ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

বাংলা ১৪০০ সালে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে ভারতের কলিকাতা গেলাম, তখনকার কিছু ভ্রমণের স্মৃতি আজও মনে পড়ে ৷ একদিন কানাই আমাকে বলল জীবনে ট্রামেতো উঠিসনি, কাল তোকে ট্রামে ছড়াবো ৷ কথাগুলো বলল ভারত যাওয়ার দুই তিনদিন পর, ওর কথা শুনে বললাম, কাল কেন রে, কানাই, আজকেই নিয়ে চল না অামাকে ৷ কানাই বলল, আজ বিকালে অামার একটু কাজ অাছে তো তাই আর আজকে হবে না ৷ কিন্তু ট্রামের কথা শুনে অামার আর ভালো লাগছে না, সোজা কথা রাতের ঘুমটাই হারাম করে দিলাম ট্রামকে ঘিরে ৷ ইংলিশ ছায়াছবিতে ট্রাম দেখেছি, কি সুন্দর দেখতে, ঝুলন্ত ট্রাম কি সুন্দর, তারের সাথে ঝুলে ঝুলে যাচ্ছে তো যাচ্ছে পাহাড়, গাছগাছড়ার উপর দিয়ে ৷ আর সেই ট্রামে উঠবো? কী আনন্দ হবে তাহলে, এসব ভাবতে ভাবতেই রাত পোহাল ৷

সকালবেলা হাত-মুখ ধুইয়ে নাস্তা সেরে বাসার সানমে একটা চা’ দোকানে আসলাম একা একা চা’ পান করার জন্য ৷ চা’পান করলাম, দোকানদারের সাথে গল্প করলাম আমাদের বাংলাদেশ নিয়ে, আর কী ভাবে এই বিশাল ভারতে এলাম সে বিষয় নিয়ে ৷ বললাম পাসপোর্ট ছাড়াই দাদাল মারফত আসেছি নির্দিধায় ৷ দোকানদার আমাকে বলল, তোমরা তো দাদা জয় বাংলার লোক তোমাদের সাহস আছে ৷ এই চোরাপথে অন্ততঃ আমরা যেতে আসতে পারবো না, এটা তোমাদেরই কাজ ৷ দোকানদারের সাথে কথা বলতে বলতে কানাই এসে উপস্থিত, বলল চা’ পান করেছিস? বললাম হ্যাঁ করেছি, চল এক্ষণি তাড়াতাড়ি বিকালবেলা আমার কাজ আছে বিস্তর, বলল কানাই ৷ আমি বললাম আমি তো রেডি হয়ে আছি অনেকক্ষণ আগে থেকে তোর জন্য ৷ কনাই বলল আচ্ছা ঠিক আছে এখন চল যাই, কানাই আমাকে নিয়ে রওয়া দিল বাঘাযতীন থেকে শহরের দিকে ৷ রিকশা পাচ্ছি না, তাই, হেঁটেই যেতে হবে শেষ আবধি, তা ভাবেই বোঝা যায় ৷

বাংলাদেশের মত এত রিকশা নেই সেখানে, আছে স্বল্পসংখ্যক, তাও তাঁরা একটা চাকরির ডিউটির মতোই রিকশা চালায় শত অভাবের মাঝেও ৷ কোন হাহুতাশ নেই তাদের, সারাদিনের না খাওয়া একটা লোককে বোঝা যাবেনা যে, লোকটা অনাহারী, খুব হিসাবি ওই দেশের মানুষগুলি ৷ যাক সেকথা, রিকশা পাচ্ছি না, হেঁটেই যেতে হলো শেষ অবধি, গেলাম কলিকাতার বড় বাসস্টেশন ধর্মতলা ৷

