ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সাংবাদিকতার চর্চা করতে গিয়ে আমাকে নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে দুই ধরনের ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিন আগে এক বন্ধু বলছিলেন, ‘তোরা সাংবাদিক, তোদের টেনশন নেই। শুধু টাকা, আর টাকা। চারদিক থেকে শুধু টাকা আসবে। থ্রেট করে টাকা নিবি।’

মাস কয়েক আগে আরেক বন্ধু বলছিলেন, ‘সাংবাদিকতায় তো অনেক টাকা। সাংবাদিকদের দেখি লাক্সারি লাইফ লিড করতে। তোর তো চিন্তা নেই।’

মূলত সাংবাদিকতার চর্চা আমার নেশায় পরিণত হয়েছে। তবে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত। আচ্ছা, ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনো শেষ করে কেউ যদি ব্যাংকে চাকরি নেন তবে তার বেতন কত হতে পারে জানেন? ৩০ হাজারের বেশি। কোন প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নিলেও একই। তাদের আবার ধাপে ধাপে বাড়ে। তাদের কর্মসংস্থানেরও অবস্থা বেশ ভালো। কিন্তু সাংবাদিকতার অবস্থা অনেক খারাপ। বাহির থেকে অনেকে আমার বন্ধুদের ন্যায় দুই প্রকার ধারণা পোষণ করলেও অবস্থা করুণ।

চট্টগ্রাম দিয়েই শুরু করি। বন্দরনগরীর আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোর কদর যেমন ভালো, এসব পত্রিকার সাংবাদিকদের অবস্থাও তেমন নাজুক। ১০-১২ হাজার টাকা বেতন দিয়ে শুরু করতে হয় সাংবাদিকতার জীবন, যা বেশ হতাশাজনক। দেশের শীর্ষস্থানীয় এক জাতীয় দৈনিকের নিজস্ব প্রতিবেদকের বেতন মাত্র ১৬ হাজার টাকা। তাও নাকি দুই মাসে একবার বেতন পান। এসব জানাচ্ছিলেন এক সিনিয়র ভাই।

চট্টগ্রামের সাংবাদিকতায় যাঁদের অবস্থা ভালো তাদের ৩৫ হাজার পার হয়। এই হলো অবস্থা। এবার চিন্তা করুন, সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ বারান্দায় হেটে তাঁরা চাকরিজীবন শুরু করেন মাত্র ১০-১২ হাজার টাকায়। হতাশা পরিমাপের যন্ত্র থাকলে বোঝানো সম্ভব হতো। আচ্ছা ওই ৩৫ হাজার টাকায় কি পরিবার চালানো সম্ভব? আবার পেশাগত অনিশ্চয়তাতো আছেই, কিছু হলেই ছাটাই। দেশের অনেক আলোচিত সাংবাদিকের বেকারত্বের ব্যাথা বুকে নিয়ে মরতে হয়েছে- এর ইতিহাসও আছে।

সাংবাদিকতায় আসার পর শুধু নিরুৎসাহিত করে চলেছেন অগ্রজরা। সবার এক কথা, অন্যদিকে দেখো। গত বছরের রমজানের ঈদের পরদিন সাবেক এক মন্ত্রীর বাসায় সংবাদ সম্মেলন কাভার করতে গিয়েছিলাম। আমার বস বাড়িতে থাকায় আমিই গেলাম। ওখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অগ্রজের সঙ্গে দেখা যিনি শীর্ষস্থানীয় এক দৈনিকে কাজ করেন। তিনি আমার হাত দুটো ধরে বললেন, ‘জোবায়ের পড়াশুনো করো। টুকটাক করলেই হবে। পরে সময় হবে না।’

এই বছর রমজানে একদিন অফিসে ইফাতার করে বের হতেই বৃষ্টি শুরু। দাঁড়িয়ে থাকতে এক অগ্রজের সঙ্গে দেখা। তিনিও শীর্ষস্থানীয় এক দৈনিকের প্রতিবেদক। বললেন, ‘এসব ছেড়ে পড়াশুনো কর। আমি অন্যদিকে চাকরি খুঁজছি। পেলেই চলে যাব। ১৬ টাকা দিয়ে আমারই হয় না। এখন অনেক ভালো লাগবে কিন্তু পরে পস্তাবি।’ ঢাকার অনেকেও এই একই কথা বলছেন। ‘অসৎ হলে কর, লুটেপুটে খেতে পারবি। না হয়, ছাড়।’ এই হলো অবস্থা।

সাংবাদিকতা হল সৃজনশীল পেশা। সৃষ্টিশীল মেধাবীরাই এই পেশার দাবিদার। কিন্তু বর্তমানে সাংবাদিকতায় আসছে সব ধান্দাবাজরা। জ্ঞানের স্বল্পতা আমার রয়েছে। ছোট মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে হাজার হাজার গণমাধ্যমের দরকার নেই। মূলধারা অল্পকিছু গণমাধ্যম থাকবে, যারা চাকরিজীবীদের চাহিদাপূরণে সক্ষম। ‘বেশি মিডিয়াই’ বেহাল দশার মূল কারণ। আর সৃজনশীল মানুষ বেশি হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের বেতন না দিলেও চলে। পরিচয়পত্র দিয়েই সব ম্যানেজ করে নেন তারা। তারাই সাংবাদিক।

তরুণ সাংবাদিক শরীফুল হাসান আমার হতাশায় নতুন মাত্রা যোগ করলেন। সাংবাদিকতায় সততা নিয়ে চলা কঠিন বললেই প্রতিউত্তরে হাসান ভাইকে উদাহরণ হিসেবে টানতাম। আজ তিনি সাংবাদিকতাকে দূরে ঠেলে দিলেন আর্থিক চাহিদার কাছে মাথা নত করে। এও ভালো, তিনি তো নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হননি।

দেশের সাংবাদিকতার জন্য খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে সামনে। এর কিছু নিদর্শন দেখা যাচ্ছে। শরীফুল হাসানরা সাংবাদিকতাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। ইয়াবাসহ স্বনামধন্য বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিকরা পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। সাংসদের বাসায় ঈদের ‘বকশিশ’ নিতে গিয়ে দু’দল সাংবাদিকের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

শরীফুল হাসানের স্ট্যাটাসের একটা লাইন আমায় খুব কাতর করেছে। তাঁর অসহায়ত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় প্রকাশ পেয়েছিলো ওই লাইনে। তিনি লিখেছিলেন, ‘পকেটে ৬০ টাকা না থাকলেও ৬০ লক্ষ টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছি।’ তিনি অনেক সংগ্রামের পর এ বিকল্পপন্থা বেছে নিয়েছেন। এরকম একজন সৃজনশীল ব্যক্তিকে মিস করবে মূল ধারার সাংবাদিকতা।

দেশের সাংবাদিকতা যেটুকু আছে তা বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ভুঁইফোড় সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হোক। যারা সাংবাদিকদের চাহিদাপূরণে অক্ষম তারা প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে নিয়ে যাক। যোগ্য-সৃজনশীলরাই সাংবাদিকতায় আসুক।