ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

‘ডাক্তার মানে সেতো মানুষ নয়
আমাদের চোখে সেতো ভগবান
কসাই আর ডাক্তার একইতো নয়
কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশান
কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার।’
সেই ২০০৪ সালে ডাক্তার সম্পর্কে তাঁর শ্রোতাদের গানে গানে কিঞ্চিত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন দুই বাঙলার জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতো। তখন কলকাতার ডাক্তার সমাজ গানটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন কী না আমার জানা নেই। তবে তারা যে মনে মনে নচিকেতার চৌদ্ধগুষ্টি উদ্ধার করেছিলেন তা আমি নিশ্চিত। সেই সময়কার কোন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নচিকেতা হয়তো গানটি গেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় এক যুগ পরে এসেও গানটির সমকালীন বাস্তবতা বিদ্যমান; অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। গত কয়েকদিন ধরে ইর্ন্টান (শিক্ষানবিশ) চিকিৎসকদের ধর্মঘট নচিকেতার গানটির লাইনগুলোর বাস্তবতা আবারো প্রমাণ করলো।
এখানে বলে রাখি, গত ১৯ ফেব্র“য়ারি রোগীর স্বজনকে মারধর করায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের চার ইন্টার্ন চিকিৎসককে শাস্তি দিয়েছে। শাস্তিটা এমনি, ‘ওই চারজনের ইন্টার্নশিপ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয় এবং তাদের পৃথক চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলিও করা হয়েছে। পাশাপাশি ছয় মাস পর শাস্তির মেয়াদ শেণ হলে তাদের ভিন্ন ভিন্ন মেডিকেলে ইন্টার্নশিপ করতে হবে। তবে এ শাস্তির প্রতিবাদে গত ৪ মার্চ থেকে ৭২ ঘন্টার কর্মবিরতি শুরু করেন সারাদেশের ইর্ন্টান চিকিৎসকরা।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিন্তু প্রথমদিন কর্মবিরতি পালন করেনি এখানকার ইর্ন্টান চিকিৎসকরা। দ্বিতীয় দিন বা ৫ মার্চ থেকে তারাও কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ৪ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। সেদিন তিনি শাস্তির প্রতিক্রিয়ায় ইর্ন্টান চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এটাও বলেছিলেন, ‘রোগীকে জিম্মি করে কেউ ধর্মঘট করুক সে ডাক্তার হোক, শ্রমিক হোক যে-ই হোক না কেন, এটা আমরা সমর্থন করি না।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সর্তকবার্তার পরদিনই কর্মবিরতি শুরু করলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের ইর্ন্টান চিকিৎসকগণও। এটা কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি চ্যালেঞ্জ?

অবশ্য ইর্ন্টান চিকিৎসকদের কর্মবিরতি বা ধর্মঘট এ দেশে নিয়মিত ঘটনা। তবে ইর্ন্টান উত্তীর্ণ পরিণত চিকিৎসকরাও বিভিন্ন সময়ে কর্মবিরতি পালন করে থাকেন। তাদের বিষয়টা তো আরো মারাত্বক।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠে ভুল চিকিৎসার। এই নিয়ে অনেক সময় রোগীর স্বজনরা দ্বারস্থ হন আদালতের। কিন্তু সেখানেও আপত্তি চিকিৎসকদের। চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার বা দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ এনে কেউ আদালতের দ্বারস্থ হলে সেই কর্মবিরতির পথ বেছে নেন চিকিৎসকরা। ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি এমন ঘটনা ঘটেছিল চট্টগ্রামে।

এখানে আরেকটি স্পষ্ট করার জন্য সংবাদপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে পারি, ‘গত (২০১৬ সাল) ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল ‘সার্জিস্কোপে’ প্রসব পরবর্তী মারা যান মেহেরুন্নেসা রীমা (২৫) নামের এক গৃহবধূ। রীমা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’র ছোট ভাইয়ের মেয়ে। চিকিৎসকের অবহেলায় রীমার মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ওইদিন রাতে সার্জিস্কোপ হাসপাতাল ভাঙচুর করে নিহতের স্বজনেরা। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীমা সিদ্দিকী রোজি ও তাঁর স্বামী মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করেন রীমার বাবা খায়রুল বাশার’।

অবশ্য এ মামলার পিছনে যৌক্তিক কারণ ছিল। অথচ মামলটিকে ‘হয়রানিমূলক’ মন্তব্য করে এর প্রতিবাদে ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি বিকেল থেকে হঠাৎ করে সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপারেশনসহ সব ধরনের চিকিৎসা সেবা বন্ধ রাখে চিকিৎসকরা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। এতে চিকিৎসকদের কিছু না হলেও সাধারণ রোগীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। কয়েকিদিন স্থায়ী ছিল এ ধর্মঘট।

এর আগে চট্টগ্রামে আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল ডা. সুরমান আলী নামে একজন চিকিৎসককে কেন্দ্র করে। ২০১২ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মলদ্বারে অস্ত্রোপচারের পর সুঁই রেখে সেলাই দেয়ার ঘটনায় ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ডা. সুরমান আলী ও জাকির হোসেন নামে দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই ছাত্রের মা দেলোয়ারা বেগম। এ মামলাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে কর্মবিরতি পালন করেছিল চিকিৎসকরা। আর ভোগান্তির শিকার সাধারণ লোকজন। অবশ্য মামলটি শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়েছিল ২০১৬ সালে।

২০১৬ সালের ৯ জুন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মোহাম্মদ হারুনুর রশিদের আদালতেও একটি মামলা হয়েছিল চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। নোয়াখালীর সহকারী জেলা জজ মোরশেদুল আলমের স্ত্রী সায়মা শিকদার সন্তান জন্মদানের সময় ‘অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায়’ মারা যাওয়ার অভিযোগ ছিল মামলায়। সায়মার মা বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন এবং এ মামলারও প্রতিক্রিয়া ছিল চিকিৎসকদের পক্ষে।

