ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

ভ্রমণটা ছিল সেই ১৪০০ বাংলা। এপ্রিল ১৯৯৩ ইংরেজি সালে৷ আমার বড় দিদির বাড়ি ভারত জলপাইগুড়ি জেলার বীরপাড়া, রবীন্দ্র নগর কলোনীতে৷ আমার বড়দিদির যখন বিয়ে হয় তখন আমার বয়স মাত্র দেড় বছর৷ কথটা আমার মায়ের মুখ থেকে শোনা৷ আমি যখন গিয়েছি তখন আমার বয়স ৩১৷ যাক দিদির বাড়ির কথা না হয় পরে বলবো। প্রথমে যাওয়ার কথটা শুরু করা যাক৷

আমি বিয়ে করেছি ১৯৮৬ ইং সালে। বিয়ে করার এক-দেড় বছরের মাথায় শুরু হল ৮৮ সালের বন্যা৷ তখন আমি চাকরি করি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এলাকায়। আমার এক বন্ধু আমার হেলপার। নাম তার শ্রী কানাই লাল সাহা৷ বন্যা শুরু থেকে মিল বন্ধু হয়ে গেল৷ নতুন বিয়ে করেছি। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়ছে না৷ আমার হেলপার কানাই ছিল খুবই বুদ্ধিমান৷ ও থাকে নারায়ণগঞ্জের নগর খাঁনপুর এলাকায়। বন্যায় মিল বন্ধ তবু দুজন সরাদিন এক সাথেই মিলে থাকতাম কিছু বেতনের আশায়৷ মিল বন্ধ হওয়ার কারণে আমার স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ি পঠিয়ে দিয়েছি বন্যার দুঃসময়টা কাটানোর জন্য৷ দুজন সারাদিন মিলে কাটাই আর রাতে দুজন পাঠানটুলী ভকেশনাল কলেজের দোতলায় ঘুমাই৷ তখন আমার মা আমার সাথেই থাকে, ভাড়া বাসা পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে এই ভকেশনাল কলেজে আসা৷ আমার মা বললেন, ’ভালো হয়েছে, থাকাও যাবে আবার রিলিফও পাওয়া যাবে৷’

বন্যা সেরে যাওয়ার পর কানাই ভারত পাড়ি দিল। ওর এক মামা থাকেন কলিকাতা বাঘাযতিন। সেখানে ও থাকবে৷ আমি তখন সঙ্গীহীন হয়ে গেলাম। বেতন নিয়ে মালিক পক্ষের সাথে রাগারাগি করে চাকরি ছড়ে দিই৷ আবার চাকরি নিলাম ঢাকার কেরানীগঞ্জের শুভেচ্ছা ইউনিয়ানের কেরোসিন ঘাট এলাকার রশিদ স্লিক টেক্সটাইল মিলে৷ ভালভাবে যাচ্ছিল দিনগুলো; বেতন ভাল। ৫০০০ টাকা৷ বসা ভাড়া মাত্র ৩০০ টাকা৷ সেই মুহূর্তে কানাইর লেখা একটা চিঠি পেলাম সেই নারায়ণগঞ্জের ঠিকানায়। নারায়ণগঞ্জ থেকে লোক মারফৎ চিঠিটি আমার হাতে এসে পৌঁছায়৷ চিঠিতে লেখা আছে, তোকে আর বাংলাদেশে থাকতে হবে না, আমি তোকে আমার এখনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি৷ চিঠি পেয়ে তো আমি খুশিতে আত্মহারা। দৌড়ে যেয়ে আমার স্ত্রীকে দেখালাম৷ তখন আমার মা পৃথিবীতে নেই। তারও ৬-৭ মাস আগে মা মৃত্যুবরণ করেন৷ তখন আমার স্ত্রী কানাইর চিঠি দেখে আমাকে ওর কথা শুনতে বারন করলো৷ যে লোকের মাধ্যমে আমাকে ভারত নেওয়ার কথা, তার ঠিকানা চিঠিতে দেয়া ছিল৷ আমি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার গোপনে দেখা করে সব বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে আসি৷ ঐ লোকের কথা শোনে আমি শতভাগ নিশ্চিত হলাম সেখানে আমি টেক্সটাইল মিলের চাকরি পেলে পরিবারবর্গ নিয়ে ভালভাবে চলতে পারব৷

