ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 
“কাদের সাহেব যে বেতন পান তাতে তার সংসার চালানো কঠিন। মাসের শেষে টানাটানি লেগেই থাকে। তার উপর প্রতি বছর দাম বাড়ছে জিনিষপত্ররের। তবু তার এই ভেবে ভালো লাগে তার ছেলে মেয়ে মানুষ হচ্ছে। ছেলে মেয়ের সব চাহিদা পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। ধার করে হলেও ছেলে মেয়ের স্কুলের কোচিং, ল্যাপটপ, সেলফোন, আধুনিক পোশাক, বন্ধুদের পার্টি সব সখ মেটান তিনি। শুধু নিজের পুরানো শার্ট আরো পুরানো হতে থাকে, নতুন আর কেনা হয় না। এ মাসে নয় অন্য মাসে কিনবেন এই করতে করতে মাসের পর মাসও চলে যায়।
গত কয়েকদিন ধরে তার মন খুব খারাপ। ছেলে পরীক্ষায় খারাপ করেছে, তিনি খুঁজে পান না কারণ কি? যথাসাধ্য চেষ্টার পর আবিষ্কার করলেন ছেলে রাত জেগে পড়াশোনা করে না। যা করে তা হল ফেসবুকিং। আর বিভিন্ন পর্ণ দেখা। তিনি ছেলেকে বুঝালেন, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিলেন, কাজের কাজ কিছুই হল না, উল্টা ছেলের নেশা গেল বেড়ে। তিনি বুঝতে পারছেন না কি করবেন? তার সব শ্রম কি তাহলে বিফলে যাবে? যে ছেলে কি না বাবা বাসায় ফিরলে গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করত, যে ছেলে বাবার অসুখে অস্থির হয়ে যেত, সে ছেলের আজ বাবার সাথে কত দূরত্ব! এইসব ভাবতে ভাবতে কাদের সাহেব মুষড়ে পড়েন।
মেয়েরও একি অবস্থা! রাত জেগে দরজা বন্ধ করে বয়ফ্রেন্ডের সাথে ফেসবুকিং কিংবা স্মার্টফোনে সারাক্ষণ কথা। মা কিছু বললেই বলে তুমি এসব বুঝবে না। তুমি ফেসবুকের কি বুঝ? তুমি সিরিয়াল দেখ ওটাই তোমাকে ভাল মানায়। রান্নার কাজে মেয়েকে সাহায্য করার কথা বললে সোজা মুখের উপর না করে দেয় সময় নাই, ব্যস্ত। শুধু কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকলে ভালো হত মেয়ের, তাতো থাকেনি, মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে যখন বয় ফ্রেন্ডের সাথে মেয়ের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাবার খবর শুনে।”
——-
উপরের লেখাটা কাল্পনিক, আমাদের সমাজের একটা প্রতিচ্ছবি। প্রায় পরিবারে এরকম ঘটে থাকে। কিন্তু কারণ কি? এর জন্য দায়ী কি শুধু কিশোর-কিশোরী, ছেলেমেয়েরা? নাকি বাবা-মাও অনেকখানি দায়ী?
ফেসবুকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্কুলগামী কিশোর, কিশোরীরা। এই বয়সে তাদের কৌতুহল সব কিছুতেই থাকে। কারণ, তখন শারীরিক ও মানষিক একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা যায়। এটা হওয়া স্বাভাবিক। বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। আর প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য আবিষ্কৃত। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজ এগিয়ে যায়, দেশ এগিয়ে যায়, মানুষের চিন্তাধারা এগিয়ে যায়। আর সেটার যদি অপব্যবহার করা হয় তাহলে ফলাফল হয় বিপরীত।
কিশোর বয়স বা সদ্য যৌবন প্রাপ্ত সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে ভুল করার সম্ভবনা থাকে সবচেয়ে বেশি।
বিশেষ করে আমি ফেসবুকের কথাই বলব। এই বয়সের ছেলে মেয়েরা ফেসবুকে এসে কি করে? কোন বন্ধু কি স্ট্যাটাস দিল, কোন বান্ধবী কোন ড্রেস পরল। কোন ব্র্যান্ডের মেকআপ দিল- এসব দেখে। ফেসবুকের ইস্যু কি? কোন বান্ধবী কাকে ব্লক করল, কোন বন্ধু ডেটিং এ গেল, কত মজা নিল, ভিডিও করছে কি না, কার সেলফি কত সুন্দর হল, কে বেশি লাইক পেল, কার বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড এর ব্রেকআপ হয়েছে এই সবের খোঁজ নেওয়া ইত্যাদি। সবচেয়ে ভয়াবহ যে ব্যপারটা ঘটে তা হল, ফেইক আইডির সাথে চ্যাট করা এবং প্রেমে পড়ে যাওয়া। কিংবা আইডি আসল হলেও ভুল মানুষের প্রেমে পড়া। যথারীতি সেখানে থেকে বিতারিত হয়ে নেশায় ডুবে যাওয়া। সেটা ছেলে-মেয়ে দুজনের ক্ষেত্রেই হতে পারে। এই যে কোমল মনে তার দাগ কাটে সে দাগ আর সহজে মুছে না, সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে অন্যদের উপর। তখন তার কাছে মনে হয় সবাই একই মাপের। ভুল-শুদ্ধতে তখন আর তার কিছু যায় আসে না।
অর্থাৎ তারা তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো ব্যয় করছে এইসব কাজে। ফলে বাস্তবের যে বন্ধু বান্ধবী, পরিবারের মানুষ তাদের থেকে দূরত্ব বেড়ে যায়। বাবা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা কমতে কমতে খাদের কিনারায় এসে পৌঁছায়। আর বাবা-মা তখন অবাক হয়ে ভাবে কিভাবে এমন হল তার সন্তান! সব কিশোর, কিশোরী বা সদ্য যৌবন প্রাপ্ত ছেলে-মেয়েরা যে এই রকম তা কিন্তু নয়, অনেক মেধাবীরাও আছে তারা অনেক কিছু জানার, শিখার চেষ্টা করে। তবে এদের সংখ্যা কম।
আমি মনে করি এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বাবা-মায়ের। আর যাদের বাবা-মা নেই যে অভিভাবকের দায়িত্বে থাকে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে আসে শিক্ষক, বন্ধু, পাড়া প্রতিবেশী ও সমাজ। তাহলে কি এই বয়সের ছেলেমেয়ে ফেসবুক ব্যবহার করবে না? করবে, তবে অপব্যবহার যাতে না করে সে ব্যপারে বাবা মায়ের খুব সতর্ক থাকতে হবে। যে কাজগুলো বাবা-মা করতে পারে–
শাসন নয় বরং ছেলেমেয়ের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করা, সারাদিন কি করে খোঁজ নেওয়া, স্কুলের টিচার যে হোমওয়ার্ক দিল সেটা সে কতটুকু করল সেটা দেখা। অহেতুক আবদার না শোনা। যেমন আমার বন্ধুর এই আছে আমারও চাই এরকম। ছেলেমেয়ে বললে বাবা মাকে বুঝিয়ে দিতে হবে প্রত্যেকের জীবন আলাদা। তাদের সামর্থ আছে আমাদের নেই, তাই সম্ভব না। স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে যে সব ওয়েবসাইটগুলো ছেলেমেয়েদের জন্য যথোপোযুক্ত নয় সেগুলো ব্লক করে দেওয়া। (এক্ষেত্রে কিভাবে ব্লক করে বাবা মায়ের জানা না থাকলে, যে জানে সেরকম লোকের সাহায্য নিতে পারে)। রাতে একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া জেগে থাকার জন্য। মাস শেষে ফোন বিল দিতে গেলে ফোনের কল লিস্ট চেক করা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কি সিস্টেম আমি জানি না, তবে আমরা এখানে অনলাইনে বিল পে করি। সে ক্ষেত্রে কোথায় কখন কার সাথে কথা হল চাইলে দেখতে পাই। শুধু একাউন্ট আর পাসওয়ার্ড জানা থাকলে হল। বাংলাদেশে এই সিস্টেম থাকলে বাবা মায়ের জন্য খুব সুবিধা। ছেলেমেয়েরা কোন বন্ধুদের সাথে সবচেয়ে বেীশ মিশে, ঘনিষ্ঠ বন্ধু কারা সেটা অন লাইনে হোক বা অফলাইনে সেটা খেয়াল রাখা এবং সেইসব বন্ধুদের বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখা যে তাদের ছেলে মেয়েরা কি করছে।
ফেসবুকে ছেলেমেয়ে কি করছে সেটা তারা বলতে চায় না, তাদের একটা প্রাইভেসি থাকে। এ ক্ষেত্রে বাবা-মার ফেসবুক আইডি থাকা দরকার। তার সন্তান কতক্ষণ অনলাইনে থাকছে সেটা দেখার জন্য। ফ্রেন্ড লিস্টে না থাকলেও সেটা চেক করা যায়। সোজা কথা লাগামহীনভাবে ছেলেমেয়ে যেন অনলাইনে পড়ে না থাকে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। তারা ব্যবহার করুক তবে নেশা যাতে না হয়। অনেক সময় দেখা যায় স্কুল থেকে ফেরার পর ছেলেমেয়ে তার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে অনলাইনে ঢুকে যায় আর খেয়াল থাকেনা কোন কিছুর। সেটা যেন না হয়। এ সময় বিশেষ করে মা তাকে সঙ্গ দিতে হবে। তার গোসল, তার পছন্দের খাবার বা হোমওয়ার্ক কি বা টিভিতে তার পছন্দের অনুষ্ঠান দেখতে দেওয়া। অর্থাৎ তার সাথে সময় কাটানো।
সবশেষে বলব, কিশোর-কিশোরী বা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত ছেলে-মেয়ের গাইড করার সঠিক পথে রাখার সর্বোত্তম উপায় হল বাবা-মায়ের তাদের সময় দেওয়া, বন্ধু হওয়া। যেন তারা বুঝতে পারে বাবা, মা হচ্ছে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়। ভুল করলে তা শুধরানো নয় বরং ভুল যাতে না করে সেটাই দেখে রাখা উচিত।
—-
এম আর ফারজানা
নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭।