ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত ৬০ লক্ষ নগরবাসীকে বলছি। আপনার এলাকার সড়কবাতিটি নষ্ট হয়ে আছে, অথবা জ্বলছে না বহুদিন ধরে। সড়কবাতি সংস্কারের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের লোকজনও আসছে না সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে। শুধু সড়কবাতিজনিত সমস্যা নয়। আপনার এলাকার সড়কের বেহাল অবস্থা নিয়েও চিন্তিত আপনি। বাসার বা গলির মোড়ে দিনের পর দিন স্তুপ হয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ থেকেও মুক্তি মিলছে না। আপনারও জানা নেই, কোথায় অভিযোগ করলে এই সমস্যার সমাধান মিলবে।

এ ধরনের নাগরিক দুর্ভোগ থেকে এবার মুক্তি মিলবে খুব সহজে। দূর হবে আপনার ভাবনাও। তবে এজন্য আপনাকে আপনার মুঠোফোন থেকে ডায়াল করতে হবে ‘১৬১০৪’ নম্বরে। নম্বরটিতে কল করে জানাবেন আপনার এলাকার সমস্যা কিংবা অভিযোগ। ওপার প্রান্ত থেকে আপনাকে জানিয়ে দেয়া হবে কত সময়ের মধ্যে আপনার অভিযোগটির বা সমস্যাটির সমাধান দেয়া হবে। এরপর অপেক্ষা করুন।

ভাবছেন, স্বপ্ন দেখাচ্ছি। স্বপ্ন নয়, সত্যিই। গত ২৪ এপ্রিল (২০১৭) থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এ কল সেন্টারটি চালু করেছে। নম্বরটিতে কল করে আপনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট যে কোন অভিযোগ বা পরামর্শ জানাতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত যে কোন মুঠোফোন থেকে ডায়াল করেই নাগরিক সেবা সংক্রান্ত তথ্য, অভিযোগ বা পরামর্শ দিতে পারবেন নগরবাসী। যতদূর জেনেছি এ সেবা পর্যায়ক্রমে ২৪ ঘন্টা চালুর পরিকল্পনা আছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্তৃপক্ষের। প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে কল সেন্টারের বিষয়ে।

কল সেন্টার নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপন

অনুকরণীয় উদ্যোগ :

চট্টগ্রাম শহরের একজন নাগরিক হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কল সেন্টার চালুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। আশা করছি, শুধু কল সেন্টারের মাধ্যমে নগরবাসী যে সব অভিযোগ করবেন তার সমাধানে দ্রুত এবং কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ প্রত্যাশা আমার একার নয়। চট্টগ্রাম শহরবাসীরও।

আইনগতভাবে চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দারা নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন। সে অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা কিন্তু প্রশংসার যোগ্য। এই উদ্যোগ অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মেয়রদের জন্যও অনুকরণীয়। কারণ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রদত্ত সকল নাগরিক সেবা দ্রুততর করতে এবং এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ কল সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেন মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন। নগরবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সমাধানের ব্যবস্থা করবে সিটি করপোরেশন। অভিযোগের নিষ্পত্তি পূর্ব নির্ধারিত সময়ের না হলে বিষয়টি কল সেন্টার হতে মেয়রকে সরাসরি জানিয়ে দেয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে মূলত চসিকের কাজে জবাবদিহিতার সাথে সাথে প্রশাসনিক ভিত আরো বেশি শক্ত হবে বলে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যতদূর জেনেছি, গত ২৫ এপ্রিল ৭৬ জন নগারিক কল সেন্টারের হান্টিং নম্বরটিতে কল করে তাদের অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এসব অভিযোগের বেশিরভাগই ছিল নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে আবর্জনা ও পানি জমে থাকা, সড়ক সংস্কার, খাল-নালা দখল সংক্রান্ত। তবে সেসব অভিযোগের সমাধান করা হয়েছে কী না সে তথ্য আমার জানা নেই। যদিও এখানে আশার কথা হচ্ছে, মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন নিজেই সরাসরি অভিযোগের বিষয়ে তদারকি করেছিলেন। সেই তদারকির সুফল নগরবাসী পেয়েছেন কী না বা পাচ্ছেন কী না তার খবরও অন্য একদিন জানাব কথা দিচ্ছি।

যেসব বিষয় অভিযোগ বা তথ্য জানা যাবে:

কল সেন্টারের হান্টিং নম্বরটিতে কল করে নগরবাসী হোল্ডিং ট্যাক্স বা গৃহ কর আদায় করার সময় চসিকের কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারি যদি কোন ধরনের অনিয়ম করেন সেই অভিযোগটিও করতে পারবেন। পাশাপাশি চসিকের অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যবলী যেমন অসুস্থ রোগীদের জন্য পরিবহন বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা, জন্ম-মৃত্যু সনদ, বয়স সনদ, ইপিআই কার্যক্রম নিয়ে তথ্য, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহন কর, হোল্ডিং নাম্বার প্রদান, পরিবর্তন ও পৃথককরণ, দোকান বরাদ্দ, হাট-বাজার ইজারা, বার্ষিক অনুদান, রাস্তা কাটার অনুমতি, সড়কবাতি রক্ষণাবেক্ষণ, রোড রোলার ভাড়া, হোটেল রেস্তোরাঁয় পচা-বাসি খাবার রোধ কার্যক্রম, আবর্জনা অপসারণ, মশক নিধন, জাতীয়তা সনদ, চারিত্রিক সনদ, অবিবাহিত সনদ, বেকারত্ব সনদ, আয়ের সনদ ও পারিবারিক আদালত থেকে তালাক সংক্রান্ত নানা তথ্যও মিলবে এ কল সেন্টার থেকে।

কর্পোরেশন অ্যাক্ট ২০০৯:

এখানে বলে রাখি, কল সেন্টার চালুর জন্য প্রশংসা পেলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নগরবাসীর বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতে বাধ্য। নগরবাসীর নাগরিক সেবা নিশ্চিতেও তাঁরা বাধ্য। আইনই নগরবাসীকে সেই সুযোগ দিয়েছেন। তা ছাড়া নাগরিকরা পৌরকর পরিশোধ করে থাকেন। এ পৌরকরের বিপরীতেও নাগরিদের প্রাপ্য সুবিধাগুলো দিতে বাধ্য করপোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলরগণ।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, ‘‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আইন (সিটি কর্পোরেশন) ২০০৯ মতে, মেয়র কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় করপোরেশনের মাধ্যমে প্রায় ২৮টি কাজ করার ক্ষমতা রাখেন।’’ কার্যত, এই ২৮টি কাজের মধ্যেই নাগরিকের প্রাপ্য অধিকারগুলো আছে।

কর্পোরেশন অ্যাক্ট ২০০৯ বিশ্লেষণ করে দেখতে পাই, নগরীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আবর্জনা অপসারণ, সেনিটেশন, জন্ম, মৃত্যু, এবং বিবাহ রেজিস্ট্রি এবং ক্ষেত্রমতে পরিসংখ্যান বা তথ্য উপাত্ত সংরক্ষণ করা, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবার পরিকল্পনা উন্নয়নের ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, নগরবাসীর চিকিৎসার সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল ও ডিসপেনসারী প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ, সাধারণ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন নর্দমার ব্যবস্থা এবং জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখে নর্দমাগুলি নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ও পরিষ্কার, করপোরেশন প্রবিধান দ্বারা সরকারি জলাধারে ভাড়ায় চলাচলকারী নৌকা বা অন্যান্য যানবাহনের জন্য লাইসেন্সের ব্যবস্থা, লাইসেন্সের শর্ত নির্ধারণ এবং ফি নির্ধারণ, কসাইখানার ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণ, রাস্তা এবং অন্যান্য যোগাযোগের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে সাধারণ যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণ করা। সর্বসাধারণের সুবিধা ও চিত্ত-বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ উদ্যান নির্মাণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণ, সর্বসাধারণের সুবিধার্থে খোলা জায়গার ব্যবস্থা করবে এবং তা তৃণাচ্ছাদিত করার, ঘেরা দেওয়া এবং মানোন্নয়ন করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, জাতীয় ভাষার ব্যবহারে উৎসাহদান, জনসাধারণের মধ্যে শরীর চর্চা, ব্যায়াম ও খেলাধুলার উৎসাহদান এবং র‌্যালি ও টুর্নামন্টে পরিচালনা, নগরীর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থানসমূহ সংরক্ষণসহ ২৮ ধরনের কাজ করবেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র। অর্থাৎ এই ২৮ ধরনের সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন নগরবাসী।