ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

জীবনের তাঁগিদে আমি ছুঁটে চলেছি ভিন দেশের ভিন্ন কোনায় কোনায়। একটু সুখের আশায়, পরিবারের সবার সুখের কথা চিন্তা করে ২০০২ থেকেই প্রবাসী জীবন শুরু করেছি। একে একে তিনটে দেশ শেষ করে চার নাম্বার দেশ বাহরাইনে অবস্থান করছি। জীবন ফুঁরিয়ে যাচ্ছে,সুখের দেখা অদৃশ্য হয়ে সাঁত সমুদ্র তেঁরো নদীর ঢেউয়ের তালে তালে এপার উপার খেলছে জীবন খেলা। এটাকে কেউ বলে স্বাদের বিদেশ,আবার কেউ বলে স্বপ্ন পূরণের বিদেশ। আমি বলি কি, বিসর্জনের বিদেশ।

সুখের দেখা না পেলেও একটি সুখেরকাঁটা পেয়েছি, যে কাঁটা লক্ষ বাঙালীর মনে খোঁচা মেড়ে প্রতিমুহূর্ত রক্তাক্ত করে চলেছে। এই রক্তাক্ত, আহতাবস্থারর কথা দেশবাসীকে বলতেও পারিনা, দেশবাসীও জানার চেষ্টা করেনি কোনদিন। মা মাটির কাছে প্রতিদিন খুঁজখবর নিতে ফোন করি,প্রিয়জনদের সাথে কথা বলে শেষ করার আগে জিজ্ঞেস করি দেশের মানুষ কেমন চলছে?আমাদের চারপাশ কেমন চলছে? দেশমাতা কেমন আছে? হে বিমুগ্ধ জননী দেশমাতা তুমি কি কোনদিন তোমার সন্তানদের খোঁজখবর নেবে না? তোমার সন্তানেরা প্রবাসে এসে প্রতিদিন লাঞ্ছনা বঞ্চনারর শিকার হচ্ছে! তাতে কি তোমার হ্নদয় কাঁদেনা?

দেশমাতা, তুমি এমন আচরণ কেনো করছো তোমার দুঃখী সন্তানদের সাথে? আমরা আসার সময় তুমি আমাদেরকে আদর করে দাও নি দুঃখও নেই। প্রবাসে আসার সময় তোমার আদরের বড় বড় সন্তানদের কাছে গিয়েছি, যাদের তুমি দুধকলা খাইয়ে বড় করেছো। তোমার সেই আদরের সন্তাদের-কে কোনোদিন জিজ্ঞেস করেছো কি, আমার গরিব সন্তানেরা বিদেশে গেছে আমার খালি কোল ভরে দিতে তোরা তাঁদের কে লাঞ্ছিত করিসনি-তো? জানি মা-জননী জিজ্ঞেস করবে না। কারন তোমার দুধকলা খাইয়ে বড় করা সন্তানেরা তোমার কথা শোনে না। তোমাকে পছন্দ করেনা। তাঁদের নতুন পছন্দনীয় মা সুইস ব্যাংক।

মা আজ তোমার কাছে অনেকগুলো নালিশ করবো। জানি তুমি নালিশ শুনবে, বিচার করবে না। তারপরেও তোমার কোলের গরিব সন্তানেরা নালিশ করেই যাবে। কেননা লাঞ্ছনা বঞ্চনার আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে ময়লা জমেছে তোমার গরিব সন্তানদের মনে। তোমার কাছে নালিশ করলে মন কিছুটা হালকা হয়। আচ্ছা মা, তুমি যে আমাদেরকে বিদেশে পাঠিয়ে তোমার ভাগ্যলয় সংসদে দাঁড়িয়ে তোমার বড় বড় সন্তানেরা চিৎকার করে বলে এই বছর অমুক দেশে পাঁচ লাখ লোক পাঠিয়েছি তমুক দেশে দশলাখ লোক পাঠিয়েছি। মা তুমি কি কোনদিন তাঁদের কাছে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছ যে, তোরা যে আমার গরিব সন্তানদের বিদেশ পাঠিয়ে আমার ভাগ্যলয়ে দাঁড়িয়ে ঢোল বাজনা বাজাচ্ছিস আমার সন্তানদের খোঁজ খবর নিয়েছিস কি?

জানি মা, তুমি এই প্রশ্ন করবে না। আসলে মা জানো কি আমরা যখন তোমার কোলে ছিলাম, তখন তোমার বড় বড় সন্তানেরা আমাদেরকে অত্যাচার করেছে। সমান অধিকার দেয়নি, আমাদের সাথে সবসময় দুর্ব্যবহার করেছে। আজ বিদেশে এসেও বিদেশিদের কাছে লাঞ্ছিত হচ্ছি প্রতিদিন। এই লাঞ্ছনার কষ্ট বুকে নিয়ে কাজ করে চলেছি আমরা। কাজ শেষে বেতন পাচ্ছিনা সময় মতে, বেতন চাইলে মা আমাদের সাথে চোখ রাঙিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাষা ব্যবহার করে। আর গরিব মিসকিনের সন্তান বলে গালি দেয়। আসলে কি মা আমরা নিখাত গরিব? নাকি মা আমাদেরকে গরিব বানিয়ে রাখা হয়েছে?

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে কি মা জানো, তুমি যে আমাদের রাখালি করার জন্যে তোমার বড় বড় সন্তানদের উপর দায়িত্ব দিয়েছ। তাঁরা মা আমাদের দায়িত্ব নিচ্ছেন না। তাঁরা আমাদের দায়িত্ব নিবে ওয়াদা করে বিদেশে এসে, বড় বড় এসি রুমে রাজসিংহাসনে রাজার বেসে বসে আছে। মাঝেমাঝে তোমার কষ্টেসৃষ্টে জর্জরিত সন্তানেরা সেই রাজাদের কাছে যেঁতে হয়। সেখানে গেলে মা আমাদের সাথে যেভাবে দেশে ব্যভিচার করেছে,এখানে এসেও তা-ই করছে। এক মায়ের সন্তান হয়েও তাঁদেরকে ভাই বলে ডাকতে পারিনা। ভাই বললে চরম রাগ করে,আর শিখিয়ে দেয় স্যার বলতে। আচ্ছা মা তুমি আমাদেরকে কেনো শিক্ষা দিলে,বিদেশের বাড়িতে সবাই ভাইভাই হয়ে থাকতে?

আমাদের পড়শি দেশের মায়ের সন্তানদের কথা বলবো, যারা আমাদের সাথে কাজ করে। মা তুই কিন্তু রাগ করিস না। মারে তাদের সুযোগ সুবিধা আমাদের চেয়ে হাজারগুণ বেশি। কেনো জানিস? তাদের দেশমাতা তাদের নিরাপত্তার জন্যে যোগ্যতা সম্পূর্ণ সন্তান পাঠিয়েছে বিদেশের মাঠে। যে মাঠের কোনো খেলোয়াড় অসুবিধায় পড়লে সাথে সাথে এলাজের ব্যবস্থা করে। আর মা আমরা একেই মাঠের খেলোয়াড় হয়েও আমাদের এলাজ করার কেউ নেই। জীবন খেলার বিদেশের মাঠে প্রায়সময় বিরাটকার ইনজুরিতে পড়তে হয় আমাদের। আমাদের এলাজ করার জন্যে যে, ডাক্তার সন্তান তুমি পাঠিয়েছ সে মা আমাদের এলাজ করেনা। তাই অনেক সময় তোমার গরিব সন্তানেরা সবকিছু বিসর্জন দিয়ে পুঙ্গ হয়ে তোমার কোলে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

মারে, বিদেশের মায়ের সন্তানেরা বিদেশে আসার সময় সেদেশের বড় বড় সন্তানেরা গরিব ভাই বোনদের হাতে প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে দিচ্ছে। যাঁতে করে কোনোরকম বিপদে পড়িলে উদ্ধার হতে পাড়ে। আচ্ছা মা বলতো, আমরা আসার সময় তোমার বড় বড় সন্তানেরা আমাদের হাতে কি দিয়েছে? মা বড় কষ্ট লাগে যখন দেখি বিদেশ মায়ের সন্তানেরা সামান্যতম অসুবিধা পড়লে দূতাবাসকে ফোন করে। আর দূতাবাসের বড় বড় সন্তানেরা তাঁদের দেশমাতার সন্তান,গরিব ভাই বোনদের পাশে এসে দাঁড়ায়। আর মা আমাদের দূতাবাসের নাম্বার প্রর্যন্ত নেই। কেনো জানিস মা? আমরা বিপদেআপদে পড়লে ফোন দিলে তোমার আদরের বড় সন্তানেরা আসবেতো দূরের কথা, উল্টা অনেক রাগ করে।

ভারত,পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের মায়ের সন্তানেরা প্রবাসে এসে বুক উচিঁয়ে চলাফেরা করছেন। কেউ কিছু বলার সাহস নেই,কেউ কিছু করার হিম্মত নেই। আর তোমার সন্তানেরা নিয়মের বিতরে থেকে চলাফেরা করেও অত্যাচারিত হতে হচ্ছে। রাস্তায় বেড় হলে পাথর মারে,ডিম মাড়ে, গাড়ি থেকে থুথু মাড়ে, লাঠি দিয়ে আঘাত করে। সাইকেল নিয়ে কর্মস্থলে যাওয়াআসার সময় গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে আহত নিহত করে দিচ্ছে। কেনো জানিস, আমাদের সাথে এসব করলে কেউ কৈফিয়ত চাইবেনা, তাঁদের বিচারও হয়না। এঁদের বাবাদের কাছে বিচার দিলে বলে,এরা বজুরা বাচ্চাকাচ্চা বুঝেনা। আসলে তাঁদের বয়স আমাদের চেয়ে অনেক বড় হবে।

মা তোর কাছে আরেকটি শেষ নালিশ করছি। রাগ করে মুখ মলিন করিস না। তোমার মলিন মুখ দেখলে তোমার লক্ষ লক্ষ গরিব সন্তানের বুক ফেটে কান্নাকাটি শুরু করবে। মা, মারে আমি গত রমজান মাসে পাসপোর্ট আনতে তোমার এক বড় সন্তানের কাছে গিয়েছিলাম। রমজান মাসের কারণে সেখানে তোমার গরিব সন্তান হিসাবে আমি একা-ই ছিলাম। সময় তখন বিকেল চারটা, অফিস একদম খালি। দূতাবাসের বাহিরে আরবি গাড়ির ড্রাইভার কে বলেছি পাঁচ মিনিট লাগবে। আমি আবার কাজ থেকে ফিরছিলাম। আরবি ড্রাইভার আমাদের কোম্পানির ম্যানেজার। ভিতরে গিয়ে দেখি মা তোমার বড় এক সন্তান বসে কিছু কাগজ এদিক সেদিক করছে। আমি আমার পাসপোর্ট এর কাগজ দিলাম, দিতেই বললেন একটু দাঁড়ান। আমি অপেক্ষা করছিলাম আর ভাবছিলাম, মনে হয় অনেক দূরে আমার পাসপোর্ট!

এদিকে ম্যানেজার ফোন দিয়ে আমাকে জলদি করার কথা বলছে। এভাবে প্রায় ২৫ মিনিট দাঁড়ানোর পর রাগ করে ম্যানেজার গাড়ি নিয়ে চলে গেছে। আমি আবার কাগজ দিয়েছি,তখন তোমার বড় সন্তান আমার সাথে তুচ্ছতাচ্ছিল্যর সাথে যা তা ব্যবহার করেছে। আমি খামোশ হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় চল্লিশ মিনিট পড়ে আমাকে বলে দেন কাগজ। আমি দিলাম, দিতেই টেবিলের সামনে রাখা কার্টুন থেকে পাসপোর্ট দিলেন। মা”রে তুমি কি একটু জিজ্ঞাস করবেনা ৩০সেকেন্ডের সময়ের জন্যে আমাকে কেনো চল্লিশ মিনিট দাঁড় করিয়ে বিপদে ফেলিলেন? পাসপোর্ট নিয়ে বাহিরে এসে দেখি কোন গাড়ি নেই। তাই পায়ে হেঁটে তিন কেঃমি পথ পাড়ি দিয়ে বাসস্টপে এসে,বাসে করে রুমে ফিরেছি।

পরেরদিন সকালেই আমাদের কোম্পানির ম্যানেজার, আমমাকে দেখেই বলতে লাগলেন তুই প্রতারক, মিথ্যাবাদী, আরো অনেক কিছু। সেই থেকে ম্যানেজার আমাকে দেখতে পাড়ছেন না।

মা, আমার উপরে রাগ করিস না। অনেক বিচার দিয়ে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দিস। আমি যে তোমার-ই হতভাগা সন্তান। হে আমার মা, মাটি, জননী তুমি সুখে থাকলে তোমার সন্তানেরা সুখে থাকে। তোমার মলিন চেহারা দেখলে আমাদের প্রবাস জীবনে নেমে আসে কষ্টের কালো মেঘ। ভালো থাকিস মা!

ইতি! তোমার প্রবাসের সন্তানেরা