ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 
bob_dylan-wallpaper-2560x1600

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বুঝেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের হাহাকার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও উদ্বাস্তু মানুষদের সহায়তার জন্য একটি কনসার্ট আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর। সেদিন মেডিসন পার্কের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের সব মানবতাবাদী ও যুদ্ধবিরোধী সেলিব্রেটিদের এক মিলনমেলা। পড়ন্ত বিকালে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের মঞ্চে গটগট করে উঠে এসেছিলেন গিটার আর হারমোনিকা হাতে ৩০ বছরের মুখচোরা যুবক। খুব নার্ভাস বোধ করছিলেন। এত লোকের সামনে এর আগে কখনও যে গান করেননি। তাঁকে দেখে কনসার্টের প্রধান আয়োজক জর্জ হ্যারিসন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। হ্যারিসন ধরেই নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত হয়তো ওই যুবকের টিকিটি দেখা যাবে না। আগের দিন রিহার্সেলের সময় তাঁর অস্বস্তি দেখে তেমনই মনে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুবক এসেছিলেন। ৪০ হাজার দর্শকের সামনে একে একে বেশ কয়েকটি গান তিনি গেয়েছিলেন, যার মধ্যে তাঁর বিখ্যাত ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’। একটি ক্যাফেতে বসে ডিলানের ১০ মিনিটে লেখা এই গানই হয়ে ওঠে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মূল গান। তার তারুণ্যের গানগুলি হয়ে উঠেছিল আমেরিকান অস্থিরতার প্রতীক। সেখানে এসেছে রাজনীতি, সমাজ আর দর্শনের ছায়া। জীবনজয়ী গানের কপালে সে যেন এক রক্ততিলক।

হাতে গিটার আর গলায় ঝোলানো হারমোনিকা তাঁর ট্রেডমার্ক। যার গান এখনও মানুষের মুখে মুখে, তিনি বব ডিলান। আসলে রবার্ট আলেন জিমারম্যান। মার্কিন কবি ডিলান টমাসের ভক্ত। ডিলান নামটাও ওই কবির কাছ থেকে ধার করা। নাগরিক প্রতিবাদের ভাষা তাঁর গান। ষাটের দশকে একটি গোটা প্রজন্মকে প্রেরণা দিয়েছিল বব ডিলানের লেখনী। ভিয়েতনাম যুদ্ধ হোক বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অথবা রুবিন হারিকেন কার্টারের মতো বক্সারের জেলযাত্রার প্রতিবাদ— ডিলান বরাবরই কণ্ঠ খুলেছেন জোরে। সঙ্গে গলা মিলিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অসংখ্য স্বর। ৫৪ বছরের সঙ্গীতজীবনে অনায়াস বিচরণ পপ-রক-ফোক মিউজিকের ঘরানায়। সাহিত্যে নোবেল জয়ের খবরে ফের এক বার প্রাসঙ্গিক হলেন, এমনটা নয়। বব ডিলানের প্রাসঙ্গিকতা চিরন্তন।

গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের আমেরিকা। তখন চলছে অস্থির সময়। একদিকে ভিয়েতনামের যুদ্ধের ক্ষত, অন্যদিকে বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলন ক্রমশ গতি পাচ্ছে। প্রতিবাদে ফুঁসছে যুব সমাজের একাংশ। সেই অস্থির সময় ফুটে উঠেছিল তাঁর কলমে। ওয়াশিংটনের রাস্তায় জনসমুদ্রে মার্টিন লুথার কিংয়ের উদাত্ত ভাষণ, ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’। স্বপ্ন দেখাতে গিটার হাতে সেই মিছিলে তিনিও। পিট সিগার, জোয়ান বায়েজদের সঙ্গে মিছিলের সামনের সারিতে। ছয়ের দশকে কালজয়ী সেইসব গান মুগ্ধ করেছিল মার্কিনিদের। তাঁর কথায়, নিজেদের ক্ষোভ, যন্ত্রণার প্রকাশ খুঁজে পেয়েছিল আমেরিকার যুবসমাজ। তাই তো ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’ আর ‘টাইমস দে আর-আ-চেঞ্জিং’ গান ষাটের দশকে আমেরিকায় সিভিল রাইটস আন্দোলনে জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছিল। আমেরিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। হয়তো তাই ডিলানের আকৈশোর ভক্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা, যখন ওঁকে আমেরিকার সেরা সম্মান ফ্রিডম মেডেল পরিয়েছিলেন, মঞ্চে শিল্পীর মুখে হাসি ফোটেনি, একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। জীবনের প্রথম থেকে দারিদ্র্য, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে করে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা ও নৈঃশব্দ্য অর্জন করেছেন। ১৯৬৬ সাল থেকে নিয়মিত সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের জন্য নাম ওঠে ওঁর, অথচ তা নিয়ে সামান্যতম হেলদোল নেই। ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন দীর্ঘ ৪৯ বছর ধরে।

শুরুতে ফোক মিউজিকের ঘরানায় থাকলেও সেই ধারা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। এরপর শুধুই প্রথা ভেঙেছেন। ‘রোলিং স্টোন’ গানের গড়িয়ে পড়া পাথরখণ্ডের মতোই নিরন্তর এক বিদ্রোহী মেজাজে গড়িয়ে গিয়েছেন। কোনও শেওলা জমতে দেননি গায়ে। ২০০৪ সালে প্রকাশিত তাঁর তিন পর্বের আত্মজীবনীর প্রথম পর্ব ক্রনিকলস: ভলিউম ওয়ান। যার শেষ অধ্যায়ে তিনি বর্ণনা করেছেন, মার্কিন ব্লুজ গায়ক রবার্ট লেরয় জনসনের গান শুনে তিনি নিজে গান লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। মার্কিন কবি এন্ড্রু মোশন তাঁর সেই গানের কথাকে কবিতা হিসাবেই পড়তে বলেছেন।

আমেরিকায়ও যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের নারকীয়তা দেখে বলে ওঠেন ‘হাওয়ার গতি কোনদিকে, তা বুঝে উঠতে নিশ্চয়ই আবহাওয়াবিদদের দরকার পড়ে না, তাহলে মার্কিন প্রশাসন কেন নকল যুদ্ধ ঘিরে এত অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই ভন্ডগুলিকে ফাঁসিতে চড়াবে কারা?’ বব ডিলানের ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’ ও ‘দ্য টাইমস দে আর চেঞ্জিং’এর মত গান সেই আন্দোলনকে আরও জোরদার করেছিল। তাঁর ‘মাস্টার্স অব ওয়ার’, ‘এ হার্ট রেইন’স এ-গনা ফল’, ‘লাইক এ রোলিং স্টোন’ গানগুলি দ্রোহ ও স্বাধীনতার ভাব বহন করে। আজও। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ব্লাইন্ড উইলি ম্যাকটেল শীর্ষক অ্যালবামে তিনি গানের ভাঁজে ভাঁজে আমেরিকার নিন্দিত দাসপ্রথার গল্প বুনেছেন। গানের সুরে ও কথায় তাঁর শিল্পী সত্ত্বাকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন। নতুন দিশায় এগিয়েছে তাঁর সৃষ্টি। গ্রামের কথা, পথহারা পথিকের কথা, রাস্তার ধ্বনি, শহরের ইতিকথা, প্রত্যয় ও প্রতিবাদ, জয়-পরাজয় ও জীবনের অনন্ত বিস্ময়ের কথা তিনি ফকির-মুর্শিদ, নগর বাউলদের মতো করে গেয়ে গিয়েছেন।

১৯৫০ এর দশকের পর, যখন পপ সঙ্গীতে এলভিস প্রিসলি ও বাডি হলির প্রভাব, ডিলান তখন মুক্ত চিন্তা নিয়ে আসেন এই ভুবনে। জীবনভর সাহিত্য এবং সঙ্গীতের মিশ্রণ ঘটানোর পরীক্ষা চালিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম দিকে বব ডিলান তাঁর ৩৭তম স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। এখানেও তিনি সংগীত এবং সাহিত্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ডিলান তো নিজেই বলেছিলেন, আমার ওই সব গান রহস্য গল্পের মতো, বেড়ে ওঠার সময় শেকসপিয়ার যেমনটি দেখেছিলেন, এগুলি সেরকমই। সুইডিশ আকাদেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউসের কথায়, ‘পিছন ফিরে তাকালে আপনারা গ্রিক কবি হোমার ও সাপফোকে দেখতে পাবেন। তাঁরা কাব্যিক লেখা লিখেছেন। যেগুলি লেখা হয়েছে কেবল শোনার জন্য। পরিবেশন করার জন্য। মাঝে মাঝে যন্ত্রানুষঙ্গে। বব ডিলানের ক্ষেত্রে একই কথা খাটে। ৫৪ বছর ধরে চলছে তার এই অভিযাত্রা। তাঁকে পড়াও যায় এবং পড়াই উচিত।

তিনি এক মহান কবি। নিজের প্রজন্মের মুখপাত্র। প্রজন্মের কণ্ঠস্বর এক নাগরিক কবিয়াল। বব ডিলান। চে গুয়েভারার মতো বুকে নিয়ে ঘোরার মতো আইকনও বটে।

 

 

‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’

কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়?

কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানায়?

কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

কত বছর পাহাড় বাঁচে ভেঙে যাবার আগে?

কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শেকল পরে?

কবার তুমি অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে?

বলবে তুমি দেখছিলে না তেমন ভালো করে।

কত হাজারবারের পর আকাশ দেখা যাবে?

কতটা কান পাতলে তবে কান্না শোনা যাবে?

কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে?

বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।

 

ডিলানের ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’ গান অবলম্বনে কবীর সুমনের লেখা গান