ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘ডু ইউ বিলিভ ইন লাভ? এই পৃথিবীতে ভালোবাসার অস্তিত্ব আছে বলে মনে করো তুমি?’ রাখাইন মেয়ে মাথিনের প্রেমিক সুদর্শন পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজকে এই প্রশ্ন করেছিলেন মিসেস মুলান্ড। তখন ধীরাজ চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার এএসআই। বড়কর্তার স্ত্রী; সদ্যপরিচিতা সুন্দরী বিদেশিনীর এমন কড়া পাকের আবেগ মেশানো প্রশ্নটির উত্তর সেদিন জানা ছিল না ধীরাজের। তারও বহুদিন পর ধীরাজ খুঁজে পেয়েছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর। টেকনাফ থানায় বদলি হয়ে আসার পর। এখানকার জমিদার ওয়াং থিনের মেয়ে মাতিনের চোখে।

রোজ থানা প্রাঙ্গণের পাতকুয়া থেকে জল নিতে আসে মাথিন। ‘যার গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে মন টলমল করে করে ধীরাজের। চিরকালের আশ্রয়ের আকুলতা জেগে ওঠে। ইচ্ছে করে সন্ধ্যার নির্জন অন্ধকারে মাথিনকে একবার নিজের ঘরে ডেকে নিতে। একটু র্স্পশ, বুকের যেখানটায় অবিরাম হাহাকার-সেখানে তাকে জড়িয়ে কয়েকটি মুহূর্তের অপার সুখের অনুভব।’ সেদিন ধীরাজ উপলব্ধি করে, ‘মিসেস মুলান্ড ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন একবার, তার হাসি-লাস্যে-শরীরী-ভাষার প্ররোচনা দিয়ে। কিন্তু মাথিনের ব্যপারটা অন্য রকম। এই অন্যরকম ব্যাপারটায় প্রেম। ভালোবাসা। জেনেছেন ধীরাজ। জেনেছেন ‘দূর-সম্পর্ক’র পাঠক-পঠিকারাও।

২. মাথিন-ধীরাজের প্রেমের স্বাক্ষী হয়ে এখনো আছে ‘মাথিনের কূপ’। সেই কূপ দেখতে গিয়েই স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নিজেদের প্রেমকে নতুন করে আবিস্কার করলেন ক’জন যুবক-যুবতী। তাদের একজন ডা. রায়হান। ইর্ন্টানশিপ শেষ করার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল টেকনাফে। টেকনাফে প্রায় নির্বাসনের জীবনটা সহনীয়; এমনকি আনন্দময় হয়ে উঠেছিল অন্য এক মাথিনের জন্য। জ্বরের ঘোরে যার হাত ধরে ডা. রায়হান বলেছেন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি পুতুল’। সেই থেকে মাথিনের নাম অন্য পুতুল। বহুদিন পর টেকনাফ এসে সেই পুতুলের দেখা পায় ডা. রায়হান। অত:পর ফিরে আসে অতীত।

ডা. রায়হান একা আসেন নি টেকনাফ। সাথে ছিলেন তার স্ত্রী জিনাত। এই জিনাতের কারণেই পুতুলকে পাওয়া হয় নি। রায়হানের সফরসঙ্গী ছিল শাহরিয়ার ও দীপা এবং তাদের বন্ধু শোভন। শাহরিয়ারের চেয়েও শোভনের প্রতি সবসময় বিশেষ গুরুত্ব থাকে দীপার। শোভনের জন্য বরাদ্ধকৃত গেস্ট হাউজের কক্ষটি অপেক্ষাকৃত কম মানের হওয়ায় চিন্তিত হয় দীপা। কিংবা নাস্তার টেবিলেও শোভনের অনুপস্থিতি সবার আগে চোখে পড়ে দীপার। ‘কপালে লাল টিপ, চোখে কাজল আর ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক এঁকে শোভনের কাছেই দীপা জানতে চাই সাজটা ঠিক আছে কী না।’ শোভনও ফেসবুকে কবিতা লেখে দীপাকে নিয়ে। তাই জিনাতের সন্দিগ্ধ মনের প্রশ্ন ‘দীপার সঙ্গে শোভনের সর্ম্পকটা কী রকম?’

উত্তরটাও পাওয়া যায়। শোভনকে ভালবাসত দীপা। দুদিন দেখা না হলে দুনিয়াটা অর্থহীন মনে হতো। শোভন জার্মানি যাওয়ার সময় এমন করে কেঁদেছিল, যেন তাকে ছাড়া সে বাঁচবেই না। অথচ শোভন ফিরে আসার আগেই বিয়ে করে তারই বন্ধু শাহরিয়ারকে। অবশ্য শাহরিয়ার মিথ্যে বলেছিল দীপাকে। ‘শোভন জার্মানিতে বিয়ে করেছে বলে খবর দিয়েছিল দীপাকে’। এই মিথ্যে বলার অনুশোচনায় প্রতিনিয়ত দগ্ধ হয়েছে শাহরিয়ার। হয়তো সেজন্য দীপার কাছে তার প্রশ্ন ‘তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?’। একথায় শাহরিয়ারের প্রতি করুণা হয়েছিল দীপার।

16473596_10206479728710980_2660504605319447392_n

৩. ‘দূর-সর্ম্পক’ সাহিত্যের শাখার বিচারে উপন্যাস। এখানে বর্ণিত হয়েছে পৃথক তিনটি প্রেমের গল্প। ডা. রায়হান-পুতুল, মাথিন-ধীরাজ, এবং শোভন-দীপা- শাহরিয়ারের ত্রিভূজ প্রেম। তবে তিনটি গল্পেই রয়েছে যোগসূত্র। তীব্র ভালোবাসা সত্ত্বেও তিনটি প্রেমের পরিণতি ঘটে বিয়োগাত্বক ট্রাজিডিতে। ধীরাজকে না পেয়ে ‘অন্নজল ত্যাগ করে মাথিন। শেষ পর্যন্ত মারাই গেল সে। ডা. রায়হানকে না পাওয়া পুতুল মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। অবশ্য এটি আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা- বোঝা যায় নি। তবে যে ট্রাক চাপায় তার মৃত্যু হয় তার চালকের দাবি, ‘পুতুল নিজেই লাফ দিয়েছিল গাড়ির সামনে’। দীপা-শোভন-শাহরিয়ারও সুখী নয়। প্রতিনিয়ত তাদের হৃদয়ে বেদনার ঝড়।

ধীরাজ পরবর্তী জীবনে নায়ক হয়েছিলেন। যেটি তার জীবনের লক্ষ্য ছিল। যেদিন মাথিনের মৃত্যুর খবর পায় সেদিন অভিনয় করতে পারছিল না সে। ছবির নায়িকা সীতাদেবী সেজন্য বলেছিলেন, ‘ইউ কাওয়ার্ড’। মৃত্যুর আগে তাকে মনে করে এই কথাটিই হয়তো বহুবার বলে গেছেন মাথিন, অন্য ভাষায়, দুর্বোধ্য শব্দে।

৪. করুণ রসে আবর্তিত ‘দূর-সর্ম্পক’র কাহিনি। তিন নারী চরিত্রের মনোবেদনাকে পুঞ্জিভূত করেই এর কাহিনি। আর পুরুষ, প্রণয়ের খেলায় নামিয়ে চরম সর্বনাশের দিকে ঠিলে দিয়েছিলেন। উপন্যাসিকের ভাষায়, ‘যুগে যুগে ধীরাজ বাবুরা মাথিনকে ভালোবাসার জালে আটকায়, এই মেয়েগুলোর চারপাশে তো অমার্জিত নিরক্ষর খেটে খাওয়া মজুরিশ্রেণির পুরুষের ভিড়, তাই শহুরে চাকচিক্য দিয়ে, চালাকি দিয়ে দিয়ে এদের কাবু করতে পারে সহজে। তারপর সময়-সুযোগ বুঝে সরে পড়ে..। মাতিনরা অপেক্ষা করে, অপেক্ষা করে। তারপর এভাবেই পাগলের মতো তার বাবুকে খুঁজে বেড়ায় মানুষের ভিড়ে’।

