ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

Book copy .

‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’- তরুণ লেখক ডা. নুজহাত চৌধুরীর লেখা একটি অনবদ্য প্রবন্ধ সংকলন। সতেরোটি প্রবন্ধের সংকলনে বইটি পূর্ণাঙ্গ রুপ ধারণ করেছে। প্রবন্ধ গুলোর শিরোনাম হচ্ছে-বুকের ভিতর জ্বলছে আগুন, যেতে হবে বহু দূর, শূণ্যতা থেকে শক্তি, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবেই নারী, স্বপ্নীল সময়, মৃত্যুঞ্জয়ী ফিনিক্স পাখী, এখন তিনিই বাংলাদেশ, এ লড়াই অবশ্যম্ভাবী ইত্যাদি।

হায়! কি চমৎকার চমৎকার নাম- মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবেই নারী- কত আকর্ষণীয় শিরোনাম! বুকের ভিতর জ্বলছে আগুন, শিরোনামই বলে দিচ্ছে বইটির ভিতরে লেখকের কি অন্তরদাহ লুকিয়ে আছে। বইটি একবার পড়ে দেখুন। তৃষ্ণা মিটবে না।

একজন লেখকের সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। তবুও কোনো বই পাঠান্তে অবচেতন মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তা প্রকাশ করতে না পারলে এক ধরনের অস্বস্তি বোধ কাজ করে মনের গভীরে। মনের সেই তীব্র তাড়না থেকেই মূলত প্রবন্ধকার ডা. নুজহাত চৌধুরীর প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ ’এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিমত প্রকাশ করছি। মা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীকে উৎসর্গ করা চমৎকার প্রচ্ছদবিশিষ্ট বইটির ব্যতিক্রমী নামটাই প্রথমে আমার মনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, এক একটি প্রবন্ধ জীবনের এক একটি দ্বার খুলে দিচ্ছে। প্রতিটি প্রবন্ধ আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। উপলব্ধিকে নতুন আঙ্গিকে অনুভব করতে শিখিয়েছে।

‘বুকের ভিতর জ্বলছে আগুন’- প্রবন্ধটি যখন আমি পড়া শুরু করি তখন আমার একটু আধটু মাথা ব্যাথা ছিল। বইটা পড়তে পড়তে একটা লাইনে এসে আমি অজানা রাজ্যে হায়িয়ে যায়। ভুলে গেলাম আমি কে? মনে রইলো না মাথা ব্যাথা! আশে-পাশের শব্দও কানে আসলো না। কিছুক্ষণের জন্য লেখক আমাকে তার চিন্তার রাজ্যে নিয়ে গেলো। “মুসলমান হয়ে আরেক মুসলমানকে কাফের ,মুরদাত বলা কি এতই সহজ? কে বলতে পারবে কার তরিকা সঠিক? একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা জানেন কার অন্তর কতটা সফেদ। আল্লাহ সকলের নিয়ত স্পষ্ট জানেন। কার অন্তরে দেশ প্রেম আছে,কে ধর্মকে ব্যবহার করছে।“ (পৃষ্ঠা-১৭) লেখক যখন এরকম নিখুঁদ খোদা বিশ্বাসী বাক্য উপস্থাপন করেন, তখন নিঃসন্দেহে তার লেখার প্রতি এবং তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়।

মোট ১৭টি প্রবন্ধের পৃথক পৃথক আলোচনা করতে গেলে বিস্তর স্থানের প্রয়োজন। তাই জোটবদ্ধভাবে অল্প-স্বল্প বলছি ‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ বইটি সম্পূর্ণ একটি মৌলিক গ্রন্থ। লেখক বইটিতে মুক্তিযুদ্ধে তার বাবা হারানোর বেদনার কথা, তার বাবার আত্মস্বীকৃত খুনীদের কথা, তার বিধবা মায়ের জীবন সংগ্রামের কথা, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থার কথা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা, জনকণ্ঠ পত্রিকার অবদানের কথা ,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কথা, নতুন প্রজন্মের কথা, তার ব্যাক্তিগত ক্ষোভ, অভিমান আর বেদনার কথা সুন্দর, সাবলীল ও অনবদ্য ভাষায় অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন সুন্দর সুন্দর শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে। যেমন- “বুলেট দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিল সেই বুকটা, যা ছিল আমার পরম আশ্রয়, যে বুকের ওপর আমি উপুড় হয়ে না ঘুমালে আমার ঘুমই আসত না।”

ডা. নুজহাত চৌধুরী একজন চিকিৎসক, সংগঠক, তুখোর বক্তা ও একজন সুলেখক। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রজন্ম একাত্তরের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন ইংরেজী ও বাংলা পত্র-পত্র্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্মৃতিচারণ ও প্রবন্ধ লিখছেন। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ সংকলন ‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ গত বইমেলায় প্রথম বের হয়।‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ নিঃসন্দেহে একটি সুখপাঠ্য বই। বইটি পড়ার পর বইয়ের লেখক ডা. নুজহাত চৌধুরীকে বাস্তববাদী ও সুলেখক না বলে পারবেন না।

তার বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীও একজন সুলেখক ও সম্পাদক ছিলেন। তিনি “যাত্রিক” নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ‘যাত্রিকে’ লিখতেন শামসুর রাহমান, জহির রায়হান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দীন আল আজাদসহ অনেক প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যক। তার মা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীও বেশ পরিচিত মুখ বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে। আমার এই অতি বচনের কারণ হল, ‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ বইয়ের লেখক ডা. নুজহাত চৌধুরীকে অতি সহজে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যদিও তিনি স্বনামেই বেশ পরিচিত। মোটকথা লেখক ঔরসেই তার জন্ম।

লোভ সামলাতে না পেরে বইটি আর্জেন্ট অর্ডার করে রকমারী ডটকম ঢাকা থেকে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে এনেছি। বইটি হাতে আসতেই এক রাতেই এক বসাতেই পড়ে ফেললাম। বইটি পাঠ করে একজন কবি কিংবা সাংবাদিক হিসেবে আমার মধ্যে এই প্রতীতি জন্মেছে যে তাঁর ১৭ টি প্রবন্ধের একটিও দূর্বোধ্য বা অপাঠ্য নয়। সবগুলোই সুপাঠ্য। তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধই ব্যতিক্রমধর্মী, গল্পধর্মী, সামান্য বিষয়ও অসামান্য হয়ে উঠেছে তাঁর সহজ সরল প্রকাশ ভঙ্গির গুণে, চিত্রকল্পের নিপুণ প্রয়োগে। লেখক তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তার আনন্দ-বেদনা, তার স্বপ্ন কিংবা স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা কারিগর পাখী বাবুই এর মতো নিপুত হাতে বর্নণা করেছেন।

বইটির মুদ্রণ বেশ সুন্দর। বাঁধাই ও অঙ্গসজ্জায় কোনো ত্রুটি চোখে পড়েনি। বইটি প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। লাল,কালো এবং ধূসর রঙ্গে মিশেলে বইটির দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন আমার প্রিয় প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষ। ১২৮ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ২৫০ টাকা। বইটিতে লেখকের মন-মানসিকতা, অভিমান,কান্না, ক্রোধ, হতাশা, ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা ও সাহসিকতার আলামত পাবেন। পাঠক, তৃপ্তি সহকারে পড়বেন এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক।