ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
cover1

বিকেল চারটার দিকে যখন ‘বিক্ষোভের দিনগুলোতে প্রেম’ উপন্যাসটি পড়া শেষ করলাম, তখন মনে পড়ল, দুপুরে ভাত খাওয়া হয়নি। টানা প্রায় তিন ঘন্টা, মজেছিলাম উপন্যাসটিতে।

শুধুই কি তিন ঘন্টা? সত্যি বলতে কি, এই তিন ঘন্টায় স্বৈরাচারী প্রেমিক পুরুষ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দীর্ঘ  নয় বছরের শাসনামলের অলিগলি ঘুরে এসেছিলাম। ধন্যবাদ, লেখক আনিসুল হক ।  যখন এরশাদ ক্ষমতা নেয় তখন পৃথিবীর আলো দেখিনি, আবার যখন  এ স্বৈরাচারীর পতন ঘটে তখন ক্ষমতার মানে বুঝতাম না। কিন্তু বরাবরই কৌতূহল ছিল এরশাদের শাসনামল নিয়ে। আজ সেই কৌতূহল আরো বৃদ্ধি পেয়েছে!

ইতিহাস রচনা করবেন ঐতিহাসিকরা। কিন্তু অনেক সময় এ ইতিহাস পাঠ পাঠকের কাছে বিরক্তির কারণ হয়। শুধু তথ্যর পর তথ্য উপস্থাপনই এ বিরক্তির কারণ। কিন্তু ব্যতিক্রম ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে রচিত উপন্যাস। তবে এখানেও ঔপন্যাসিককে দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়। কারণ, তথ্য উপস্থাপনই যে শুধু তার রচনার মূখ্য উদ্দেশ্য হতে পারবে না। আবার তথ্যও বিকৃতি করা যাবে না। ঔপন্যাসিককে মনে রাখতে হয়, ‘অতীতের প্রতি ঔপন্যাসিকের শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও প্রেম-বিমুগ্ধ চিত্তই উপন্যাসকে মাধুর্য দান করে’।

ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে এত কিছু বলার কারণ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের রাষ্ট্রের দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে থেকে আশির দশকের টানা নয় বছরের খন্ডিত চিত্র উঠে এসেছে ‘‘বিক্ষোভের দিনগুলোতে প্রেম’’ উপন্যাসে।

এই দিক থেকে উপন্যাসটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের দাবিদার। তবে পুরোপুরি শুদ্ধ ঐতিহাসিক উপন্যাস কোনভাবেই বলা যাবে না। কারণ, শুদ্ধ ঐতিহাসিক উপন্যাসের সব গুণাবলী এখানে নেই।

আবার এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র (যদিও দৃশ্যমান ছিল না। কিন্তু কাহিনির কেন্দ্র এবং বিস্তৃতি দুটোই তাকে ঘিরেই আবর্তিত) তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের শাসানামলের একটি মাত্র দিকই আনিসুল হক তুলে ধরেছেন। এর মধ্য দিয়ে এরশাদকে শুধু ভিলেন করা হয়েছে। সাবেক এ রাষ্ট্রপতির শাসনামলের কোন ইতিবাচক ঘটনা বা তথ্য এখানে উঠে আসেনি। এখানেই আনিসুল হকের ব্যর্থতা, তিনি নিজের ব্যক্তি দর্শনকেই তার উপন্যাসে উপজীব্য করতে চেয়েছেন। এতে দূর ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে, বিশেষ করে আশির দশক যাদের কাছে ‘দূর অতীত’ সেই সময়কার পাঠকের কাছে উপন্যাসটি শুধুই চিত্ত বিনোদনের উপলক্ষ্য হয়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

অনেক রাজনীতিবিদ  রয়েছেন যারা স্বৈরশাসক এরশাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন। হালের অনেক বুদ্ধিজীবী যারাও ওই সময় সুবিধা নিয়েছিলেন। হয়তো এরশাদ নিজের অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে  ‘কৌটিল্যের কূটনীতি’ তত্ত্বের ভিত্তিতে তাদের সুবিধে দিয়েছিলেন। প্রাসঙ্গিক  হওয়ার পরেও ওইসব বিষয় আনিসুল হক কেন তার উপন্যাসে এড়িয়ে গেলেন তা বোধগম্য হচ্ছে না। হয়তো তিনি যুক্তি দেখাবেন আমি ইতিহাস লিখিনি। কিন্তু পাঠক সস্তা এ যুক্তি মানবেন কেন।