কানাই জিজ্ঞেস করল, আগে মেট্রোট্রেনে উঠবি, না ট্রামে উঠবি? বললাম যেই নিয়ত করে ঘর থেকে বেরুলাম সেটাই হোক আগে ৷ কানাই বলল, ঠিক আছে তাহলে চল যাই ট্রাম স্ট্যান্ড, দেখতে দেখতে দুই বগিওয়ালা একটা রেলগাড়ির মত এসে থামলো স্ট্যান্ডের সামনে, লেখা আছে আগে নামতে দিন, যার-যার নামার নামল, আমরা উঠলাম ট্রামে ৷ উঠার আগে আমি ট্রামের দরজায় কপাল ঠেকিয়ে, প্রণাম করে উঠলাম দুরুদুরু মন নিয়ে ৷ কারণটা হলো, ওই ট্রাম চলে বাস রোডের মাঝখান দিয়ে তাই ভয় পাচ্ছিলাম আমি, কখন যে কী হয়ে যায় কে জানে তার বিধান ! যাওয়ার সময় যদি আবার গ্যাট করে একটা বাসের মধ্যে লেগে যায় ! তাই আমার মনটা দুরুদুরু করছিলো ৷

ট্রামের দুইটি বগির দুইটি দরজা, কন্ট্রাক্টার দুইজন, প্রথম দরজায় একজন ও শেষের দরজায় একজন ৷ আমাদের বাংলাদেশের লঞ্চের মত আবার ঘন্টা আছে যা ড্রাইভারকে সংকেত দেওয়ার জন্য, লঞ্চের মত আবার ঘন্টার রকমও আছে সেটা বুঝে ড্রাইভার কখন কোন ঘন্টা বাজছে, আওয়াজ শুনেই ড্রাইভার গাড়িটা থামাচ্ছে ছাড়ছে ৷ আমরা দুজনে যাব ধর্মতলা থেকে টালিগঞ্জ, বাস ভাড়ার চেয়ে ট্রামের ভাড়া অনেক কম, বাস ভাড়া যেখানে (৯) নয় টাকা, ট্রামের ভাড়া সেখানে সারেপাঁচ টাকা মাত্র ৷ দুজন মিলে বসলাম প্রায় ট্রাম চলকের একটু পিছনের সিটে, কন্ট্রাক্টর সামনে এসে বলল, কোথায় যাবেন দাদা? কানাই বলল টালিগঞ্জ, ভাড়াটা দিন ৷ চাওয়া মাত্র কানাই পেন্টের পকেট থেকে দুটো দশটাকার কাগজের নোট বের করে দিল কন্ট্রাক্টারের হাতে, কন্ট্রাক্টর কানাইকে (৯) নয়টাকা ফেরৎ দিল ৷ কানাইতো রেগে-বেগে একেবারে অস্থির, কানাই কন্ট্রাক্টরকে বলছে আরো একটাকা ফেরৎ দিন প্লীজ ৷ ট্রাম চলছে হুহু করে, ঝগড়াও হচ্ছে ট্রামের ভিতরে, ছাড়ছেনা কেউ-কাউকে ৷ কানাই বলছে আমি গতকালও টালিগঞ্জ থেকে এসেছি ( ৫) পাঁচটাকা দিয়ে, আর এখন কিনা সাড়েপাঁচ টাকা! পঞ্চাশ নয়া তো আমি তোমাকে বেশি দিবো না দাদা ৷ তারপরে ট্রামের ভিতরে সব যাত্রী মিলে ঝগড়ায় মেতে উঠলো কানাই’র পক্ষ হয়ে, শেষমেষ কন্ট্রাক্টার দাদা একটাকা ফেরৎ দিতে বাধ্য হল ৷ একটাকা পেয়ে কানাই ক্ষেন্ত্য হল, যা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম, আর ভাবলাম ৷ ভাবলাম শুধু আমাদের বাংলাদেশ নিয়ে, একটাকার জন্য এত ঝগড়াঝাঁটি ! আর আমরা একটা ভিখারিকেও দশটাকা দিয়ে দেই, কোন দিধাবোদ করিনা ৷ আর একটাকার জন্য এত ঝগড়া!

