ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

শুরুর দিক থেকেই সবাই পুরুষ সমাজকেই দায়ি করছেন ধর্ষণের ঘটনায়। কিন্তু প্রথম থেকেই আমার বিরোধিতা রয়েছে এই মতামতে। আবার এক শ্রেণী পোষাককেও দায়ী করছেন। এরও বিরোধী আমি। আমি বিশ্বাস করি, ধর্ষণের মত অমানবিক ঘটনার জন্য সংস্কৃতি দায়ী! দায়ী আমাদের সমাজ! দায়ী পরিবার! আরও দায়ী শাসন ব্যবস্থা!

আমার এই চিন্তা-ধারার প্রমাণ মেলে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ প্রকাশের পরই। দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের বরাত দিয়ে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে যে, অভিযুক্ত বিত্তশালী পরিবারের সন্তানদের ভাষায় ধর্ষণ কোন অপরাধ নয়! এটি স্বাভাবিক ঘটনা। এটি যে অপরাধ তা নাকি তারা জানতো না। কারণ প্রায় সময়ই মেয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে। এখন এর দায় কার? তারা জানে কেন?

মানুষের মানসিকতা গঠনে সমাজ-সংস্কৃতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। এরপরের দায়িত্ব পরিবারের। একজন মানুষ তার পরিবার থেকেই প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষাটুকু পেয়ে থাকে। ফলে এর জন্য সমাজ-সংস্কৃতি ও পরিবার কোন অংশে কম দায়ী নয়।

তাদের ভাষ্য মতে, মেয়েদের নিয়ে আনন্দ-ফূর্তি করা স্বাভাবিক। জোর করে ‘যৌন সম্পর্ক’ স্থাপন করা খারাপের কিছু না। বিত্তশালী পরিবারের এসব সন্তানরা নিশ্চয় তাদের পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষাটুকু পায় নাই। তারা শিখেছে ‘আনন্দ-ফূর্তি’ তাদের সমাজ-সংস্কৃতির অংশ। তাই এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনাও তাদের কাছে স্বাভাবিক। তাদের সমাজও সমর্থন দেয়। তারা নিয়মিত মেয়েদের সঙ্গে ‘আনন্দ-ফূর্তি’ করত। তাদের পরিবার কি এ বিষয়ে অবগত ছিল না? আর একজন মানুষের মানসিকতা একদিনেই সৃষ্টি হয় না। স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনের অভ্যাসের ফলেই তারা ধর্ষণের দিকে ধাবিত হয়েছে। তাদের পরিবার কেন তাদের খেয়াল রাখে নাই? এ দায় পরিবারেরও!

তারা পরিবার থেকে কেমন শিক্ষা পেয়েছে তা বোঝা, আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার সাহেবের বক্তব্যে! তিনি ছেলের পক্ষে সাফাই গেয়ে ধর্ষণের ঘটনাকে ‘সমঝোতা’ বলে দাবি করেছিলেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, পারিবারিক নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। ছোট বেলা থেকেই ছেলেকে নৈতিক শিক্ষা না দিয়ে অপরাধের পরও সমর্থন দিয়েছেন বলেই এমন ঘটনা ঘটেছে।

আমাদের শাসন ব্যবস্থা ধর্ষণে উৎসাহিত করে! গাজীপুরে শিশুকন্যাকে ধর্ষণের পর বিচার না পেয়ে বাবা-মেয়ে ট্রেনে নিচে আত্মহনন করেছেন। তারা কেন নিজেদের জীবন দিয়ে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি ধিক্কার জানাতে হলো। আইন কেন ব্যবস্থা নেয়নি ওই ধর্ষকদের বিরুদ্ধে! আজ এই দুয়েকটি ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে বলেই তোলপাড়। ৬৪ জেলার হাজার হাজার গ্রামে এমন ঘটনা ঘটছে অসংখ্য বার। অনেকে বিচার না পেয়ে মুখবুঝে সহ্য করছেন। অসহায়ত্ব নিয়েই সমাজে বসবাস করছেন। কারণ ধর্ষকের সমর্থনে রয়েছে বিত্তশালীরা, রয়েছে জনগণের সেবকও!

দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্রথমে থানায় গিয়ে সহজেই আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেননি। তাদের ঘুরতে হয়েছে কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে। ঝামেলা পোহাতে হয়েছে পরিবারকেও। এরপরই তারা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পান। এমনতো হওয়ার কথা ছিলো না! থানা-পুলিশ কেন? জনগণের সেবার জনই। এই হলো সেবার নমুনা! অর্থশালীদের পকেটে আইন! বিত্তশালীদের টাকার জোরে বিচার কার্য নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। পাবে কি সঠিক বিচার? রানা প্লাজার রানাও কারাগারে বেশ ভালো হালেই আছেন টাকার জোরে।

পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিকতা, সংস্কৃতির নিজস্বতা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ধর্ষণসহ সকল অপরাধ রোধ করা সম্ভব। এর একটিও যদি প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, পরিবারের সদস্যদের প্রতি। নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। পরিবার থেকে শক্ত নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেদের আরও সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।