ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

“অ বাসন্তী, তোর নেইক্যা হডে?”

আর্টিস্ট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আমাদের মনোহরখালীর মেয়ে নিভা রানী পাড়ি দেয় সুদূর আমেরিকা। যে ‘পালা’য় অভিনয় করবে সেখানে তার চরিত্রের নাম বাসন্তী। যদিও এর আগে বাসন্তীর প্রতীক্ষা নাটকেও বাসন্তী চরিত্রে অভিনয় করেছিল।

”অ বাসন্তী,  তোর  নেইক্যা হডে?” সংলাপ দিয়ে শুরু হওয়া সেই নাটক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন আয়োজক উন্নয়ন সংস্থার দাতাগোষ্ঠীর লোকজন। তারও আগে কৃষ্ণলীলা নাটকে তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তারা।

উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় তার আমেরিকা যাওয়া। আমেরিকা যাওয়ার আগে অসুস্থ স্বামীর দেখভাল করার যে প্রতিশ্রুতি সংস্থার লোকজন দিয়েছিলেন তাতে বিশ্বাস ছিল বাসন্তীর। কারণ, সংস্থার কর্তাবাবু মমতাজ সাহেবের আচরণ বিশ্বাসযোগ্য। যদিও এই মমতাজ সাহেবকেই মাঝেমধ্যে সন্দেহ করে তার স্ত্রী ফারাহ।

একদিন আমেরিকা থেকে ফিরে আসে নিভা রানী। কিন্তু  তার আর্টিস্ট হওয়া হয়নি, সে মাইল্যার বিলে বেশ্যাপাড়ার মৌসুমী হয়েছে। আর তার অসুস্থ স্বামী যাকে দেখাশুনা করার কথা ছিল উন্নয়ন সংস্থার লোকের, সে স্বামী এখন আমানত শাহ মাজারের সামনে বসে ভিক্ষা করে।

তাই তো বাসন্তীর আর্তনাদ, ”আমার স্বামীটাকে আপনারা ভিখারি বানিয়ে দিলেন, স্যার; আপনারাই বানিয়েছেন…।”

জীবন বাসন্তীকে দেখাল কত কিছু। বাসন্তীর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের নিষ্ঠুর বাঁকগুলোও আমাদের দেখালেন “বাসন্তী, তোমার পুরুষ কোথায়?” এর লেখক বিশ্বজিৎ চৌধুরী।

কাহিনীর নির্মাণ পর্বেই লেখক এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেনও। বাসন্তী যখন নিজের ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল তখনি। “একটা হাত ওপরে তুলে দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়ানো। এই ভঙ্গিতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভারী বুক আর কোমরের বিপজ্জনক বাঁক”।

কালো মেয়ের দেহের দৃশ্যমান এই বাঁক কি শুধুই শরীরের নির্মল সৌন্দর্য,  যা জাগ্রত করে কামবোধ। নাকি, জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতার একেকটি ধাপ।

ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও বিশ্বজিৎ চৌধুরীর লেখনী ক্ষমতার সাথে এক-আধটু পরিচয় আছে। প্রথম আলোতে নিয়মিত পড়ি ‘নগর দর্পণ’। তবে তার সৃষ্ট সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা ছিল না, আগ্রহও জন্মায় নি কোনদিন। ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত “নার্গিস” পড়েছিলাম। অতঃপর, বেরুল দীর্ঘশ্বাস। এতদিন কি মিস করেছি। তাই পরেরবার মিস করতে চাইনি  “বাসন্তী, তোমার পুরুষ কোথায়?” এরপর ২০১৬ সালে “হে চন্দনা পাখি” এবং ২০১৭ সালে  “দূর সম্পর্ক“।

10845815_10202487478187212_7296285101070564757_o

“বাসন্তী,  তোমার পুরুষ কোথায়” হাতে নিয়েই প্রথম ধাক্কা। চোখ আটকে গেল উৎসর্গে। এই সময়ের কবি ওমর কায়সার ভাইকেই উৎসর্গ করেছেন। এতে বিস্মিত হয় নি, কিন্তু যখন দেখলাম, এর পরের লাইন।

লিখেছেন, “এত রোদ তবুও কোথায় যেন মেঘ জমে আছে।” খুঁনসুটির অসাধারণ ভাষা।

আরথ-সামাজিক বাস্তবতার প্রক্ষাপটে লেখা উপন্যাসের কিছু সংলাপ এবং কিছু মুহূর্তের  উপস্থাপনা নাড়া দেয় মনকে। স্থির মনকে ভাবনার জগতে নিয়ে এসে করে তুলে অস্থির।

এই যেমন, “নিজামের সাথে বিয়ের বছর না- ঘুরতেই মনোহরখালী আর ইউসুফনগর দুপাড়াতেই চাউর হয়ে গেল নিভা রানী মা হবে না। মনোহরখালীর লোকে বলে, পাপ। কিসের পাপ? হিন্দু-মুসলমান বিয়ে?”

৫৭ ছুঁই ছুঁই লেখকের মনে যে সেই পঁচিশের রোমান্স এখনো বহমান তাও জানান দিতে ভুলেননি পাঠকদের।

মমতাজ- ফারাহর বিশেষ আবেগ  কিংবা অসুস্থ নিজামকে যখন নিভা টুলে বসিয়ে গামছা দিয়ে মাথা মুছে দিচ্ছিল তখনি পাঠক তা উপলব্ধি করতে পারেন। তবে কাহিনির গতি বৃদ্ধিতে এমন আবেগ অপরিহার্য।

এই উপন্যাসের আরেকটি অসাধারণ দিক, কাহিনীর  দাবি মেটাতে প্রচুর আঞ্চলিক সংলাপ। এ দাবি ছিল বলেই এসব সংলাপ উপন্যাসকে আরো বেশি মার্জিত করেছে। এখানেই স্বার্থক লেখক। কাহিনির গতি প্রকৃতি নির্মাণের স্বার্থে লেখক সচেতনভাবে আঞ্চলিক ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করে তুলেছেন। এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা।

“অ বাসন্তী, তোর নেইক্যা হডে?” এমন সব চমৎকার সংলাপ আছে এখানে।

মানব জীবনের দুঃখ-বেদনা, হাসি-অশ্রু  ও বিচিত্র সমস্যা সাহিত্যের উপকরণ। সাহিত্যের অনেকগুলো শাখার একটি উপন্যাস। “বাসন্তী, তোমার পুরুষ কোথায়?” এই শাখার সম্পদকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করেছে।