ভাবতে লাগলাম আর জানালা দিয়ে কলিকাতা শহর দেখছিলাম, খুবই সুন্দর এই কলিকাতা শহর ৷ বাস রোডের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছি আমরা, কখনো কখনো রাস্তার পাস দিয়েও চলছে ট্রামগাড়িটা, যাচ্ছি হেলে-দুলে ৷ ট্রামগাড়ি হুবহু ট্রেন, রেলগাড়ির বিকল্প এটি ৷ দেখতে দেখতে চলে আসলাম টালিগঞ্জ শহরে ৷ নালাম ট্রাম থেকে, তাড়াহুড়ো করে উঠার জন্য ট্রামটিকে ভাল করে দেখা হয়নি ধর্মতলা স্ট্যান্ডে, এখন ট্রাম থেকে নেমে ভাল করে ট্রামের চারদিক ঘুরেছি আর দেখছি ৷ দেখলাম আমরা যে ট্রামখানায় চড়ে টালিগঞ্জ আসলাম, সেই ট্রামখানার দুইটি বগি, আর ট্রাম চলে ট্রেনলাইনের মত লোহার তৈরি লাইন দিয়ে ৷ এর চালিত শক্তি হচ্ছে বিদ্যুৎ, ঠিক ইঞ্জিনের উপরে টেলিভিশনের এন্টিনার মত বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার জন্য দুইটা এন্টিনার থাকে, একটা সামনে একটা পিছনে, যা ওই বিদ্যুতিক তারের সাথে লাগানো থাকে ৷ দুইটা এন্টিনার রাখার কারণ হলো এজন্য যে, সামনের এন্টিনার যদি বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে পিছনের এন্টিনারে তো সংযোগ থাকবে ৷ ট্রামলাইনের ঠিক মাঝখান দিয়ে আছে বৈদ্যুতিক তার সেই তার থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে থাকে ট্রামে ৷ ভরতের বৈদ্যুতিক ট্রেন আর ট্রাম একরকম ৷

টালিগঞ্জ শহরের কিছু অংশ ঘুরে দেখার পর দুপুর হয়ে গেল, একটা খাবার হোটেলে দুইজনে ঢুকলাম কিছু খাবো বলে, হোটেলের ভিতরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে বসলাম খাবারের জায়গায়, ঘরের মেঝেতে পাটির উপর, সবাই পাটির উপরেই বসে খাওয়াদাওয়া করে থাকে সেখানে ৷ তবে কলিকাতার সব হিন্দু হোটেলে এই ব্যবস্থা নাই, অনেক হোটেলেই চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা আছে যা আমাদের বাংলাদেশের মতই ৷ মেঝের উপর পাটিতে বসার পরে হোটেলের কর্মচারী আমাদের জিজ্ঞেস করল কী সেবা করবেন? রুটি না অন্ন? কানাই আমাকে জিজ্ঞেস করল তুই কী খাবি? আমি বললাম চিড়ামুরি আর রুটিতে কী ভাতের চাহিদা মেটাতে পারবে? আমি ভাত খাবো রে’ কানাই৷ কানাই বলল আচ্ছা তো দুইজনে অন্ন’ই সেবা করি ৷ যারা খাবার পরিবেশন করে তাদের ডেকে বলল অন্ন সেবা করবো আমরা, কী কী তরকারির ব্যবস্থা আছে আপনাদের এখানে? হোটেল কর্মচারী তরকারির বিবরণ বলল, রুইমাছ, কাতলামাছ, মুগডাউল, লাবড়া ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ রুইমাছ দিয়ে অন্ন সেবা করলাম দুইজনে, সাথে মুগডাউল, খুব ভালো লাগলো খেতে, রান্নাও ভাল ৷ ( সেবা করার সিস্টেমও সেখানে অন্যরকম, খাবারের জন্য কোন প্লেট বা থালা নেই, আছে গাছের পাতা দিয়ে বিশেষ ভাবে তৈরি একপ্রকার থালা, যা দেখতে হুবহু একটা থালার মতই দেখতে, অন্ন সেবা করার পর ওইসব থালাগুলো সাথে সাথেই ফেলে দেওয়া হয় যা আর ব্যবহার করা হয় না ৷ তবে কলিকাতার বড়-বড় হোটেলগুলিতে আবার কাঁচের তৈরি প্লেট ব্যবহার করে থাকে ) ৷