 

বীরপাড়া

বাসায় এসে আমার স্ত্রীকে বুঝিয়ে বললাম, ভারতে টেক্সটাইল মিলে কাজের খুবই চাহিদা আছে, সেখানে আমাদের আর কোন সমস্যা হবে না, তবে তোমার অল্প কিছু দিন তোমার বাপের বাড়িতে থকতে হবে৷ আমি সেখানে কাজে যোগদান করে এক মাসের বেতন হাতে পেয়ে এসে তোমাকে সাথে নিয়ে আবার ভারত পৌঁছাব৷ আমার স্ত্রী রাজি হল। আমি চাকরি ছাড়ার প্রস্তুতি নিলাম, মালিক পক্ষের সাথে আলাপ আলোচনা করে চাকরি ছাড়ার দরখাস্ত দিলাম৷ চাকরি ছাড়ার শর্ত হল মালিক পক্ষকে এক মাস সময় দিতে হবে, যাতে এই এক মাসের মধ্যে মালিক পক্ষ আমার পরিবর্তে আরেকজন লোক সুন্দর ভাবে নিয়োগ দিতে পারে৷

এর কিছুদিন পরই কানাই লাল বাংলাদেশ এসে হাজির হল। নারায়ণগঞ্জ থেকে আমার ঠিকানা সংগ্রহ করে সোজা কেরানিগঞ্জের কালিগঞ্জ কেরোসিন ঘাট রশিদ স্লিক টেক্সটাইল মিলে এসে আমাকে খোঁজে বের করল৷ আমিতো ওকে দেখা মাত্র খুশিতে আত্মহরা, ও আমাকে দেখে খুশি৷ কিছুক্ষণ দুইজনের মধ্যে হল হাসাহাসি, তারপরে করমর্দন৷ নিয়ে গেলাম চয়ের দোকানে, দুইজনে চা পান করলাম, কথা বললাম, তারপর ওকে আমার ভাড়া করা বাসায় নিয়ে গেলাম৷ খাওয়া-দাওয়া করলাম দুজনে একসাথে। ও আবার আমার খুব কাছের মানুষ ছিল; আমার বিয়ের সমস্ত কাজ ওর হাতেই সম্পাদন করা৷ কানাই আমার স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলল সব কিছু, আমার স্ত্রী সরল মনে রাজি হয়ে গেল৷ স্ত্রী বলল, কানাই দা, আমার স্বামী যখন যাওয়ার ইচ্ছা করছে তখন আমার কোন আপত্তি নেই৷ তবে আমি কতদিন পর সেখানে যাচ্ছি? কানাই বলল, বৌদি, তুমি কষ্ট করে তিন চার মাস তোমার বাপের বাড়ি গিয়ে থাক, এর মধ্যেই আমরা দু’জন এক সাথে এসে তোমাকে নিয়ে যাব, তুমি বৌদি চিন্তা করবে না৷

ওর কথা শুনে বাড়িওয়ালাকে বাসা ছেড়ে দেব বলে জানিয়ে দিলাম। তারপর মিলে এসে ম্যানেজারকে বললাম চাকরি ছেড়ে দেব, আপনি লোক সংগ্রহ করুন ৷ ম্যানেজার অনেক কাকুতি-মিনতি করল চাকরি না ছাড়ার জন্য৷ ম্যানেজার সাহেবের কোন কথাই শুনলাম না। যেই কথা সেই কাজ৷

পরদিন কানাই সহ কালিগঞ্জ হইতে আসলাম নারায়ণগঞ্জে, যেই লোকের বাড়িতে থাকবো খাবো তাহার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল৷ সেই লোকের নাম রতন চক্রবর্তী, থাকে নারায়ণগঞ্জ নগর খাঁনপুর৷ তাহারা স্বামী-স্ত্রী মিলে ভারত চব্বিশ পরগোনার ফুলিয়া নামক জায়গায় বছর খানেক অাগে একটি তৈরি বাড়ি কিনেছিল৷ সেই বাড়িটি পার্শ্বের অন্য একজনকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেয়, ঐ লোক সেই বাড়ির আয়-ব্যয় এর হিসাব নয়ছয় করে বিধায়’ই আমাকে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে৷ কথা হল আমি তাহার বাড়ি ও মাঠের জমি কাজের লোক দিয়ে কাজ করাবো আর তাদের একটা বাৎসরিক হিসাব দেব৷

এর মাঝে আমি যে টেক্সটাইল মিলের কাজ জানি সেই কাজ খোঁজে নিয়ে কাজ করবো৷ কাজ খোঁজার দায়িত্ব পড়ল কানাইর উপর, কানাই রাজি হয়ে বলল, এটাতো আমার জন্য একটা সামান্য ব্যাপার। নিতাই যে কাজ জানে ওর কাজের আবার অভাব কি? আমি ওর কথা শুনে আস্বস্ত হলাম৷ কানাই বলল, তুই নিতাই কোন চিন্তা করবিনা, আমি সব ব্যবস্থা করে দিব, তুই তো আমার অনেক উপকার করেছিস, আমার বোনের বিবাহে তোর নিতাই বহু অবদান আছে, সেসব আমি কানাই ভুলে যাইনি৷ আমি বললাম, না কানাই, আমি অধম, আমি তোদের জন্য কিছুই করতে পারিনি, সকলই বিধাতার ইচ্ছা৷

যাক সে কথা। কথা পাকাপাকি করে আবার আমি চলে এলাম কেরানিগঞ্জের কালিগঞ্জ রশিদ স্লিক এ। মিলে দেখা করে গেলাম ভাড়াবাসায়৷ স্ত্রীকে সব বললাম, মাস শেষের দুই দিন আগে বাসা ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে৷ স্ত্রীর সাথেও কথা পাকাপাকি করে ফেললাম। গেলাম মিলে। আমার পরিবর্তে যেই লোককে নিয়োগ দেওয়ার কথা সেই লোক কবে আসবে জানতে চাইলম ম্যানেজারের নিকট৷ ম্যানেজার সাহেব বললেন, নিতাই বাবু, আমাদের লোক ঠিক হয়ে গেছে, আপনি যাবেন কবে? আমি বললাম, স্যার, চৈত্র মাসের ২৫-২৬ তারিখ, এপ্রিলের ৮-৯ তারিখে যাব৷ ম্যানেজার সাহেব বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে যাবেন, আমাদের কোন সমস্যা নেই৷

আমার বড় শ্যালককে খবর দিয়ে আনলাম। ঘরের যা কিছু আছে সেগুলো নেওয়ার জন্য৷ যথা সময়ে স্ত্রীকে বাপের বাড়ি পাঠালাম, আমিও চাকরি ছেড়ে দিলাম, স্ত্রী গেলো বাপের বাড়ি আর আমি গেলাম নারায়ণগঞ্জ৷ এটাই ছিল স্ত্রীর সাথে আমার শেষ দেখা৷ তখন আমার বড় মেয়ের বয়স আনুমানিক চার বছর আর ছেলের বয়স আনুমানিক দুই বছর৷

আমি নারায়ণগঞ্জ এসে শুনলাম কানাই ও তার দুইবোন আমাদের সঙ্গে যাবে। আমি তখন খুবই বিস্মিত হলাম। ভাবলাম ও তো আমার সাথে একটা চালাকি করছে মনে হয়৷ যাক তবু কোন প্রকার মনোবল হারায়নি৷ নিজেকে সংযত রাখলাম, তারপর দিন ২৬শে চৈত্র,  ৯ই এপ্রিল ১৯৯৩ ইং রোজ শুক্রবার, কানাই লালের দুইবোন আর আমি সাথে কাপড়চোপড়, কাঁসার থালাবাসনের বিরাট এক বস্তা৷ তা দেখে আমার মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে, ভাবছি কিনা বিপদ টেনে আনলাম মাথায়! মনে মনে ভয় পাচ্ছি, কিভাবে যাব ওদের নিয়ে৷ না জানি কি হয়, ভিন দেশে যাচ্ছি,পাসপোর্ট নেই, আবার নেই তেমন টাকাকড়ি, নানাবিধ চিন্তায় আমি অস্থির প্রায়৷ যাই হোক ২৬শে চৈত্র শুক্রবার সন্ধ্যায় নগর খাঁনপুর হইতে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা দিলাম৷

নাইট কোচে উঠবো ঢাকা গাবতলি হইতে, নারায়ণগঞ্জ হইতে ঢাকা পৌঁছতে সন্ধ্যা সাতঘটিকা বেজে গেল৷ গাড়ির টিকেট আগের দিন’ই সংগ্রহ করা ছিল, গাড়িতে উঠে সিট নম্বর দেখে সিটে বসলাম, গাড়ি ছাড়ল, গেলাম বেনাপোল, গাড়ির সুপারভাইজারই হল লোক পারাপারের দালাল৷ সেই দালাল আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে কাউন্টারে নিয়ে বসতে দিল, আর বলল কিছু খাবো কি না৷ তারপর কিছু খাবার কিনে খেলাম আমরা চারজন৷ দালাল ততক্ষণে আরেক দালালের খোঁজে বের হল, দালাল সংগ্রহ করে আমাদেরকে তার কাছে হস্তান্তর করল৷ সেই দালাল আমাদের নিয়ে গেল ভারতীয় সীমান্তবর্তী এক গ্রামের বাড়িতে৷ অনেক বড় বাড়ি, তবে লোকের সংখ্যা খুব কম, আমাদের তাড়াতাড়ি করে ঘরে যেতে বলল, আবার বলল বিপদ সংকেত আছে, বাহির হবেন না৷ আমরা তাদের কথামত যা বলে তাহা শুনতে লাগলাম, দুপরবেলা খাবার দিল, কথা হল রাতে আমাদের সীমান্ত পাড় করে দেবে, কথার কোন হেরফের হবেনা৷ সন্ধ্যার পর রাত হতে লাগল, দালাল বাড়িতে নেই, বড় একটা ঘরে আমরা চারজন ছাড়া আর কেহ নাই সেখানে৷ আমার ভীষণ ভয় হতে লাগল৷ ভাবছি, নাজানি কি হয়, সাথে দুইজন উপযুক্ত বোন। ভয় পাওয়া তো স্বাভাবিক৷ রাত আনুমানিক ১২টা বাজতে লাগল, কারো কোন খবর নেই, কানাই লালকে বলছি কিরে কি হচ্ছে এটা? কানাই বলল আরো চুপচাপ থাক, কোন ভয় নেই, এই বর্ডার সমন্ধে আমার অভিজ্ঞতা আছে, কিছুই হবে না৷ আমি তখন মনে মনে ভাবছি, বিনা পাসপোর্টে এসে ভুল করলাম না তো?

