুন করাতে পারলে, ঘুষখোরের মুখে হাসি ফোটে। কেননা তোমার লাশ নিয়ে হবে ব্যবসা, কোটি টাকার ব্যবসা। যা ইতিমধ্যে অনেক দেখেছি তোমরাও দেখেছো। তাই আসুন এবার এই জালেম যুগের অবসান করি,সবাই মিলে।

আর বিশেষ কথা হচ্ছে, আপনাদেরকে দিয়ে যে খুনাখুনির খেলা খেলছে সর্দার মাতব্বররা। কারণটা কি বলেন দেখি? সবাই চুপ কেউ কিছু বলতে পারেনি। আসল কারণ তো হলো এখানে গ্রামে চলতে আমার লাগবে একহাত জায়গা। আমি চাই তিনহাত জায়গা! তারচেয়ে ভয়ংকরতম দিক হলো, আমার আপনার মধ্যে যতো ঝগড়া বিবাদ লাগিয়ে রাখা যায় তাঁতে হায়েনাদের পকেটে কাড়ি কাড়ি চাঁদার পয়সা আসে।

অবশেষে আমার চেষ্টার কিছুটা আলোর মুখ দেখলো। দুই গোষ্ঠীর কিছু যুবক মিলে শিলাউর শান্তির নীড় নামে যুব সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করলেন। প্রায় তিন বছর যাবত সফলতার সাথে এগিয়ে চলছে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচারের কাজে । এই তিন বছরে অনেক ঝড় তুফান হয়েছে এই সংগঠনের উপর দিয়ে। কারণ একটাই, এই সংগঠন হয়ার পর থেকে সব ধরনের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, লুটপাট, ঘুষখোরি বন্ধ হয়ে আছে। শান্তিতে মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। মানুষ নেতা, সর্দার ছাঁড়া চলতে শিখেছেন। তাই এই সংগঠনের পিছু লেগে আছে হায়েনারা।

আমার বিশ্বাস আছে এমনকিছু মানুষ এই সংগঠনের সদস্য হয়েছেন। যতো ঝড় তুফান আসুক না কেন,তাঁরা মচকে যাবে কিন্তু ভাঙবে না। তাঁরপরেও আমার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কি সেই দিনের চিৎকার, বাঁচার আকুতি মিনতি করার আওয়াজ কি ভুলতে পারবো? মনে হয় না!