হোটেলের মালিক বসে আছে প্রবেশ পথের কাছাকাছি একটা ক্যাশবাক্স নিয়ে, ওনার সামনে রাখা আছে একটা পিতলের হুক্কা (ডাবা) যার আছে অনেক লম্বা চিকন হোসপাইপ, যা দিয়ে তামাকের ধূমপান করে থাকে সচরাচর ৷ সামনে যেতেই হোটেল কর্মচারীও হাজির সেবার মূল্য কত তা জানানোর জন্য, কানাই জিজ্ঞেস করলো কত? হোটেল কর্মচারী বললো পঞ্চান্ন টাকা দাদাবাবু, কানাই একশত টাকার একটা কাগজের নোট পকেট থেকে বাহির করে দিল, হোটেল মালিকের কাছে, হোটেল মালিক সঠিক মূল্য রেখে বাকী টাকা ফেরৎ দিলেন, আমরা দুইজনে হোটেল থেকে বাহির হলাম ৷

আমার স্বভাবটা আবার খুবই খারাপ, কিছু খেলেই চা’ খেতে হয়, এই অভ্যাসটা চাকরি জীবনের প্রথম থেকেই শুরু ৷ সেটা কানাইও জানে, কারণ: ওতো আমারই হেলপার ছিল, কানাই বয়সে আমার অনেক ছোট, চলাফেরা করতাম বন্ধুবান্ধবের মত, ওর সাথে বন্ধুবান্ধবের মত চলাফেরা করার জন্য মহল্লার মানুষের অনেক কালামুখও দেখেছি, কটুকাটব্য শুনেছি আমি ৷ কানাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো চা’ পান করবি? বললাম তাছাড়া কী হয়!! কানাই সহ একটা চা’দোকানে গেলাম, দোকানদারকে বললো দুকাপ চা’ দিন তো দাদা, দোকানদার বসতে বললেন আমাদের, আমরা বসলাম ৷ আমার চোখ পড়লো দোকানের সাইটে, দেখছি অনেক অনেক মাটির তৈরি চা’য়ের কাপ পড়ে অাছে সেখানে ৷ কানাইকে আমি বললাম এগুলি কী? কানাই বললো কেন রে’ চা’য়ের কাপ! এগুলি ওয়ান টাইম কাপ, যা আর ব্যবহার হবে না বা করবেও না ৷

দেখতে দেখতে দোকানদার চা’ বানিয়ে দিলো দুকাপ, গরুর দুধের চা’ বেশ ভাল লাগলো ৷ ( সেখানে চা’ বানানোর সিস্টেমটাই আলাদা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তিন প্রকারের দুধ পাওয়া যায়, যা ফেরিওয়ালারা ফেরি করে বিক্রী করে থাকে গ্রামে-গঞ্জে ৷ ফেরিওয়ালাদের থাকে বাইসাইকেল, সাইকেলে করে বাড়ি-বাড়ি, দোকানে-দোকানে গিয়ে বিকী করে থাকে তাঁরা ৷ চা’দোকানের মালিকরা যেই দুধ রাখে, সেই দুধের চার ভাগের দুইভাগ জল আর দুইভাগ দুধ, আর বড়লোক বা ধনীব্যক্তিরা যেই দুধ রাখে সেই দুধ একেবারে খাটি ৷ মধ্যবিত্ত বা গরিব লোকেরা যেই দুধ রাখে সেই দুধের চার ভাগের একভাগ জল আর তিনভাগ দুধ ) ৷ চা’পান করার পর কাপটি ফেলে দিলাম, ওইসব ফেলে রাখা কাপের স্তুপে ৷ দুকাপ চা’য়ের মূল্য পঞ্চাশ নয়া করে একটাকা মাত্র ৷ দোকান থেকে উঠে একটা রিকশা ছড়ে গেলাম টালিগঞ্জ পাতাল ট্রেনস্টেশন, (মেট্রোট্রেন) ৷ রিকশা ভাড়া নিলো দুইটাকা ৷