সারারাত জেগে থাকতে থাকতে শরীর ক্লান্ত আমাদের সবার৷ তবে কোন প্রকার অঘটন ঘটেনি৷ এমন করতে করতে দুদিন পার হল৷ দালালকে জিজ্ঞাসা করলে বলে বর্ডার ক্লিয়ার নাই, ধৈর্য ধরুন, পার হয়ে যাবেন৷ যেদিন বর্ডার পার হলাম, সেদিন ৩০শে চৈত্র ১৩৯৯ বাংলা ১৩ই এপ্রিল ১৯৯৩ ইংরেজি রোজ বৃহস্পতিবার৷ রাত আনুমানিক আটটা। দুজন দালাল আমাদের নিয়ে রওয়ানা দিল বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে, আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে৷ বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর সামনে একটা খাল, একটা নৌকাও আছে সেখানে৷ দালালরা আমাদের নৌকায় ওঠার জন্য বলল। অামরা নৌকায় উঠে বসলাম। নৌকা ওপারে গিয়ে ভিড়ল। নৌকা থেকে নামার সাথে সাথেই দেখি দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, আমাদের উদ্দেশ্য করে বলল আপনারা? আমারা হ্যাঁ বললাম৷ বলল চলুন আমাদের সাথে। হাঁটতে লাগলাম একসাথে৷ কিছুক্ষণ হাঁটার পর গাড়ির শব্দ শুনতে পেলাম, একটু সামনে যেতেই দেখি পিচঢালা পথ৷ সেখান থেকে গাড়ি ছেড়ে গেলাম বনগাঁও রেলস্টেশন, বনগাও রেলস্টেশনে শিয়ালদহগামী একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে, কিছুক্ষণ পর হয়তো ছাড়বে৷ কানাই লাল তাড়াতাড়ি করে চারখানা টিকেট কিনে আনল, বলল তাড়াতাড়ি উঠো গাড়িতে৷ জিজ্ঞাসা করলাম আমারা এখন কোথায় যাচ্ছি? কানাই লাল বলল দমদম। দমদম রাতযাপন করে সকালে রওনা দিবো শিয়লদহর উদ্দেশ্যে।

 

ভুটান ভুটান বৈদ্য মন্দির

ভুটান গুমটু, আমার বড়দিদির বাড়ি হইতে মাত্র ভারতীয় ৩ টাকা ভাড়া ছিল তখন৷ খুবই সুন্দর জায়গা এটি৷

 

তাই হল, শিয়লদহ নামলাম, সেদিন পহেলা বৈশাখ ১৪০০ বাংলা ১৪ই এপ্রিল ১৯৯৩ইং সেখান থেকে অটোরিক্সা করে পৌঁছালাম যাদবপুর কানাই লাল যেখানে ভাড়া থাকে৷ সেখানে দুমাস পর্যন্ত ছিলাম, এই দুমাসের মধ্যে বহু জায়গা ঘুরে দেখেছি৷ আমাকে যে লোক তার বাড়ি থাকতে দেওয়ার কথা,তার বাড়ি চব্বিশ পরগোনার ফুলিয়া৷ সেখানে গিয়ে দেখা গেল তাহার বাড়ি আছে ঠিক ঘর নেই৷ থাকবো কোথায়? সেখানে আবার অনেক টেক্সটাইল মিল আছে তবে কাজের মজুরী কম,কানাই লালকে বললাম কানাই তুই আমাকে আমার বড় দিদির বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে দে, এই কথা শোনে কানাই লাল খুব খুশি৷ পরদিন বড়দিদির বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম, সাথে করে নিয়ে যাওয়া ৮০০/=টাকা আমার কাছে আছে, কানাই লাল জিজ্ঞাসা করল টাকার পরিমাণ কত? আমি বললাম ৮০০/=টাকা আছে আমার, কানাই লাল বলল হয়ে যাবে আর লাগবেনা৷ রওয়ানা দিলাম বড়দিদির বাড়ির উদ্দেশে, ধর্মতলা হইতে উত্তরবঙ্গের গাড়ি ভাড়া তখন ২৫০/=টাকা৷ গাড়িতে উঠলাম বেলা দুইটায়,বড়দিদি বাড়ি পৌঁছতে সময় লেগেছে ২৮ঘন্টা৷