বিশেষ করে যখন ঔপন্যাসিক বলেন, ‘প্রতিবছর ২৮ নভেম্বর আসে। সেলিনা আখতার যান তাঁর ছেলের কবরে। ডা. মিলনের হত্যাকারীরা বেকসুর খালাস পায়, এরশাদকে সঙ্গে পাওয়ার জন্য দুই দল কে কত বেশি ভালোবাসা দেবে তারই প্রতিযোগিতায় নামে, প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিদিন একটু একটু করে ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়’।

এমন দৃঢ় উচ্চারণের পর পাঠক যদি প্রাসঙ্গিক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন কি তা  আনিসুল হকের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে?

বুয়েটের ছাত্র ছিলেন আনিসুল হক। হয়তো এ কারণেই উপন্যসাটির সিংহভাগ চরিত্রই বিশ্বিদ্যালয়টির ছাত্র-ছাত্রী। উপন্যাসিটর চরিত্র শওকত, হাবিব, শাহিন, মাকসুদার রাহমান, সানাউল্লাহ, বহ্নি, মৌটুসী, আবীরসহ আরো অনেকই বুয়েটের শিক্ষার্থী।

জীবনের উচ্চ আসনে নিজেদের নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন বুয়েটে।   এরশাদের শাসনামলে প্রণীত মজিদ খানের শিক্ষানীতি ‘ঘোরতর সাম্প্রদায়িক’ হওয়ায় তারা আন্দোলন শুরু করেন। যার ডালপালা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপি। স্লোগান উঠে –

এক দফা এক দাবি
এরশাদ তুই কবে যাবি?
জনতার দাবি এক
এরশাদের পদত্যাগ।

সাফল্য না আসা পর্যন্ত বিদ্যমান এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে বুয়েটের এসব শিক্ষার্থীর জীবনের স্বপ্ন, প্রেম, যৌনতা এবং আনন্দ-বেদনা ও হাস্যরসসহ বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। বাদ যায়নি সমাজ ও পরিবারের প্রতি তাদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে সেই দিকটিও। মূলত তাদের জীবনের গল্প তুলে ধরতে গিয়ে সমকালীন রাজনৈতিক চরিত্রের দৃশ্যায়নের চেষ্টা করেছেন আনিসুল হক।

এ ক্ষেত্রে আনিসুল হকের বক্তব্য- ‘যেসব ছাত্র জিয়াউর রহমানের সময়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বিচারপতি সাত্তারের আমলে বুয়েটে ভর্তি হয়ে হু মু এরশাদের আমলে ক্লাশ শুরু করে, তাদের অনেকেই এরশাদের পতন হওয়া পর্যন্ত বুয়েট এলাকাতেই বসবাস করেছে। এই প্রেমকাহিনি সেই সময়কার। একদিকে স্বৈরাচারী প্রেমিকপুরুষ, কবি ও সৈনিক লে. জে. হু মু এরশাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চলছে, এরশাদ একের পর এক প্রেম করে চলেছেন, কবিতা লিখছেন, রাষ্ট্রধর্ম প্রর্বতন করছেন, অন্যদিকে যুবাবয়সী শিক্ষার্থীরা তাদের হৃদয় ও জীবন-জীবিকা লেখাপড়াসংক্রান্ত দৈনন্দিন জটিলতার পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নিঃস্বার্থভাবে সংগ্রাম করে চলেছে।

এই প্রেমিক জুটিদের মধ্যে নানা সমীকরণ শেষে শওকত-সোনিয়া, আবীর-শানুর মিলন হলো। কিন্তু মৌটুসীকে পাওয়া হলো না মাকসুদার রাহমানের। বহ্নিকে ভালোবেসে তার পাশে থাকলেও সানাউলের এক তরফা প্রেমকে মূল্যায়ন করতে চাইলো না।

ঠিক যেমন চট্টগ্রামের ‘চেরাগীতে নিত্য ঘুরঘুর করা’ কোন অস্পরার প্রতি আমাদের পরিচিত কারো অনুভূতির করুণ সমাপ্তি।

উপন্যাসে বুয়েটের এসব প্রেমমত্ত যুবক-যুবতীর পাওয়া না পাওয়ার কাহিনি এগিয়েছে এমন এক সময়ে যখন ক্ষমতায় স্বৈরশাসক। ওই স্বৈরশাসকের উত্থান- পতন এবং এসব শিক্ষার্থীর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত একই সময়ে। তাই একটির সাথে অন্যটি ছিল সম্পূরক। এ যোগসূত্র না থাকলে উপন্যাসটি হয়ে উঠত, স্রেফ কিছু আবেগ এবং যৌনতা র্নিভর প্রেম কাহিনি।

কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের যোগসূত্র উপন্যাসটিকে করে তুলেছে, স্বৈরশাসক এরশাদের ক্ষমতায় থাকা নয় বছরের রাজনৈতিক দলিল। যদিও অসম্পূর্ণ এ দলিল।

রাজনৈতিক তথ্য নিয়ে যখন রচনা তখন সমকালীন সংশ্লিষ্ট কিছু চরিত্রকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উপেক্ষা করলে রচনাটি হালকা হয়ে উঠবে। বিষয়টি উপলব্ধি করেই স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে যারা কলম তুলে নেন তাদের কথাও এড়িয়ে যাননি আনিসুল হক।

তবে এমনও হতে পারে কাহিনির স্বাভাবিক অগ্রগতিতে প্রাণ সঞ্চালন করতে ‘বিক্ষোভের দিনগুলোতে প্রেম’ উপন্যাসে সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, আল মাহমুদ, হুমায়ূন আজাদের উপস্থিতিকে আড়াল করা সম্ভব হয় নি। প্রাসঙ্গকি হওয়ায় উপন্যাসে জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর নেতৃত্বে ছাত্ররা এরশাদ বিরোধী যে মিছিল করেছিল তাও বাদ যায়নি।

এরশাদের শাসন মানেই ডা. মিলন হত্যার ইতিহাস। নুর হোসেনের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার ইতিহাস। রাজপথে সারি সারি লাশের স্তূপ। স্বৈরশাসন মানেই চট্টগ্রামে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালানোর ইতিহাস। এরশাদের শাসন মানেই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের যাতনা। এসব সত্যও উঠে এসেছে ‘বিক্ষোভের দিনগুলোতে প্রেম’ উপন্যাসে।

‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’, বলেছিলেন কামরুল হাসান, তাঁর কথাও এসেছে উপন্যাসে। ছড়াকার লুৎফর রহমান লিটন, কবি মহাদেব সাহা, সাংবাদিক মোজাম্মমেল বাবু, আমিনুর রশীদ, কুদ্দুস আফ্রাদ, আমান উদদৌলাসহ আরো অনেক সমকালীন চরিত্রই স্থান পেয়েছে এ উপন্যাসে।

উপন্যাসকে কোন কোন সাহিত্য সমালোচক ‘পকেট থিয়েটার’ বা ’ক্ষুদ্র নাট্যবেশ্ম’ বলে থাকেন। কিন্তু উপন্যাস নাটক নয়, তবে উপন্যাসে নাটকীয়তা থাকতে পারবে। নাটকের সাথে অঙ্গীভূত ট্রাজিডি  অনেক সময় চলে আসে উপন্যাসেও।

Aristotle এর ভাষায় ট্রাজিডি হচ্ছে –

Tragedyis an imition of an action that is serious, complete, and of a certainmagnitude; in language embellished with each kind of artistic ornament, thesevaral kinds being found in separate parts of the play; in the form of action,not of narrative, through pity and fear effecting the proper purgation of theseemotions.

এবার আসি ‘বিক্ষাভের দিনগুলোতে প্রেমে’। শওকত বাবার স্বপ্ন পূরণে বুয়েট ভর্তি হয়। কিন্তু স্কুল শিক্ষক বাবা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন শওকত এরশাদের লেলিয়ে দেয়া সামরিক সৈন্যের দ্বারা আহত হয়ে হাসপাতালে।

তার আর্তনাদ, ‘আমার বাবার অসুখ। আমি বাড়ি  যেতে পারতেছি না’। শওকত তার পায়ে থাকা প্লাস্টারের গায়ে আঁচড় কাটতে কাটতে বলেছিল, ‘যাব বলেই বের হয়েছিলাম, তখনই পুলিশ আর্মি অ্যাটাক করে বসল’।

শওকত যখন মামার সহায়তায় বাড়ি পৌঁছে তখনের বর্ণনায়ও ছিল হৃদয়স্পর্শী।

‘শওকত বলে, বাবা কই। বাঁশঝাড়ের নিচে তার কবর। খেজুর-ডাল পোঁতা। বাঁশের বেড়া দিয়ে ঢাকা। মা দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। শওকত আরেকটু থাকবে এই কবরের পাশে। পাতা ঝরছে। বাঁশপাতা। ভোরের শিশিরসমেত। আমার বাবা এখানে শুয়ে কেন? শওকত ডুকরে কেঁদে উঠে। তার বগলে ক্রাচ। দূরে তাই দেখে মা-ও কেঁদে ওঠেন।

জীবনটা তো শুধু প্রফেশন নয়, শুধু তত্ত্ব নয়। নারী-পুরুষের সম্পর্ক শুধু টাকাপয়সা দিয়ে, প্রফেশনাল সাকসেস দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন নারী একজন পুরুষের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায়। তার কাছ থেকে শুধু প্রেম চায় না, পূজাও চায়। উপন্যাসটিতে নারী জীবনের নিগূঢ় এ তথ্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন আনিসুল হক। দুই সন্তানের জননী শানুর পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া। পরকীয়া প্রেমিকের সন্তান নিজ দেহে বড় করে তোলা এ সবই কি তাহলে নারীর আকাঙ্খার প্রতিফলন।

নারী মাত্রই কি প্রেম পিয়াসী? হয়তো হা, তা নাহলে বিবাহিত মৌটুসী কেন ছুটে আসবে মাকসুদার রাহমানের কাছে। যে মাকসুদার মৌটুসীকে নিয়ে কবিতা লিখে। শুধুই কি কবিতায় কেন্দ্রীভূত হওয়ার লোভে মৌটুসীর এ ছুটে আসা। নাকি অন্য কিছু? হতে পারে প্রচুর ঐশর্যের মধ্যেও হৃদ্যিক অতৃপ্তি।

এ মৌটুসী তার প্রকৌশলী স্বামী মাহবুবকে জিজ্ঞেস করে- ‘তাজমহলের কোন দিকটা তোমাকে বেশি মুগ্ধ করে। তার উত্তর ছিল, ‘এর জ্যামিতিক সুষমা। এটা একেবারেই নিখুঁত। সিমট্রেরির এক আশ্চর্য উদাহরণ’। প্রত্যুত্তর মৌটুসীর, ‘শাহজাহানের প্রেমটা দেখলে না’।

আবার প্রেমিক শওকতকে দেখি, গভীর  রাতে ভাঙা বাসে চড়ে সোনিয়ার কাছে ছুটে যায়। কারণ দেরি করলে যে, গ্রাম্য এ বালিকার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাবে। যদিও ঢাবির উচ্চ শিক্ষিত মেয়েক বিয়ে করার সুযোগ রয়েওছ শওকতের। মাঝরাতে যখন সোনিয়ার কাছে শওকত পৌঁছে তখন সোনিয়া কান্নারত ছিল শওকতকে হারাতে হতে পারে সেই বেদনায়।

এ সোনিয়ার সাথে শওকতে প্রথম দেখা সেই উত্তাল মুহূর্তে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন জমে উঠার ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই বন্ধের কারণেই গ্রামে মায়ের কাছে আসে শওকত।

‘‘মাকে ডাকে, ‘মা, মা।’ সেই নারীমূর্তি এগিয়ে আসে। বলে, ‘চাচিআম্মা নামাজে বসছে।’

মার এ আবার কোন ভাইঝি? শওকত মনে মনে হিসাব কষে। হিসাবের কোনো ফল ফলছে না।

‘আপনি চা-পাতি আনছেন? দেন। চাচিআম্মা আপনাকে চা বানায়া দিতে বলছে।’

শওকত টেবিলের ওপরে রাখা জিলাপির ঠোঙার পাশ থেকে চায়ের পাতার প্যাকেট তুলে নিয়ে বলে, ‘এই যে চা-পাতি। জিলাপিও আছে।’