পাতালট্রেন, মানি “মেট্রোট্রেন” নাম শুনেছি ঠিক, তা চোখে দেখিনি দুই নয়নে ৷ বোঝা যাচ্ছে না এখানে এত নামীদামী একটা যানবাহনের স্টেশন আছে ! একটা শহরের মেইনরোডের পার্শ্বে যেভাবে দোকানপাট থাকে, ঠিক সেইভাবেই আছে সব কিছু ৷ তাহলে পাতালট্রেন স্টেশন কোথায়? সেটা মাটির নিচে ! রাস্তার ফুটপাতের দোকানপাট ডিঙ্গিয়ে খুব ছওড়া একটা নিচে নামার পথ চোখে পড়লো আমার ৷ ভাবচ্ছিলাম এটাই হবে পাতালট্রেনে যাওয়ার রাস্তা, ঠিক তাই হলো আমার চিন্তা ৷ কানাই আমার আগে আর আমি পিছনে, নিচের দিকে নামছি দুইজনে, যতই নামছি ততই স্টেশনের সৌন্দর্য ফুটে উঠছে ৷ ঠিক যেন দিনের আলোর মত লাগছিলো আমার কাছে, অনেক নিচে স্টেশন, তা একটি দ্বিতল ভবনের সমান হবে নিশ্চিত ৷ বিষাল জায়গা জুরে এই পাতালট্রেন স্টেশনটি যা দেখার মত ! স্টেশনের উপরে আছে দোকানপাট, মার্কেট, নিচে তৈরি করেছে স্টেশন ৷ খুবই সৌন্দর্য, কোথাও আঁধারের চিহ্ন মাত্র নেই, পুরো জায়গা জুরে অালো যা দিনের আলোর মত আলোকিত ৷

কানাই ট্রেনের টিকেট সংগ্রহ করছে লাইনে দাঁড়িয়ে, আর আমি তাকিয়ে তাকিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছি, আর ভাবছি ৷ কানাই টিকেট সংগ্রহ করে আমাকে বলল চল তাড়াতাড়ি ট্রেন আসছে ৷ ট্রেনের সামনে যাওয়ার প্রবেশ পথটি আটকানো আছে ষ্টীলের গ্রীল দিয়ে, প্রবেশদ্বারে আছে গ্রীলের তৈরি একটা চরকার মত আটকানো, তা আবার কম্পিউটারের মাধ্যমে লক আনলক করা থাকে ৷ কোন গার্ড বা কোন পুলিশ গেইটের সামনে নেই, আছে হাতেগুণা কয়েকজন তাও দূরে বসে বসে গল্পগুজব করছে ৷ কানাইর হাতে দেখলাম একটা টিকেট, বললাম কী রে’ কানাই, তুই যাবি না? কানাই হাসলো, বললাম হাসছিস কেন? ওবললো কেন ! দুইজনেই যাবো !! বললাম টিকেটতো দেখছি একটা তোর হাতে তাই বললাম, ওবললো এই একটা টিকেট দুইজনের জন্য, দশজন হলেও একটা টিকেটই থাকবে ৷ টিকেটের গায়ে লেখা থাকবে জনের সংখ্যা, একশজন হলেও একটা বুঝলে !

ট্রেনের শব্ধ শুনতে পাচ্ছি, ট্রেন আসছে দ্রুতগতিতে ৷ বৈদ্যুতিক ট্রেন, যা চোখের পলকে চলে যায় অনেক দূর অনেক মাইল বা কিলোমিটার পথ ৷ এটি বাংলাদেশের মত ডিজেল চালিত ট্রেন নয়, দ্রুতগতিসম্পূর্ণ হাইস্পীড ট্রেন ৷ যা চোখের পলকেই মনে হয় হাওয়া ৷ স্টেশনে প্রবেশের বেলায়ও আছে বিশেষ ব্যবস্থা ৷

প্রবেশদ্বারের সামনে গ্রীলের তৈরি চরকার একপাশে একটা কম্পিউটার বক্স বসানো আছে, বক্সের সামনে একটা ষ্টীলের পাতের মত আছে, যাতে সেখানে টিকেট রাখা যায় ৷ সেই পাতে টিকেটখানা রাখার সাথে সাথে টিকেটখানা বিপরীত সাইটে চলে গেল, সেই সাথে গ্রীলের তৈরি চরকার লক খুলে গেল, দেখছি চরকা আস্তে আস্তে ঘুরছে, কানাই আগে গেল আমি পরে গেলাম, আমরা পাড় হওয়ার সাথে সাথে চরকার লক আবার লেগে গেল সয়ংক্রিয় ভাবে, যা আর সঠিক টিকেট ছাড়া লক ছুটবে না ৷ আবার গন্তব্যস্থানে পৌছে ট্রেন থেকে নেমে আসার সময়ও এই একই ব্যবস্থা, কেন না, টিকেট কাটলাম টালিগঞ্জ থেকে ধর্মতলা, যদি নামি দমদম? নামতে ঠিকই পারবো, কিন্তু’ ধরা খাবো কম্পিউটারে ! ওইসব দুইনম্বরী টিকেট কম্পিউটারে দেওয়ার সাথে সাথে সাইলেন্স বাজতে থাকবে বোঁ বোঁ করে, সাথে সাথেই পুলিশ এসেই নিয়ে যাবে শ্রীঘরে ৷

