ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

একজন ভিক্ষুক, দুইদিন পরপর নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ গোদনাইল এলাকায় ভিক্ষা করতে আসে। তার বাহন চারটি পুরাতন ব্যারিং এর চাকার গাড়ী, শরীরে বাঁধা থাকে একটি ব্যাগ, যার মধ্যে থাকে মানুষের দেয়া কিছু টাকা পয়সা। লোকটি জন্ম প্রতিবন্ধী, জন্ম থেকেই তার দুটি পা বাঁকা এবং চিকন। নাম মোহাম্মদ এছাক। বাড়ি বরিশাল, দেশের বাড়িতে তেমন কোন জমি-জমা নেই, মা-বাবা বহু আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। লোকটির এক বোন ছিল, বিয়ে দেয়ার পর সে পরের ঘরে সংসার করছে। তাকে দেখার কোন লোক না থাকার কারণে দেশের বাড়িতে বেশি দিন থাকা হলো না। আত্মীয় স্বজন ছিল গরীব, সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাকে দেখবে কে?

মা-বাবা মৃত্যুর পর অনেকদিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকার পর কোন একসময় পরিচিত একজন লোকের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জ আসা। প্রথমে বরিশাল থেকে বড় লঞ্চে করে ঢাকা সদরঘাট আসে, সদরঘাট কিছুদিন ভিক্ষাবৃত্তি করার পর নারায়ণগঞ্জের এক পুরাতন কাপড় ব্যবসায়ীর হাত ধরে এই নারায়ণগঞ্জ আসা। ওই ব্যবসায়ী চাঁনমারী বস্তিতে তাঁর পরিচিত একজন লোকের কাছে এই এছাক মিয়াকে থাকতে দেয়।

IMG_20170110_093015ব্যারিং এর পিঁড়ি গাড়ী করে রাস্তায় এছাক মিয়া।

এই চাঁনমারী বস্তি ছিল কোন এক সময় নারায়ণগঞ্জের নামকরা বস্তি, যেই বস্তিতে ঘরের সংখ্যা ছিল প্রায় হাজার খানিক, তা হলে লোক সংখ্যা ছিল কত? বহু লোকের বসবাস ছিল এই চাঁনমারী বস্তিতে। এক সময় এই বস্তি উচ্ছেদ করতে প্রশাসনের অনেক তেলখড়িও পুড়তে হয়েছিল, যা এই বঙ্গদেশের অনেকেই জানে। সেই খ্যাতনামা বস্তিতেই জায়গা হয়ে গেল এই এছাক মিয়ার। ব্যারিং এর চার চাকার পিঁড়ির মত গাড়ীটি ওই ব্যবসায়ী বানিয়ে দেয় তাঁর চলাফেরার জন্য, এক সময় এই গাড়ীই হয়ে যায় এছাক মিয়ার নিত্যসঙ্গী। নিঃস্ব আর পঙ্গু হওয়ার সুবাদে চাঁনমারী বস্তিতে তাঁর একটা জায়গাও হয়ে যায় কোন এক সময়। এছাক মিয়া প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বাহির হয়ে রাস্তায় রাস্তায় তাঁর বাহন গাড়ীটি নিয়ে চলতে থাকে, চলার পথেই মানুষে তাঁর হাতে তুলে দেয় যে-যা পারে। দুপুরবেলা চলে যায় মহল্লার ভেতরে, দুপুরের খাবারটা যোগাড় করার জন্য। দুপুরের খাবার মানুষের বাসায় সেরে সন্ধ্যার সময় ফিরে নিজের ঘরে। একা একা কেউ নাই তাঁর, অর্ধরাত পর্যন্ত বসেবসে আল্লাহর জিকির করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পরে।

একদিন এলাকার এক লোক রাতে তাঁর আল্লাহ জিকির শুনে তাঁর ঘরে ঢুকে, ঘরে ঢুকে এছাক মিয়ার পাশে অনেকক্ষণ বসে থাকে, কিন্তু এছাক মিয়ার সেদিকে কোন খেয়াল নেই। অনেক পরে এছাক মিয়ার জিকির থামে, জিকির বন্ধ করার পর এছাক মিয়া দেখে তাঁর পাশে একজন লোক বসা আছে, লোকটি এক মসজিদের ইমাম সাহেব। তখন হুজুর এছাক মিয়ার জীবনি শুনলেন, জীবনি শুনে হুজুর তাকে বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে কে? যার দুটি পা নেই জন্ম প্রতিবন্ধী একজন মানুষ। এছাক মিয়া বললেন হুজুর আমার কাছে কে মেয়ে বিয়ে দিবে? আমি তো একজন পঙ্গু মানুষ। হুজুর বিয়ে করানোর দায়িত্ব নিলেন, বললেন পুরুষের বিয়ে করা ফরজ কাজ, বিয়ে করতেই হবে। তারপর হুজুরের সহযোগিতায় একদিন এছাক মিয়া বিয়ে করলেন চাঁনমারী বস্তির-ই এক গরীব মেয়েকে। বিয়ে করার দুইবছর পর তাঁদের মিলনে একটি মেয়ে সন্তানের জনক হলেন এছাক মিয়া। মেয়ের বয়স বর্তমানে চার বছর, স্ত্রী গার্মেন্টস এ কাজ করে, এখনো বসবাস চাঁনমারীর রাস্তার ঢালে।

1483624405408এক ব্যক্তির দান করা প্রতিবন্ধীদের গাড়ী চড়ে বসে আছে এছাক মিয়া

মাঝে-মাঝে দেখি এছাক মিয়া তাঁর বাহন পিঁড়ি গাড়ীটি নিয়ে আমাদের এলাকায় আসে, আমাদের এলাকায় তাঁর আনাগোনা সপ্তাহে দুই দিন। এলাকার অনেক মানুষ আছে এছাক মিয়াকে দুপুরে খাওয়ানোর জন্য, দুপুর হলেই চলে যায় যেকোন একজনের বাসায়। খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার সে নেমে পড়ে রাস্তায়। একদিন বিকালবেলা তাঁর সাথে দেখা, আমাকে এছাক মিয়া অনেক আগে থেকে চিনে ও জানে। আমি বিকালবেলা যেই দোকানে যাই আমার অফিসের কাজে, ঠিক সেই দোকানেই এছাক মিয়ার নিয়মিত বিশ্রাম, সেই থেকেই এছাক মিয়া আমাকে চিনে ও জানে। উপরে যা লেখেছি তা এছাক মিয়ার কাছ থেকে শোনা, তবু আরও কিছু জিজ্ঞেস করলাম এছাক মিয়াকে।

জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন? বললেন, ভালো আছি বাবু। জিজ্ঞেস করলাম, আজ কত রোজগার হলো? বললেন, হবে তিন-চার’শ টাকার মত। বললাম, নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে তো বেশ ভালো আছেন, এখনো ভিক্ষা করেন কেন? বললেন, আমি তো বাবু কারো কাছে ভিক্ষা চাই না, লোকে আমাকে এমনিতেই দেয়। ভিক্ষা করতে তো মন চায় না বাবু! কি আর করতে পারি আমি? ভিক্ষা খারাপ কাজ জানি, তাই আমি মানুষের কাছে হাত পাতি না, মানুষ আমাকে দেখে আমার হাতে দুইটাকা একটাকা দিয়ে যায়। আবার অনেকে আগে থেকে বলে রাখে এখানে আসলে দুপুরে তাদের বাসায় যেতে, না গেলে রাগ করে বাবু! তাই যাই। এই দেখুন না, এই গাড়িটাও আপনাদের এখানকার একজনে আমাকে দিয়েছে।

বললাম, টাকা-পয়সা বেশি কিছু থাকলে একটা চা’দোকান দিয়ে বসে পড়েন, তবে আর রাস্তায় নামতে হবে না। বললেন, স্ত্রী গার্মেন্টস এ কাজ করে, ভালো বেতন পায়, আমিও সারাদিনে ভালো রোজগার করতে পারি। দেশের বাড়িতে আগে কিছু ছিল না, এখন কিছু জায়গা রেখেছি আর দু’এক বছর পর সবাই দেশেই চলে যাব। দেশে গিয়ে দেখব কি করা যায়? আর ভিক্ষা ভালো লাগে না, অনেক সময় বাহিরও হই না গাড়ি নিয়ে।

এছাক মিয়া একজন পঙ্গু মানুষ, তাকে দেখলেই বোঝা যায় যে, তাঁর ভিক্ষা ছাড়া উপায় কী? অথচ সে বলছে ভিক্ষা করা ভালো কাজ না, ভিক্ষা করতে ভালোও লাগে না। যদি আমার পা দুটি ভালো থাকতো তবে এই ভিক্ষাবৃত্তি আমি করতাম না, সারাদিন না খেয়ে থাকলেও না। আর আমাদের দেশে বহু ভিক্ষুক আছে তাঁরা সব দিক দিয়েই পরিপূর্ণ। তাদের সর্বঅঙ্গ পরিপূর্ণ থাকতেও তাঁরা এই ভিক্ষা পেশাকে বেছে নিয়েছে নিজের ইচ্ছায়।