শওকত বারান্দার বেঞ্চে বসে। ঘরের দরজার গোড়ায় কেরোসিনের লন্ঠন জ্বালানো হয়েছে। তবে সলতে উসকে দেওয়া হয়নি।

এখনো অন্ধকার প্রবল নয়। আলোই এখনো কর্তৃত্ব করছে অন্ধকারের ওপরে।

কিন্তু কেরোসিনের গন্ধ ছড়িয়ে আছে বাতাসে।

মা নামাজ পড়বেন অনেকক্ষণ ধরে। নামাজ শেষে পড়বেন দোয়াদরুদ।

চায়ের গন্ধ আসছে রান্নাঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে।

শওকতের শরীর চায়ের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে।

কিন্তু তার মনটা কাঙ্ক্ষা করছে ওই কমলা শাড়ি নারীটিকে।

হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মেয়েটি আসে।

আরেক হাতে জিলাপি।

টেবিলে সেসব রেখে সে বলে, ‘আমি পানি আনতেছি এখনই।’

সে চলে যায় রান্নাঘরে।

কাঁসার গেলাসে পানি ঢেলে ফিরে আসে চটপট।

তার হাতে একগাছা সোনার চুড়ি!

মেয়েটি দরজার মুখ থেকে লন্ঠনটা তুলে আনে। আলোর তেজ বাড়িয়ে দেয় চাবি ঘুরিয়ে। তার মুখখানা আবারও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে লন্ঠন রাখে টেবিলে।

শওকত বলে, ‘তোমার নাম কী?’

‘আমার নাম সোনিয়া।’

 

ওই রাতেই রেডিওতে খবর শুনতে সোনয়িাদের বাড়ি যাচ্ছিল শওকত।

 

‘‘ রাত্রি পৌনে আটটা এই গ্রামে অনেক রাত।

সবার খাওয়া হয়ে গেছে।

শওকত বলে, ‘রেডিওটা কই আমাদের?’

মা বলেন, ‘তোর বাবা মরার পর তো সেইটার কোনো খোঁজখবর নাই।’

‘আরে বিবিসি শোনা দরকার ছিল। কালকা ঢাকায় ঘেরাও। কী হয় না-হয় শুনি।’

‘যা, তোর নুরুল বিএসসি স্যারের বাড়ি যা। অরা খুব খবর শোনে। সোনিয়ার সাথে যা। সোনিয়া, ও সোনিয়া। ভাইজানক বাড়িত নিয়া যাও। ভাইজান রেডিওতে খবর শুনিবে।’

ঝিঁঝি ডাকছে।

জোনাকি জ্বলে উঠেছে এদিক-ওদিক।

শেয়ালের ডাক আসছে কাশবনের দিক থেকে।

গৃহস্থ বাড়িগুলো থেকে আসছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ রব।

সোনিয়ার হাতে একটা টর্চলাইট।

তার পেছন পেছন হাঁটছে শওকত।

সোনিয়ার গা থেকে একটা বুনো গন্ধ আসছে। শওকতের মাতাল মাতাল লাগছে।

মাথার ওপরে বাঁশঝাড়। কী যেন নড়ে ওঠে বাঁশঝাড়ে।

শওকতের বুক কাঁপে। সে সোনিয়ার নিকটবর্তী হয়। সোনিয়ার শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধ আসে। শওকতের কেমন যেন লাগে।

 

কবিরা সুবিধাভোগী। টি এস এলিয়ট বলেছিলেন, কবিরা হলো সেই চোরের মতো, যারা দরজায় এক টুকরা মাংস রাখে, যাতে কুকুর বাইরে চলে আসে, আর তারা ভেতরে ঢুকতে পারে। মানে কবির কাজ আসলে হল একটা দেখিয়ে আরেকটা হাসিল করা। তা নাহলে মাকসুদার তার কবি সত্ত্বা জাগিয়ে তোলা মৌটুসীকে কেনই বা এড়িয়ে যাবে। অথচ এ মৌটুসীর সঙ্গে একই বাসে উঠা ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাফল্য।

‘জীবনটা তো স্কয়ার নয়, সার্কেল নয়। জীবনটা হল ছক না মানা এক আশ্চর্য নদী’।