ডাক্তাররা মানুষ। তাই তারাও ভুল করবেন। একইভাবে আর দশজন পেশাজীবী মানুষ যেভাবে তাদের কর্মস্থলে অবহেলা করেন সেভাবে ‘পেশাজীবী ডাক্তাররা’ও তাদের পেশাগত জায়গায় অবহেলা করতেই পারেন। হতে পারে এ অবহেলা ‘অবচেতন মনে’ কিংবা অর্থের প্রতি অতি লোভ থেকে। এখন প্রসঙ্গটি যখন অবহেলার তখন অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠান এ অবহেলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। কিন্তু যেসব চিকিৎসক স্বাধীনভাবে তাদের ডাক্তারি পেশা চালিয়ে যান তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিবে? যদি একজন চিকিৎসক কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে রোগী দেখেন তখন অবহেলার জন্য ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা থেকে যায়। কারণ, অনেক সময় ওই চিকিৎসা কেন্দ্রের সেই ডাক্তারই অবহেলা করেছেন যিনি খোদ প্রতিষ্ঠানটির মালিক। তখন?

আমার ধারণা, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করলে বা ইর্ন্টান চিকিৎসকরা শাস্তির মুখোমুখি হতে হলে বিষয়টিকে তাদের আত্মসম্মানে আঘাত বিবেচনা করে কর্মবিরতির মত কর্মসূচী চালিয়ে যান।

আমার ছোট বেলায় আমার মা মারা গিয়েছিলেন একজন গ্রাম্য চিকিৎসকের অবহেলায়। তখন ছোট ছিলাম বুঝতে পারে নি। এতবছর পর সেটা উপলব্ধি করতে পারি। চিকিৎসকের অবহেলায় মায়ের মৃত্যু হয়েছিল বলে ডাক্তারদের উপর আমার অবিশ্বাস যেমন নেই তেমনি তাদের প্রতি কোন ক্ষোভও নেই। এখনো তারা আমার কাছে নমস্য। অসুস্থ্য হলে তারায় শেষ ভরসা। কিন্তু মাঝেমধ্যে তারাও অন্যান্য পেশাজীবীদের মত অবহেলা করতে পারেন সেটা আামি বিশ্বাস করি এবং মন থেকে।

রক্তের দিক দিয়ে আমার খুব নিকটাত্মীয়ের মধ্যে অনেক চিকিৎসক আছেন। এদের মধ্যে স্বাস্থ্য ক্যাডারও (বিসিএস হেলথ) আছেন। অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও আছেন চিকিৎসক। এলাকায়ও আছেন অনেকে। বন্ধু মহলেও ডাক্তার আছেন। তবুও আমি জোর গলায় বলব, ‘একজন চিকিৎসক যখন পেশাজীবী তখন তিনি অবচেতন মনে ভুল করতে পারেন। একজন চিকিৎসক যখন পেশাজীবী তখন তিনি স্বেচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক অবহেলা করতে পারেন। অন্যান্য পেশাজীবীরা যেমন ভুল করলেও শাস্তির আওতায় আসেন তেমনি একজন পেশাজীবী চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার জন্য শাস্তি দাবি করা যেতেই পারে। তা নাহলে সাধারণ মানুষরা একসময় প্রশ্ন করবে, চিকিৎসকরা কি আইনের উর্ধ্বে?

ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ট একজন চিকিৎসক আমাকে একবার বলেছিলেন, অপারেশনের মধ্য দিয়ে একজন মা যখন সন্তান প্রসব করেন তখন ওই মায়ের স্বাস্থ্যগত নানা ঝুঁকি থাকে। কিছু সময় পার হলে স্বাস্থগত কন্ডিশনও পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে যে চিকিৎসক অপারেশন করিয়েছেন তার দায়িত্ব হচ্ছে তার রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা। যদি তিনি অপারেশন করে বাসায় চলেও যান তবুও হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সেবিকাদের মাধ্যমে বা হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক কিংবা অন্যান্য কর্তব্যরত চিকিসকের মাধ্যমে রোগীর বিষয়ে খবর নেয়া এবং দিকনির্দেশনা দেয়া এককথায় মনিটরিং করা তার দায়িত্ব। কিন্তু একাজটি অনেক সময় করেন না সংশ্লিষ্ট রোগীর চিকিৎসক। যা অনেক সময় বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।

মনিটরিংয়ের জায়াগায় একজন চিকিৎসকের অবহেলার কারণ জানতে চাইলে আমার পরিচিত চিকিৎসক আমাকে বলেছেন, ‘অনেক সময় বিজ্ঞ ডাক্তাররা একজন রোগীকে অপারেশন করিয়ে অন্য আরেকজনকে অপারেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে সেবার চাইতেও অনেক সময় আর্থিক বিষয়টিই বড় হয়ে উঠে’।
সর্বশেষে ফিরে আসা যাক ইর্ন্টান চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রসঙ্গে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভাষ্য মতে, তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পরেই বগুড়ার চার ইর্ন্টান চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। নিশ্চয়ই এ শাস্তি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট আইন মেনেই দেয়া হয়েছে। এখন সেই শাস্তির প্রতিবাদে কর্মবিরতি কতটা যৌক্তিক? যৌক্তিকতার প্রশ্ন বাদ দিলেও স্বাস্থ্য বিভাগের আইনের প্রতি কি তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন না? এভাবে সবাই যদি আইনকে (এই আইন রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার বা প্রাতিষ্ঠানিকও হতে পারে) সবাই আইন না মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলি তাহলে এসব আইন কার জন্য?