বড়দিদির বাড়ি পৌঁছলাম বিকাল পাঁচটায়৷ জায়গাটা হল জলপাইগুঁড়ি বীরপাড়া রবিন্দ্র নগর কলোনী৷ ভুটান সংলগ্ন এলাকা,বড়দিদির কাছে পরিচয় দেওয়ার পর আমাকে সাদরে গ্রহণ করল সবাই৷ নিজের টাকা-পয়সা যতদিন ছিল শুধু ঘুরতাম, দেখতাম৷ ঘুরেছিলাম সিকিম, ভুটানঘুমটু, ভুটান ফুলসিলিং, শিলিগুরি, জলপাইগুরি, অালীপুর দুয়ার সহ আরো অনেক জায়গা৷

 

সেবক রোড শিলিগুরি সিকিম বর্ডার

সেবক রোড সিকিম বর্ডার,বীরপাড়া যেতে হবে এই সুন্দর জায়গা দিয়ে৷এ ই সেতুটির শুরুতেই পাহাড়ের উপরে আছে একটি কালি মন্দির৷

টাকা শেষ হবার পর আমার ভাগ্নেদের সাথে মটরমেকানিকের কাজ করতাম। মজুরি সপ্তাহে দিত ১০০ টাকা৷ গাড়ি মেরামতের সময় যে গ্রীজ বেরহত সেগুলি আমি বিক্রয় করে চা বিড়ির খরচ যোগাতাম৷ আর গাড়ি মেরামতের সময় যে পার্টস লাগাতাম সেই পার্টসের পেকেটে একটা কুপন পাওয়া যেত সেগুলি অামি সংগ্রহ করে রেখে দিতাম আমার বিছানার নিছে৷ বোন, জামাই বাবু, ভাগিনা, ভাগ্নীদের কৃপণতার কথা শুনে আর সেখানে থাকার ইচ্ছা হল না৷ বাংলাদেশ আসার জন্য প্রস্তুত নিলাম, দালাল ধরলাম, দিদির কাছে বা ভাগনেদের কাছে কোন টাকা-পয়সা চাইনি৷ আর চাওয়ার ইচ্ছাও হলো না তখন৷ সংগ্রহ করা কুপনগুলো পার্টসের দোকানে বিক্রি করে পেলাম ভারতীয় ১৫০০ টাকা৷ সে তো অনেক টাকা!

বণগাও রেলস্টেশন

বড়দিদিকে বললাম কাল আমি চলে যাচ্ছি দিদি, বড়দিদি শুনে বলল সে কিরে এখন যাবি কেনরে, আরো মাসেক খনিক থাক৷ আমার বুঝতে আর কষ্ট হলো না যে বড়দিদি আমাকে শুধু শান্ত্বনাই দিচ্ছে মাত্র৷ পরদিন সকালে আমি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম, ভারতীয় টাকা পরিবর্তন করে বাংলাদেশী টাকা পেলাম  ২৮০০ টাকা৷ বর্ডারের দালালরা সেই টাকা পয়সা আমার কাছ থেক কেড়ে নিয়ে আমাকে রাতের আঁধারে বাংলাদেশ সীমান্তের ভিতরে নির্জন একটা জায়গায় ফেলে পালিয়ে যায়৷ সকালে গ্রামের শত মানুষের সহযোগিতায় আমি ভুড়িমারি বাসষ্ট্যান্ড আসি৷ তখন বাস ড্রাইভারের সহযোগিতায় ঢাকা পৌঁছাই৷ ঢাকা পৌঁছার তারিখ ১৪ই আষাঢ় ১৪০২ বাংলা ২৮শে জুন ১৯৯৫ ইংরেজি রোজ বুধবার৷ বাংলাদেশ আসার পর মনে মনে বললাম যে আবার কোন একদিন যাব ভারত।