ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

IMG_20170220_110129~2 ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধ বা মাজার।

গত কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসায় ফেরার সময় আমাদের নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধটির কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু একা যেতে ভালো লাগেনা, তাই গেলাম নগর খানপুরে। যেখানে আগে আমি আমার মা-কে নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতাম, সেখানে। আসছিলাম রিকশা করে, বরফকল আসতেই রিকশাওয়ালাকে বললাম, নগর খানপুরের ভেতরে যেতে। রিকশাওয়ালা ভাই তাই করলো, গেলাম নগর খানপুরে, আগে আমার বাসা যেখানে ছিল সেই জায়গায়। যাওয়া সাথে-সাথেই পেয়ে গেলাম ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে। বললাম, তোকে নিয়ে এখন ঘুরতে যাবো কিল্লার পুল ‘বিবি মরিয়ম’ মাজারে। আমার কথা শুনে আমার বন্ধুটিও রাজি হয়ে গেল। এরপর বন্ধুর সাথে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলে দুইজনে একসাথে গেলাম কিল্লার পুল, কিল্লার পুলের সাথেই ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধ বা মাজারটি।

IMG_20170220_110244~2বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধ বা মাজারের পূর্ণরূপ।

কেল্লার পুল হলো আমাদের নারায়ণগঞ্জের একটা ঐতিহ্যবাহী পুল। যা হাজীগঞ্জ কেল্লার নামে নামকরণ করে পুলটির নাম হয় কিল্লার পুল। এই হাজীগঞ্জ কেল্লা নিয়ে আবার একদিন আলোচনা করবো, আজকে ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধ বা মাজারের দুরবস্থা নিয়ে কিছু লিখতে চাই। সেই সাথে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই, এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধ বা মাজারটির সাথে।

IMG_20170220_110342~2বিবি মরিয়ম’ সমাধিস্থানের বারান্দায় সারিবদ্ধ ‘কবর’।

এই ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধটির সাথে মিশে আছে আমার আত্মা, মন-প্রাণ সবই। একসময় ভালোলাগা, না লাগার বেশিরভাগ সময়টা কাটাতাম এই পবত্র মাজারটির আশেপাশে। সমায়টা ছিল ১৯৮৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যখন কেল্লার পুল ‘ফাইন টেক্সটাইল’ মিলে কাজ করতাম তখন। ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধের সুবিশাল প্রাচীরের পাশেই ছিল ‘ফাইন টেক্সটাল মিল’।

IMG_20170220_110217~2বিবি মরিয়ম’ সমাধিস্থানের প্রহরীদের জন্য নির্মিত থাকার জায়গা।

বিবি মরিয়ম সমাধিসৌধ বা বিবি মরিয়ম মাজার কোথায়?

বিবি ‘মরিয়ম সমাধিসৌধ বা মাজারটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বিবি মরিয়মের সমাধি মুঘল আমলে নির্মিত একটি সমাধিসৌধ। এটি তৎকালীন মুঘল সম্রাট নিয়োজিত সুবেদার শায়েস্তা খাঁন কতৃক নির্মিত বলে ধারণা করে থাকেন ঐতিহাসিকরা । ঐতিহাসিকরা এ-ও ধারণা করেন যে, এই সমাধিসৌধটি ও এর লাগোয়া মসজিদের নির্মাণ কাল ১৬৬৪-৮৮ খৃষ্টাব্দে। সমাধিতে শায়িত ‘বিবি মরিয়ম’কে তৎকালীন বাংলার মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খানের কন্যা এবং ইরান দখত এর বোন তুরান দখত হিসেবে মনে করেন।

IMG_20170220_110415~2বিবি মরিয়ম’ সমাধিতে লাগানো সাইনবোর্ড।

সমাধিসৌধটি সুউচ্চ প্রাচির দিয়ে ঘেরা একটি আয়তাকার প্রাঙ্গনের মাঝখানে ভুমি থেকে অনেক উচুতে নির্মিত। বর্গাকার ইমারতটিতে একটি গম্বুজও রয়েছে। এছাড়াও ভবনের চারদিকে খিলান ছাদ বিশিষ্ট বারান্দা আর অনেকগুলো জানালা রয়েছে সমাধিসৌধটিতে। সমাধিসৌধটির কেন্দ্রস্থলে চতুস্কোন কক্ষে রয়েছে তিন ধাপ বিশিষ্ট সমাধি। সমাধিটি শ্বেত পাথরে নির্মিত ও লতা পাতার নকশা অঙ্কিত। এছাড়া ও কবর ফলক ও সমাধি লাগোয়া বারান্দায় বেশ কয়েকটি সাধারণ কবরও রয়েছে, যা সমাধিসৌধটির সামনে গেলেই সবার চোখে পড়ে ।

IMG_20170220_110545~2‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধের গেইট, এই গেইট দিয়েই হাজীগঞ্জ কেল্লায় যাতায়াত করতো।

এছাড়াও রয়েছে সমাধিসৌধটির পশ্চিম পাশে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, যার নির্মাণকাল সমাধিসৌধটির সমসাময়িক অর্থাৎ ১৬৬৪-৮৮ খৃষ্টাব্দে। এটিও শায়েস্তা খাঁন নির্মাণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। তার কারণেই হয়তো সমাধিতে শায়িত ‘বিবি মরিয়ম’ এর নামেই একে ‘বিবি মরিয়ম’ এর মসজিদ নামকরণ করা হয়েছে। সূত্র: উইকিপিডিয়া থেকে।

IMG_20170220_105818~2‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধের ভেতরে গড়ে ওঠা ‘বিবি মরিয়ম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’।

স্বাধীনতা পরবর্তি সময় থেকে এখানে গড়ে ওঠেছে ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধির নামে একটি স্কুল, যার নাম রাখা হয় ‘বিবি মরিয়ম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’। চতুর্দিকের প্রাচীর ঘেঁসে স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠেছে বহু দোকানপাট। সন্ধ্যা হলেই সমাধিসৌধটি হয়ে পড়ে একটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো, সমাধিসৌধটি ছাড়া এর আশেপাশে কোনো লাইট বা কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। সমাধিসৌধ সংলগ্ন মসজিদে লাইট থাকলেও পুড়ো সমাধিসৌধটি জায়গা থাকে অন্ধকার।

IMG_20170220_110053~2বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধের ভেতরে মুঘল যুগের নির্মিত মসজিদ।

বর্তমানে এটি নিয়ন্ত্রন দেখভাল করছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকা বিভাগ। কিন্তু বহু প্রাচীনতম এই সমাধিসৌধটির কোনো সংস্কার হচ্ছে না বহুবছর ধারে। যার কারণে সমাধিসৌধটির প্রাচীরের পুরানো ইটগুলিও ধসে পড়ছে, সেইসাথে সমাধিসৌধটিও। আমার ধারণা, যখন এই সমাধিসৌধটি তৈরি করে তখন কোনো সিমেন্টের আবিষ্কার হয় নাই, বা তখন কোনো সিমেন্ট-ই ছিলনা। সেইজন্যই পুড়ো সমাধিসৌধটি-ই চুনা আর সুরখি দিয়ে নির্মিত হয়। তাই অনেক পুরানো স্থাপনা হওয়াতে সমাধিসৌধটির প্রাচীর সহ এর মূল স্থাপনাও শেওলায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

যদি বর্তমান যুগের সিমেন্ট-বালু দিয়ে তৈরি হতো, তবে আর কয়েক বছর পরপর এর সংস্কার করা প্রয়োজন হতো না। চুনা-সুরকি দিয়ে গড়া বলেই কয়েক বছর পরপর এর সংস্কার জরুরী। নাহয় কালের বিবর্তনে মুঘল যুগের এসব স্মৃতিসৌধগুলি একদিন বিলীন হয়ে যাবে আমাদের নারায়ণগঞ্জ থেকে। কাজেই, প্রাচীন আমলের এই সমাধিসৌধটি আমাদের দেশের একটি আদিযুগের স্মৃতি, যা আমাদের নারায়ণগঞ্জে গৌরব। এখন এই ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধিসৌধ বা মাজারের পবিত্রতা রক্ষা করা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার?