ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোজ বৃহস্পতিবার গিয়েছিলাম সিদ্ধিরগঞ্জ সাইলো (বিশ্ব গোডাউন) এলাকায় একজন লেখকের সাথে দেখা করার জন্য। যাওয়ার পথে আদমজী সোনামিয়া মার্কেটের সামনে যেতেই পরলাম যানজটের কবলে। যানজটের দৃশ্য দেখে ভাবছি গাড়িতে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না, যেতে হবে পায়ে হেঁটে।

যানজটে আটকা পড়া যানবাহনের দীর্ঘ লাইন, সেই সিদ্ধিরগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে শুরু করে আদমজী সোনামিয়া মার্কেট পর্যন্ত শুধু গাড়ির বহর। আমি উপায়ন্তর না দেখে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, সামনেই সাবেক আদমজী জুট মিলের প্রধান গেইট, বর্তমান ‘আদমজী ইপিজেড’।

IMG_20161121_110335

বর্তমান আদমজী ইপিজেড এর প্রধান গেইট, এই বিশালাকার গেইট দিয়েই প্রতিদিন হাজার-হাজার শ্রমিক কর্মচারি যাতায়াত করে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে।

আদমজী জুট মিলস (পাটকল) পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল হিসেবে বিখ্যাত ছিল। এটিকে একসময় বলা হত প্রাচ্যের ডান্ডি (স্কটল্যান্ডের ডান্ডির নামানুসারে) নামকরণ। এই আদমজী জুট মিল বর্তমানে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা, নাম হয়েছে (আদমজী ইপিজেড)। এখানে দিনরাত হাজার-হাজার মানুষের আনাগোনা। ইপিজেডের ভিতরে শিল্প প্লটের সংখ্যা ২২৯টি, শ্রমিক সংখ্যা ২০১৬ সালের হিসেবে ৪৫ হাজার ৩১৭ জন, বর্তমানে আরও বেশি।

এই আদমজী ইপিজেডের প্রবেশ পথেই নারায়ণগঞ্জ ডেমরা ভায়া চিটাগাং রোড। বর্তমানে এই রোড দিয়ে হাজার-হাজার গাড়ি চলাচল করে দিনরাত ২৪ ঘন্টা। ‘আদমজী ইপিজেড’ থেকেও শ্রমিকরা আসা যাওয়া করে ২৪ ঘন্টা চলন্ত বাস-ট্রাক, সিএনজি, অটোরিকশার সামনে দিয়ে। এভাবে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে আসাযাওয়ার ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পাড়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা। অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটেও যায় অসাবধানতার আর তাড়াহুড়ার কারণে। তখন শুরু হয় গাড়ি ভাংচুর প্রতিবাদ মিছিল-মিটিং। ‘আদমজী ইপিজেড’র ডিউটি শুরু হওয়ার আগে শ্রমিক আর পথচারীদের রাস্তা পারাপারের দৃশ্য দেখলে যেকোনো লোকের পিলে চমকে যাবে মুহুর্তের মধ্য। শুধু ‘আদমজী ইপিজেড’ নয়, আদমজীর আগে সিদ্ধিরগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়েও একই আবস্থা। এই দুইটি স্থানে পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য দুটি ফুট ওভার ব্রিজ অত্যন্ত জরুরী। একটি আদমজী ইপিজেডের সামনে আরেকটি সিদ্ধিরগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়ে।

IMG_20170223_115012~2

এই হলো সিদ্ধিরগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়, ইপিজেডের ডিউটির সময় এই চৌরাস্তায় থাকে এক অন্যরকম দৃশ্য, যানজট কাকে বলে!

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় ইপিজেডের শ্রমিকদের ডিউটি, দুপুর ১টায় খাওয়ার সময় একঘন্টা। দুপুরবেলা খাওয়ার (লাঞ্চ) সময় বেশিরভাগ শ্রমিক তাদের নিকটতম বাসস্থানে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে যায় দৌড়ের ওপর। একঘন্টা সময়ে খাওয়া সেরে আবার কর্মস্থলে হাজির হতে হয়। এই অল্পসময়ে যাতায়াতের মাঝে রাস্তা পারাপার হতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ১০/১৫ মিনিট যানজটের কারণে। শত চেষ্টা করেও তাড়াতাড়ি রাস্তা পার হতে পারেনা কর্মরত শমিকরা, শুধু যানজট আর চলন্ত গাড়ির জন্য।

এই আদমজী ইপিজেডে যখন ডিউটির সময় হয়, তখন দেখা যায় হাজার হাজার শ্রমিক নারী-পুরুষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। তখন তাদের চোখ থাকে নারায়ণগঞ্জ হতে ডেমরা, চিটাগাং রুটের বড় বড় গাড়িগুলির দিকে। উপায়ান্তর না দেখে ওইসব চলন্ত গাড়ির চিপাচাপা দিয়েই তাদের যাতায়াত করতে হয় হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে। এখানে একটা ফুট ওভার ব্রিজ নাই, ফুট ওভার ব্রিজ থাকলে আর ওইসব শ্রমিকদের ১০-১৫ মিনিট রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। মালিক কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া অল্প সময়েই নির্বিঘ্নে নিরাপদে নির্ভয়ে ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে সময়মত কাজে যোগদান করতে পারতো।

কিন্তু দুঃখের কথা, যেখানে হাজার-হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান, যেখানে এসব খেটে খাওয়া শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে ইপিজেডের অভ্যন্তরের মালিকদের ব্যবসা, যাদের শ্রমের বিনিময়ে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা আর লাভবান হচ্ছে মালিকগণ, সেখানে শ্রমিকদের জীবনের দিকে মালিকপক্ষ একটুও তাকায় না। তারা মালিকরা শুধু তাকিয়ে থাকে তাদের ঘড়ির কাটার দিকে, কখন একঘণ্টা সময় শেষ হবে আর কখন ডিউটির সময় শুরু হবে। কে আসলো আর কে আসলো না সেই দিকে।

ভাবতে অবাক লাগে যে, ইপিজেডের ভিতরে যদি ২২৯টি শিল্প প্লট থাকে, তাহলে সম্মানিত মালিকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২৯ জন। সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও তো দামি গাড়ি নিয়ে এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করে, তারা কীভাবে চোখ বুজে থাকে? তাদের এই যাতায়াতের মাঝে তাদের শ্রমিক আর পথচারীদের রাস্তা পারাপারের দৃশ্য কী তাদের নজরে একটুও পড়েনা? নিশ্চয় পড়ে, হয়তো সম্মানিত মালিকগণ দেখেও দেখেনা।

যদি এসব দৃশ্য সম্মানিত মালিকগণ দেখে থাকেন, তবে আপনাদের কাছে দাবি জানাই। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন বা ইপিজেড পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ‘বেপজা’ আর নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়রের সাথে আলাপ আলোচনা করে, ইপিজেডের সামনে আর সিদ্ধিরগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়ে, দুটি ফুট ওভার ব্রিজের ব্যবস্থা করেন। না হয় আপনারা নিজেরা ২২৯ জন সম্মানিত মালিকগণ সম্মিলিতভাবে শ্রমিক পথচারীদের সুবিধার্থে, দুই জায়গায় দুটি ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ করে দিন। যাতে নির্বিঘ্নে নিরাপদে আপনাদের শ্রমিকদের সাথে সাধারণ জনগণও চলাচল করতে পারে নিরাপদে।

আপনাদের শ্রমিক, আপনাদের সন্তান, দায়িত্ব আপনাদের।