৫. হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, ‘উপন্যাস মানুষের কাহিনি; সাধারণ মানুষের কাহিনি। চারপাশের বাস্তব মানুষের গল্প। আগে সাহিত্য রচিত হতো দেবতাদের নিয়ে, পরীদের নিয়ে, তাদের নিয়ে যারা অসাধারণ। আধুনিককালে একসময় মানুষ আবিস্কার করে যে তারই মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি গল্প এবং তা জানার মতো, বলার মতো। এ চেতনা সৃস্টি হয় উপন্যাসে আধুনিককালে।’

বিশ্বজিৎ চৌধুরীও মানুষের গল্প তুলে এনেছেন ‘দূর-সর্ম্পক’ এ। এ গল্প মানবজীবনের অর্ন্তনিহিত প্রেমের। উপন্যাস মানব জীবনের অর্ন্তদ্বন্দ্ব, প্রেম-ভালোবাসা ও সামাজ বাস্তবতার গল্প। ‘দূর-সর্ম্পক’ উপন্যাসের চরিত্রের মনস্তত্ব বিশ্লেষণে তা আরো বেশি সুদৃঢ় করে।

একজন লেখককে সবসময় সমকালকে ধারণ করতে হবে। অন্যথায় পরের প্রজন্ম তাকে মনে রাখবেন না। কালের স্রোতে তিনি হারিয়ে যাবেন। পেশায় সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী সম্ভবত সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন। আর এই জন্যই টেকনাফের গল্প বলতে গিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যাকে এড়িয়ে যান নি। ‘১৯৭৮ সালে মিযানমাররের সেনাবাহিনির ‘নাগাম্যান’ (ড্রাগন রাজা) অভিযানের সময় প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা এদেশে পালিয়ে এসেছিল। ৮২ সালে আরো এক দফা বিরাট সংখ্যার রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে এখানে আশ্রয় নেয়। ১৯৯১-৯২ সালে প্রায় আড়াই লাখ এবং ২০১২ সালেও রোহিঙ্গারা আসে এদেশে।’ বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সমস্যা এবং তাদের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যাগুলোর কথাও গল্পচ্ছলে বলেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী।

আবার এককালে বাঙালিরা বর্মিমূখি ছিলেন। সেটাও তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসের এক জায়গায় লেখক লিখেন, ‘এককালে চট্টগ্রামের লোকজন ব্যবসা করে আয়-উপার্জনের জন্য বার্মা যেত। এদের অনেকেই বর্মি মেয়েদের প্রেমে পড়েছে, বিয়েও করেছে সেখানে। একধরনের সম্মোহনী শক্তির কারণেই হোক বা সেবাপরায়ণতার কারণে, এদের কাছে এ দেশের পুরুষের আত্মসমর্পণের ইতিহাস দীর্ঘকালের। তা ছাড়া এ দেশের শ্যামল রং রমণীর যতই সুনাম থাকুক, দুধে-আলতা রঙের প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের পক্ষপাত তো বহুবিদিত। বর্মি মেয়েরা সাধারণত চটুল স্বভাবের- এমন একটি জনশ্র“তি থেকেই হয়তো ‘রেঙ্গুন-রঙিলা’ বলে একটি কথা চালু ছিল সেকালে। স্বামীকে ব্যবসার জন্য রেঙ্গুন পাঠিয়ে কপাল পুড়েছে এমন নারীর তো অভাব ছিল না চট্টগ্রামে, নইলে শেফালী ঘোষের গাওয়া ‘অ শ্যাম রেঙ্গুন ন যাইও’ গানের আর্তি এত জনপ্রিয় কী করে হলো এই অঞ্চলে! ” শেফালী ঘোষের এই আর্তনাদ কি মাতিন-পুতুলের হাহাকারকে আরো বাড়িয়ে দিতে?

সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না লেখক। সমাজের চোখে শ্রদ্ধার পাত্র পুলিশ ও সাংবাদিক, এই দুই পেশার লোকদের নৈতিকতার জাযগা নিয়ে সমকালে যে প্রশ্ন উঠছে তাকে আরো জাগিয়ে দিলেন তিনি। থানার ওসি মহেন্দ্র বাবুর উৎকোচ গ্রহণের দৃশ্যায়ন হয় উপন্যাসে। সরকারি হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট করলেও হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুপস্থিতির বিষয়টি সাংবাদিকরা কেন এড়িয়ে যান সেই প্রশ্নও বাদ যায় নি।

মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের আত্মসম্মানবোধ, কিংবা জাতিগত যে দ্বন্দ্ব সেটিও উঠে এসেছে শোভন এবং পুতুলের বাবার চরিত্রে। মধ্যবিত্তের যে প্রবল আত্মসম্মানবোধ সেখান থেকেই কর্মচারীদের ঘরে থাকতে দেয়ায় গেস্ট হাউজ ছেড়ে দেয় শোভন। আবার পুতুলের বাবাকে যখন রায়হান তার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তখন প্রতিত্তুর ছিল এমনি – ‘বাঙালিরা মনে করে, মগের মেযেরা একেবারে সস্তা, ফেলনা, ওদের চাইলেই পাওয়া যায়, অথচ একটা মগের ছেলে চাইলে কি এত সহজে বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে?’

টেকনাফ থানার ওসি তোফায়েল। টরেন্টোতে বউ-বাচ্চা রেখেই বিয়ে করেন কম বয়সী রোহিঙ্গা মেয়ে সামিনাকে। সামিনার পরিবার তোফায়েলের অতীত জানে। কিন্তু তোফায়েলের প্রথম স্ত্রী শাহানা জানেন না সামিনার কথা। এই বিয়ের ভবিষ্যৎ নেই। তোফায়েলের ভাষায়, ‘সত্যিই জানি না। কোথায় নিয়ে যাব? হয়তো ওর বাপের হাতে টাকা পয়সা দিয়ে ছেড়েই চলে যেতে হবে…।’

সমাজ নিয়ে ভাবেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী । তাই তোফায়েল-সামিনা ও প্রাসঙ্গিক সমাজ বাস্তবতার চিত্র তুলে এনে পাঠকদের কাছেও নতুন ভাবনার দুয়ার খোলে দিলেন তিনি। এখানে একটি কথা বলতেই হয়, বিশ্বজিৎ চৌধুরীর পাঠকনন্দিত একটি উপন্যাস রয়েছে ‘হে চন্দনা পাখি’। প্রেমই ছিল উপজীব্য। সমকালীন সমাজের চিত্র ছিল না সেখানে। হযতো তাই কালের আর্বতে হারিয়ে যাবে সেটি। ঠিকে থাকবে ‘দূর-সম্পৃক’। তবে লেখক ‘বাসন্তী তোমার পুরুষ কোথায়’ নামে অন্য উপন্যাসটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি ‘দূর-সর্ম্পক’ দিয়ে।

৬. ভাষা-শৈলি ও সংলাপ, প্রতিটি উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যের ছাত্র বিশ্বজিৎ চৌধুরী সে জায়গায় বেশ সচেতন ছিলেন ‘দূর-সর্ম্পক’ এ। তবুও কিছু জায়গায় তার অবচেতন মনের কারণে পাঠকের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে। শব্দচয়নে ছিল ইংরেজির মিশ্রণ। যেমন- ‘টেকনাফ যাওয়ার প্ল্যান ছিল না’। ‘আজ যে আছে কালও সে থাকবে, তার কোন গ্যারান্টি নাই’। আবার কিছু জায়গায় সংলাপ হিসেবে এসেছে ইংরেজি। সেগুলো গ্রহণযোগ্য।

বি.দ্র. এটি কোন মৌলিক সাহিত্য সমালোচনা নয়। ‘দূর-সর্ম্পক’ পাঠ শেষে এককজন পাঠকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মাত্র।