ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

শিরোনামটুকু দেওয়ার পর আমি যখন লেখাটি শুরু করি তখন মাথার চারপাশে ঘুরছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা! এই ধারাটির ক্রমিক নম্বর লিখে যে কোন সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ দিলে নেতিবাচক তথ্য ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীন কণ্ঠরোধ করতে বর্তমানে এই ধারাটির একেবারে উপযুক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধারার বিশেষ সুবিধা হলো, জামিন অযোগ্যতা। আর তাই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে ধারাটি।

গতকাল ৩মে গেল বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস। বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল স্বাধীন রাষ্ট্রে এই দিবসের গুরুত্ব ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে পালিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দিন কয়েক আগে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের করা মামলা পুরো পটভূমিকে বিপরীতে রূপ দিয়েছে।

আগে একটু জেনে নেই আইনের ওই ধারায় কি বলা আছে! তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে,

‘কোনও ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ। (দুই) কোনও ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং অন্যূন সাত বছর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

প্রযুক্তি অত্যাধুনিক উন্নতির ছোঁয়ায় মূল ধারাসহ দেশের আনাচেকানাচের প্রায় সকল গণমাধ্যমের ওপর পড়েছে। এমন গণমাধ্যম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যার, ইন্টারনেট ভিত্তিক অনলাইন ভার্সন নেই। আর এতেই মূল বিপত্তি। আইনের ওই ধারাটি শুধুই অনলাইনের জন্যই প্রযোজ্য। কোন সংবাদ মাধ্যম যদি সংবাদ পরিবেশন করে তবে অনলাইনেই সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। তাই আইনটি প্রয়োগ করতেও ভালো সুবিধা!

দেশীয় ইলেক্ট্রনিকস বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল নতুন সময়ে। ওই সংবাদটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি মামলা করে সংশ্লিষ্ট সংবাদ মাধ্যমের ব্যক্তিদের নামে। ওই সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক আহমেদ রাজুকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে পর্যন্ত নেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হলো, কোন প্রকার অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কি সাংবাদিকরা কলম ধরতে পারবেন না? এর মাধ্যমে কি সাধারণ জনগণের অধিকার হরণ করা হচ্ছে না? কারণ পণ্য যদি নিম্নমানের হয় তা তো জনগণই ভোগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আহমেদ রাজুর আগে এমন রোষানলের শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক প্রবীর শিকদার, সাংবাদিক সিদ্দিকুর রহমানসহ অনেকে। তারা কিন্তু প্রত্যেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেই জেলে গিয়েছেন। এর প্রতিকার কী?

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল একজন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যদি এমনভাবে মামলা অভিযোগ দায়ের করা হলে প্রেস কাউন্সিলের কাজ কি! হ্যা, তবে এও স্বীকার করতে হবে, মুক্ত গণমাধ্যমের সুবিধা নিয়ে অন্যকে ঘায়েল করার লোকও নেহায়েত কম নয়। কিন্তু তাই বলেতো পুরো সত্য ধারণকারীকেতো ঘায়েল করা যায় না!

আইন কার জন্য? নিশ্চয় জনগণের অধিকার নিশ্চিতের জন্য! আর এই আইনের দ্বারা যদি উল্টো জনগণের অধিকারটুকুও হরণ হয় তবে এই আইনের প্রয়োজনীতা নেই বলে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমি মনে করেন। কারো বিরুদ্ধে কিছুই লেখা যাবে না অনলাইনে! কারণ ৫৭ ধারার ফাঁদ পাতা আছে!

একটা বড় প্রশ্ন রয়ে যায়, সাংবাদিক সমাজ কেন সোচ্চার হতে পারছে না? উত্তর হলো, পুঁজিবাদ। গণমাধ্যম আজ কর্পোরেটওয়ালাদের দখলে! আর এই আইনটির বেশ ভালোই ব্যবহার করছে ওই কর্পোরেটওয়ালারাই! তাই সোচ্চার হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা দিনদিন বন্দী হয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, নির্দিষ্ট কাচের আবরণ আমাদের আরও সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে। এই লেখালেখি-প্রতিবাদ করে কোন লাভ নেই। যতদিন, কর্পোরেটওয়ালাদের তেল দিয়ে চলতে হবে ততদিন ‘মুক্ত সাংবাদিকতা’ মুক্তি পাবে না।

এই সংকট কাটাতে সাংবাদিক নেতাদের সাহসী ভূমিকা পালন করে এগিয়ে আসতে হবে। আর আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা আছে সমাজের আয়না পরিচালনাকারী নেতাদের ওপর। একমাত্র নেতৃবৃন্দ পর্যায় থেকেই যদি এই আইন পূণর্বিন্যাস করার ব্যাপারে আওয়াজ তোলা হয় তবেই গণমাধ্যমের মুক্তি সম্ভব হবে। আর ৫৭ ধারার ভাইরাস জ্বর থেকে মুক্তি পাবে জাতির বিবেক।