ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 
IMG_20161124_091143

আইসক্রিমের ভ্যানগাড়ি থেকে আইসক্রিম নিয়ে দোকানে-দোকানে দিচ্ছে এক আইসক্রিম সরবরাহকারী ৷

বর্তমান বাজারের ধাতব মুদ্রা এক টাকা, দুই টাকা আর পাঁচ টাকা কয়েনের ভার কমানোর জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে ফেলেছে কিছু-কিছু দোকানদাররা । কী কৌশল? কেমন কৌশল? তার বিবরণ নিম্নে লিখে জানাচ্ছি । আগে আমার ছোটবেলা এক পয়সা, দুই পয়সা, পাঁচ পয়সা, এক আনা, দুই আনা জমানোর স্মৃতিচারণগুলো সবাইকে জানিয়ে রাখি । কারণ এই ‘কয়েন’ বা পয়সার সাথে আমার একটা মধূর সম্পর্ক আছে, যা এখনো আমি সেই সম্পর্ক ছিহ্ন করতে পারছি না । সেই সম্পর্কের টানে এখনো আমি ভাংতি পয়সা বা ‘কয়েন’ পেলে জমা করে রাখতে মন চায়, তাই জমাও করেছি অনেক, এগুলি এখন চালানো বড় দায় ।
Bangladesh_money_coins(0)

একসময়ের পয়সা বা ‘কয়েন’ ৷ ছবি সংগ্রহ গুগল।

ছোটবেলায় বড়দের দেখাদেখি আমিও ঘরের বাঁশেরখুঁটি কেটে সেই খুঁটিতে ভাংতি পয়সা জমা করে রাখতাম, পূজা-পার্বণে আর মেলায় খরচ করার জন্য । কোনো পূজা পার্বণ আসলে জমানো পয়সা বাঁশেরখুঁটি কেটে, পয়সা বাহির করে পূজা পার্বণের মেলা থেকে নিজের মনমতো নানারকম পছন্দের জিনিস কিনে আনতাম । সেই দিন আর এখন নাই, এখন পয়সা জমানোর জন্য বহু রকম আধুনিক জিনিস পাওয়া যায় । এখন অনেক ডিজাইন করা মাটির ব্যাংক, প্লাস্টিকের ব্যাংক পাওয়া যায় সচরাচর যেখানে সেখানে ।
image_110955.save-money

ছবি সংগ্রহ গুগল থেকে ৷

এই পয়সা জমা করার কাজটি করে থাকে হিসেবি গৃহিণীরা, আর কিছু দোকানদারর আবার কিছু হিসেবি মানুষেরা, যাতে নিদানকালে এই জমানো পয়সা দিয়ে কিছু দুরবস্থা দূর করা যায়, সেই আশায় । সেই আশায় যদি ছাই পড়ে তখন? তখন মাথায় আর কপালে হাত দেয়া ছাড়া আর কিছুই খাকে না । বর্তমানে আমাদের এই বঙ্গদেশে এই কয়েনের ভারে অনেক সাধারণ মানুষ আর দোকানদারের কোমর বাঁকা হয়ে গেছে, সেই কোমড় সহসা সোজা করতে পারছে না । এখন আর গৃহহিনীরা বা দোকানদাররা বাঁশখুঁটিতে পয়সা (বর্তমান কয়েন) জমায় না ভয়ে, কারণ একটাই, তাহলো এই ‘কয়েন’ একসাথে কেউ একশ টাকার ‘কয়েন’ নিতে চায় না । তাই কয়েক মাস গত হলেই একজন দোকানদারের কাছে শতশত ‘কয়েন’ জমা হয়ে যায়, সেই ‘কয়েন’ কেউ নিতে চায় না বিধায় প্রভাব পড়ে দোকানদার সহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজির উপর ।
IMG_20161028_220238IMG_20161129_164919

ধাতব মুদ্রা কয়েনের বোঁজা নিয়ে বিপাকে দোকানদার সহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ৷

আগেই বলে রাখা ভালো, ক’মাস আগে আমি এই ব্লগে কয়েন নিয়ে একটা লেখা লেখেছিলাম, লেখার শিরোনাম ছিল, মাননীয় অর্থমন্ত্রী, দুই টাকা আর পাঁচ টাকার ‘কয়েন’ কি পানিতে ফেলে দিবো?। আজকে আবার সেই ‘কয়েন’ নিয়েই কিছু লেখতে চাই, কারণ: এই কয়েন নিয়ে নিজেও সময়-সময় ঝামেলায় পড়ে যাই, যখন একজন দোকানদার একসাথে ১০টা পাঁচ টাকার ‘কয়েন’ নিতে না চায়, তখনই বাঁধে তর্ক-বিতর্ক । আবার রিকশায় চড়ে কোথাও গেলে রিকশাওয়ালাকে দুচারটা ‘কয়েন’ দিতে চাইলেও রিকশাওয়ালাও ‘কয়েন’ নিতে চায় না, তাহলে উপায়? উপায় মনে হয় একটাই, তাহলো কয়েন ধুয়ে পানি পান করা ।

আমি নিজেও দোকানদারদের মতো একজন আমদানিকারক, প্রতিনিদ দোকান-দোকানে গিয়ে আমাদের সমিতির ঋন দেওয়া টাকা আদায় করি । সমিতির পাওনা আদায় করতে গেলে নিজের কাছেও অনেক ‘কয়েন’ জমা হয়ে যায়, সেই ‘কয়েন’ আর আমার অফিসে গ্রহণ করেনা, তা আমার কাছেই থেকে যায় । বর্তমানে আমার কাছেও বহু ‘কয়েন’ জমা হয়ে আছে তা আর একসাথে কাউকে দিতে পারছি না, ভাবছি এই ‘কয়েন’ দিয়ে কী করবো? এই কয়েন নিয়ে ভাবতে ভাবতে একদিন চোখে পড়ল এক অন্যরকম দৃশ্য । দেখলাম, এই কয়েনের বোঝা ছোট করার জন্য দোকানদাররা এক অন্যরকম বুদ্ধি করে ফেলেছে ।
IMG_20161119_122632-1

আইসক্রিমের ভিতরে ‘কয়েন’ দেয়া আইসক্রিমের পুটলি হাতে দোকানদার ৷

যা দেখলাম! একদিন বেলা ১১টায় আমি আমার অফিস থেকে বাহির হয়ে একটা দোকানে এলাম চা’ পান করতে, পাশের একটা স্টেশনারি দোকানের সামনে দেখছি ছোটছোট ছেলে-মেয়েদের ভিড় । কিসের এত ভিড়? জানতে চাইলাম এক লোকের কাছে, লোকটি বললেন আইসক্রিমের জন্য ভিড়, আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন? লোকটি জবাব দিলেন, আইসক্রিমের ভিতরে একটাকা পওয়া যায় তাই এত ভিড় । আমি তাড়াতাড়ি করে চা’ পান করে দৌড়ে গিয়ে দেখি স্কুলের ছেলে-মেয়ে আইসক্রিমের ফ্রিজের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে আইসক্রিমের জন্য । আইসক্রিমের দাম দুই টাকা আর চার টাকা, আইসক্রিমের ভিতরে আছে এক টাকা আর দুই টাকার ‘কয়েন’ । তাহলে একটা আইসক্রিমের দাম পড়লো মাত্র এক টাকা আর দুই টাকা, এক টাকা দামের আইসক্রিমের ভিতরে আছে এক টাকার ‘কয়েন’ আর চার টাকা দামের আইসক্রিমের ভিতরে আছে দুই টাকার ‘কয়েন’ ।

দুই টাকা দামেয় আইসক্রিমটা দেখতে একটু ছোট আর চার টাকা দামের আইসক্রিমটা একটু বড় এবং মোটা । ছেলে-মেয়েরা এই কয়েনের লোভে একটা আইসক্রিম নিয়ে, তাড়াতাড়ি করে খেয়ে, আইসক্রিমের ভিতর থেকে ওই ‘কয়েন’ বাহির করে আবার একটা আইসক্রিম কিনছে । আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি আর ছেলে-মেয়েদের সাথে মজাও করছি এই ‘কয়েন’ নিয়ে, এরপর আমি নিজেও একটা আইসক্রিম কিনলাম ওই দোকান থেকে ‘কয়েন’ দেখার জন্য । হাঁ দেখছি, খুব সুন্দর করে আইসক্রিমের নিচের মোটা জায়গায় ঠিক ভাবে এক টাকা আর দুই টাকার ‘কয়েন’ বসিয়ে দিয়েছে, যা খেতেখেতে শেষ পর্যায়ে সেই কয়েনটা বাহির হয়ে যায় ।
IMG_20161119_120535-COLLAGE

ছবিতে ‘কয়েন’ ভর্তি আইসক্রিম হাতে উল্লসিত ছোট ছেলে-মেয়েরা ৷

একটু পর দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনাটা কী আইসক্রিমের ভিতরে ‘কয়েন’? দোকানদার বললেন, আমরা অনেক দোকানদার মিলে শলাপরামর্শ করে একটা বুদ্ধি করেছি ভাই । জানতে চাইলাম, বুদ্ধিটা কী? বুদ্ধিটা হলো প্রতিদিন যে হারে এই ‘কয়েন’ আমাদের কাছে পড়ে, সেই কয়েনগুলি আমরা সহজে চালাতে পারিনা । তাই আমরা আইসক্রিম ব্যবসায়ীকে বলেছি আমারা তোমাদের এক টাকা ‘কয়েন’ আর দুই টাকার ‘কয়েন’ দিবো, তোমরা আমাদের যেটা এক টাকা দামের আর যেটা দুই টাকা দামের আইসক্রিম দাও সেই আইসক্রিমের ভিতরে এই এক টাকার ‘কয়েন’ দুই টাকার ‘কয়েন’ ঢুকিয়ে দিবে । এতে তোমাদের ন্যায্য দাম ঠিকই পাবে, আইসক্রিমও ভালো চলবে, আমরাও কয়েনের ঝামেলা থেকে একটু মুক্ত হতে পারবো । আমি দোকানদারকে বললাম, বুদ্ধিটা তো বেশ হয়েছে! তো আপনার কাছে কতগুলি ‘কয়েন’ জমা আছে, যার কারণে আপনি এত বেহুঁশ হয়ে গেছেন?

দোকানদার আমাকে যা দেখালেন তাতে বুঝলাম সেখানে প্রায় ৪/৫ হাজার টাকা হবে । আমি ভাবলাম, একটা মুদিদোকানে ৪/৫ হাজার ধাতব মুদ্রার ‘কয়েন’ তো অনেক কিছু, তাহলে ছোট একটা দোকান মালিকের নিজের চালান থাকে কত? দোকানদার আরো বললেন, এগুলি তো দোকানে, বাড়িতে তো আরো আছে ৷ কেউ তো একশ টাকার ‘কয়েন’ একসাথে নিতে চায় না, তাহলে এগুলি চালাবো কোথায়? দুই টাকার কাগজের নোট আর পাঁচ টাকার কাগজের নোট থাকতে আবার এই ধাতব মুদ্রা ‘কয়েন’ কেন? দুই টাকার কাগজের নোট-ই তো একসাথে অনেকগুলো কেউ নিতে চায় না, তাহলে এত ওজনের দুই টাকা/পাঁচ টাকার ‘কয়েন’ আবার নিতে চায় কে? ক’দিন পরে দেখবেন সাবানের ভিতরেও পাঁচ টাকার ‘কয়েন’ ঢুকিয়ে দিবে সাবান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলি ৷ দোকানদারের কথা শুনে আমার কোনো জবাব নাই । এই কয়েনের বোঝা কমানোর জন্যই অনেক সময় অনেক দোকানদার এসব ‘কয়েন’ নিতে চায় না, তখন খরিদ্দারের সাথে বাঁধে গণ্ডগোল আর বাক-বিতণ্ডতা

IMG_20161015_084045-COLLAGE

ছবিতে কয়েনের নানারকম পুটুলি করে রেখেছে দোকানদার ব্যবসায়ীরা ৷

এমন-ই এক পরিস্থিতে আমি নিজেও একদিন পরেছিলাম । একদিন এক দোকানদারের সাথে তো আমার ঝগড়াই হয়ে গেল এই ‘কয়েন’ নিয়ে, সেটা ছিল পাঁচ টাকার ‘কয়েন’ । এক কাপ চা’ পান করে পাঁচ টাকা নিতে গিয়েই বাঁধলো ঝগড়া, দোকানদার এই পাঁটা কার ধাতব মুদ্রা ‘কয়েন’ নেবে না, আমিও আর কাগজের নোট দোকানদারকে দিচ্ছি না । এই নিয়ে ঘটে গেল এক তুমুলকাণ্ড, শেষমেশ আমার প্রতিরোধের মুখে দোকানদার এই ‘কয়েন’ নিতে বাধ্য হয় । কিন্তু আমার নিজের কাছে খুবই খারাপ লাগছিল দোকানদারের সাথে ঝগড়া করছিলাম তার জন্য, কেন না, আমি নিজেও তো একজন ‘কয়েন’ রুগি তাই ।

এখন আমরা সাধারণ মানুষ কার কাছে দাবি জানাতে পারি যে, মহোদয় আপনি এই দেশে দুই টাকা আর পাঁটা কার কাগজের নোট থাকতে আর কোনো ধাতব মুদ্রা (কয়েন) বাজারে ছাড়বেন না । যেগুলি আছে, সেগুলি থেকেও কিছু পরিমাণ ধাতব মুদ্রা (কয়েন) উঠিয়ে নিন, দোকানদার সহ সাধারণ ব্যবসায়ী বাঁচান, সাধারাণ মানুষের ঝামেয়া মুক্ত করুণ । না হয় উপায়ান্তর না দেখে, ওইসব দোকানদারদের মত অন্য সব সামগ্রীর ভিতরে থাকবে এই কয়েন, থাকবে পাউরুটির ভিতরে, থাকবে চকলেটের ভিতরে, থাকবে সাবান-স্যাম্পু-স্নো-পাউডাররে ভিতরেও ৷