আমরা ভিতরে গিয়ে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই ট্রেন এসে থামল স্টেশনে, ট্রেন থামার সাথে সাথে ট্রেনের সমস্ত দরজা-জানালা খুলে গেল সয়ংক্রিয় ভাবে ৷ যাত্রী নামল, আমরা উঠলাম ট্রেনে, দুপুরের পর পাতালট্রেনে বেশি একটা ভিড় হয় না, ভিড় হয় অফিস-আদালত ছুটির পর, আর হয় অফিস টাইমে ৷ আমরা যে ট্রেনে উঠলাম সেই ট্রেনেও খুব একটা ভিড় নেই, তবু মোটামুটি ভাল যাত্রীই আছে, বসলাম জানালার সাইটে কিছু দেখার জন্য ৷ যাত্রী উঠা-নামা শেষ, ট্রেন ছাড়ার সময় ট্রেনের ভিতরে ছোট ছোট মাইকের মত আছে প্রত্যেক বগিতে ৷ মাইকে বলতে লাগল, দয়া করে দরজা-জানালা হতে দূরে থাকুন প্লীজ ৷ এই কথাটা তিনবার বলে থাকে ৷ সাথে সাথে দরজা জানালা একসাথে লেগে গেল, মাইকে আবার বলল, এক্ষণি আমরা ধর্মতলা ও দমদমের উদ্দেশে রওনা হচ্ছি ৷ এই কথা বলার সাথে সাথেই ট্রেন ছেড়ে দিল, ছুটছে তো ছুটছেই, জানালার সাইটে বসেছিলাম শখ করে কিছু দেখার জন্য, হায়রে কপাল আমার মিছে আশা, কিছুই দেখা যায় না, শুধুই অন্ধকার ৷

images-8

DEElZSP1uyKkX7yw70FLQ2PNAot3ykVop2kXzpJFASYoeszLVxgGDci2gBnjhqEDpo49qj8VDb5NOYriR7ZvWMKCwW7Xf73rgFDpKH6M6D6n9G5y64IoSB-dsEsX68iglg=w443-h332-nc

ভিতরে গান বাজছে, বাজনা বাজছে, বাজনার তালে তালে আর আলোতে হেলে-দুলে ছুটছে পাতালট্রেন ৷ মুহুর্তের মধ্যেই আমরা পৌছে গেলাম ধর্মতলা, ধর্মতলা পৌছার দুইমিনিট আগে থেকে মাইকে বলা হচ্ছিল যে, সম্মানিত যাত্রীগণ, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ধর্মতলা পৌছাবো, আপনার যারা ধর্মতলার যাত্রী আছেন আপনাদের গন্তব্যস্থানে নামার জন্য প্রস্তুত হোউন ৷ এই কথাগুলি বলা শেষ হতে না হতে ট্রেন ধর্মতলা স্টেশন এসে থামল, সবাই নামল, আমরাও নামলাম ৷ দেখলাম ভারতের বৈদ্যুতিক ট্রেনের বিদ্যুৎ সংযোগ থাকে উপরে তারের সাথে এন্টিনারের সাহায্যে, আর পাতাল ট্রেনের বিদ্যুৎ সংযোগ থাকে ট্রেনলাইনে, যেই লাইনের উপর দিয়ে হুঁহুঁ করে ট্রেন চলে ৷ না জেনে কেউ ভুল করে যদি ওই লাইনের উপর হাঁটে বা পা’ রাখে তবে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত৷ লেখা থাকে সাবধান বিপদজনক ৷ তারপরেও  কেউ যদি সেখানে ভ্রমণে যাওয়ার ইচ্ছে থাকে তো সাবধান ৷ ( ছবি সংগ্রহ গুগল )