ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত বুধবার (১০ মে ২০১৭ইং) একটি পোর্টালে পড়ছিলাম ধর্ষিতাদের জবানবন্দি। প্রবাসী একজন ব্লগার লিখেছিলেন লেখাটা। আগ্রহ নিয়েই পড়ছিলাম। পড়ে দেখলাম ওই লেখক তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে যা লিখেছিলেন তা পোর্টালে হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও ওই পোর্টালের ভক্ত। বিভিন্ন জনের মতামত পড়তে ভালো লাগে।

যাকগে, এবার আসল কথায় আসি। পুরো লেখাটা পড়ার পর কেমন যেন ভালো লাগলো না। একটু চিন্তা করে দেখালাম, খ্যাতিসম্পন্ন ব্লগারের পুরো লেখাটা যেন অনেকটা ’চটিগল্প’! বললাম এই কারণে যে, খুব নোংরাভাবে ধর্ষণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল ওই লেখায়। ধর্ষিতা দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে তখন কোন ভাষায় গালি দেওয়া হয়েছিল তাও লেখা হয়েছিল। সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ব্যাপার হলো, ওই লেখায় ‘উত্তেজক’ বাক্য পেয়েছিলাম। হয়ত আমার চোখে তা উত্তেজক হতে পারে, অন্যদের চোখে নাও হতে পারে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, ওই অশ্লীলতা যদি বর্জন করা হতো তবে কি বেশি ক্ষতি হতো! লেখাটি পড়ে মনে হলো, ওই লেখককে ধর্ষিতারা বর্ণনা দিয়েছিলেন। আর লেখক তা প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধও করলেন। কিন্তু ধর্ষিতারা যেন কোন প্রকার সংকোচ বোধ না করে তাই মামলার তদন্তের ভার নারী পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই লেখের কাছেও না হয় বর্ণনা দিয়েছে, তাই বলে তা জনসম্মুখে আনার কি দরকার ছিল? ধর্ষিতাদের তো আর সহানুভূতি দরকার ছিল না।

লেখাটা এমন ছিল যে, তাকে ওই মেয়েরা বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি অনেক কেঁদেছেন। তার অনেক খারাপ লেগেছে। এসবই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। মনে হলো, তিনি শো-আপের জন্যই লেখাটা পোস্ট করেছেন। লেখাটা প্রায় ভাইরাল হয়ে গেল ফেসবুকে। এবার বলেন, ওই মেয়েদের যারা চিনে-জানে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেমন লাগবে লেখাটা পড়ে! আমরা শুধুমাত্র বিচার চাই, সহানুভূতি চাই না নিশ্চয়।

লেখাটা যতবার পড়া হবে ততবারই তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এটা আমার মনে হয়েছিল, লেখাটা প্রথম পড়ার পরই। কিন্তু সাহস পাইনি অতি প্রগতিশীলদের আক্রমণের ভয়েই। এক আপুকেও দেখলাম ফেসবুকে এই বিষয়টি লিখেছেন। তাই না লিখে পারলাম না।

আরেকটি বিষয় খেয়াল করলাম। যারা লেখাটি শেয়ার দিয়েছে, তারা বেশিরভাগই ওই লেখকের পরিচিত। শুধুমাত্র লেখককে খুশি করার জন্যই এই লেখাটি শেয়ার দেওয়া হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।

আমি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে চরমভাবে লজ্জিত। শুনলাম, সাংবাদিকরা নাকি ভিড় করেছে ধর্ষিতা দুই নারীর বাড়ির সামনে। যদি নতুন কিছু পাওয়া যায়। এক্সক্লুসিভ তথ্য পাওয়া গেলেই তো ’লাল’! আচ্ছা এটাই কি গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতা! প্রতিযোগিতা কি এতটাই জরুরি! ওই দুই নারীর সম্মানের চেয়েও কি জরুরি! নাকি তাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদার চেয়েও জরুরি!

তাদের বারবার উপস্থাপন করা মানে বারবার ধর্ষণ করা। তাদের বারবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানেই একাধিক বার ধর্ষণ করা। তাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানেই নতুনভাবে ধর্ষণ করা। তাদের মুক্তি দিন। ধর্ষণের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিন। তাদের বাঁচতে দিন।