ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

IMG_20170106_103558~2নারায়ণগঞ্জ হাজীগঞ্জ দুর্গ বা কেল্লা।

আমাদের গোদনাইল চৌধুরীবাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে নবীগঞ্জ গুদারাঘাটের একটু সামনেই হাজীগঞ্জ ফায়ার ব্রিগেড, এরপর হাজীগঞ্জ দুর্গ বা হাজীগঞ্জ কেল্লা। নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরেই এই ঐতিহ্যবাহী কেল্লা অবস্থিত। কোনো একসময় এটি খিজিরপুর দুর্গ নামেও সবার কাছে পরিচিত ছিল। নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোড ভায়া ডেমড়া আসাযাওয়ার মাঝেই এই কেল্লাটি সবার চোখে পড়ে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ কেল্লার স্থানটির সামনে দাঁড়াতেই বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠে কেল্লাটির দুরাবস্থা দেখে।

IMG_20170106_103523~2
কালের বিবর্তনে আর সময়ের ব্যবধানে এক সময়ের রক্ত হিম করা নাম খিজিরপুর (হাজীগঞ্জ) দুর্গ এখন এক নীরব নিস্তব্ধ পুরাকীর্তি। এ দুর্গের অভ্যন্তরে এখন ব্যবহৃত হয় গৃহপালিত পশুর চারণভূমি অথবা শিশু-কিশোরদের খেলার নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে। আর যখন তখন চোখে পড়ে গাঁজাখোর হিরোইনখোরদের আড্ডা। দেখার কেউ নাই-বলে রাতের আঁধারে কেল্লা সহ এর আশেপাশে ঘটে যায় অনেক অপরাধজনিত ঘটনা।

IMG_20170106_103533~2
জানা যায় এক সময় ঢাকার নবাবেরা এটিকে ঘিরে হাফেজ মঞ্জিল নামক একটি প্রাসাদ ও উদ্যান নির্মাণ করে ছিলেন এমন জনশ্রুতিও আছে। ঐতিহাসিকদের ধারণা মতে এটি ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসক ঈশা খাঁ মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কবল থেকে এ জনপদকে রক্ষা করার জন্য শীতলক্ষ্যা-ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা নদীর মিলন স্থলে কেল্লাটি নির্মাণ করেন। মোগল শাসক ঈশা খাঁ এই এলাকায় দুর্গ নির্মাণের পরপর তার মেয়েকে এই কেল্লার আশেপাশেই সমাধিস্থ করেন। যেটি বর্তমানে কিল্লার পুলস্থ ‘বিবি মরিয়ম’ সমাধি বা মাজার নামে পরিচিত।

কেল্লার সামনে গিয়ে অনুমান করা যায়, চতুর্ভুজাকৃতির এই দুর্গের পঞ্চভুজি বেষ্টন-প্রাচীরে রয়েছে, বন্দুক ঢুকিয়ে গুলি চালাবার উপযোগী ফোকর এবং চারকোণে গোলাকার বুরুজ। প্রাচীরের চারদিকে অভ্যন্তরভাগে দেয়ালের ভিত থেকে ১.২২ মিটার উঁচুতে রয়েছে চলাচলের পথ এবং এর দেয়ালেও আছে গুলি চালাবার উপযোগী ফোকর। চারকোণের প্রতিটি বুরুজের অভ্যন্তরভাগে দুর্গ প্রাচীরের শীর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত সিঁড়ি এবং এর বপ্র বহির্গত অংশে রয়েছে বন্দুকে গুলি চালাবার প্রশস্ততর ফোকর, যা এখনো চোখে পড়ে।

শীতলক্ষ্যা নদীর দিকে দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ থেকে বোঝা যায় যে, শুধুমাত্র নদীপথেই দুর্গের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল। ফটকটির আয়াতাকার কাঠামোতে রয়েছে পঞ্চভূজি প্রবেশপথ। প্রবেশপথের দু’পাশে রয়েছে খোদাই করা আয়তাকার খিলান এবং এর শীর্ষভাগ পদ্মফুলের অলঙ্করণ শোভিত। দুর্গের অভ্যন্তরে অপর কোনো নির্মাণ কাঠামো না থাকায় প্রতীয়মান হয় যে, বর্ষা মৌসুমে যখন জলদস্যুদের আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিত কেবলমাত্র তখনই দুর্গটিতে সৈন্য মোতায়েন করা হতো এবং সৈন্যরা সেখানে তাঁবুতে আশ্রয় নিত। আথবা দূর্গের ভেতরে থাকা সুড়ঙ্গ দিয়ে অন্য কেল্লায় পালিয়ে যেত জীবন বাঁচানোর তাগিদে।

দুর্গের চতুর্ভুজাকৃতির অঙ্গনের এক কোণে রয়েছে ইটের তৈরি একটি সুউচ্চ চৌকা স্তম্ভ। এটি সম্ভবত একটি পর্যবেক্ষণ বুরুজ। এই স্তম্ভের অবস্থান থেকেই দুর্গটিকে সমসাময়িক অপরাপর জলদুর্গের সমগোত্রীয় বলে ধরে নেয়া যায়। কামান বসানোর উপযোগী উঁচু বেদীর অবস্থান দুর্গটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ করা যায়, এরকম দুর্গ আরো একটি আছে সেটা শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে বন্দর এলাকায় অবস্থিত। শোনা যায় পূর্ব পাড়ের কেল্লা আর পশ্চিম পাড়ের কেল্লায় সুড়ঙ্গ পথে যোগাযোগ ছিল, কেল্লার ভেতরে যেই সুড়ঙ্গ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

দুর্গ বা কেল্লার বর্তমান দুরাবস্থা:

বর্তমানে সংস্কারের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী হাজীগঞ্জ কেল্লার ইটগুলো খসে পড়ছে, পুড়ো কেল্লায় কোনো আস্তর নাই। তাই কেল্লার দেওয়াল ঢাকা পড়ছে শেওলায়। দুর্গ এলাকার ব্যাপক অংশ জুড়ে এখন রয়েছে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার ব্রিগেড সদর দফতর। কেল্লাটির একপাশে রয়েছে খাল, যেই খালটি দিয়ে কোনো একসময় সেই আমলের মুগল সম্রাটরা নৌকাযোগে এই কেল্লায় আসাযাওয়া করতো, নাম ‘কিল্লার খাল’। (বহু আগে থেকে সেই খালের ওপর দিয়ে একট পুল তৈরি হয়, সেই পুলের নাম হাজীগঞ্জ কেল্লার নামেই নামকরণ করে নাম রাখা হয় ‘কিল্লার পুল’। এই পুলের ওপর দিয়েই নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোড ও ডেমড়া যাতায়াতের একমাত্র পথ।) আর কেল্লার তিনপাশে কোনো একসময় গড়ে ওঠেছে খাসজমির ওপর পাটের গুদাম। এই গুদাম মালিকরা স্বাধীনতার পর থেকে অস্থায়ী লিজ নিয়ে তাদের সংগ্রহ করা পাট রাখার জন্য কেল্লা ঘেঁসেই গুদাম নির্মাণ করে। তখন থেকেই এসব গুদামের কারণে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজীগঞ্জ কেল্লাটি সৌন্দর্য হারাতে থাকে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গত ৫ মার্চ ২০১৭ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সম্মানিত ড. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে গিয়েছিলাম, আমাদের ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রকাশিত ‘নগর নাব্য-মেয়র সমীপেষু’ বইখানা সম্মানিত মেয়রের কাছে পৌঁছে দিতে। তখন নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমস্যা নিয়ে সম্মানিত মেয়রকে চারটে প্রশ্ন করি। আমার এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সম্মানিত নাসিক মেয়র বলেন, নগরীর হাজীগঞ্জে অবস্থিত মোঘল স্থাপত্য হাজীগঞ্জ কেল্লা রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এর বেশিরভাগ জমি দখল হয়েছে। কিছু জমি পাট অধিদপ্তর থেকে লিজ দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা কেল্লাটিকে রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছি।”

সম্মানিত মেয়রের মুখে একথা শুনে, আমরাও আশা করছি যে, নাসিক মেয়রের গৃহীত পদক্ষেপ আর ওনার মহৎ উদ্যোগে হয়তো নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজীগঞ্জ কেল্লাটি ফিরে পাবে নতুন জীবন, আর দখলমুক্ত হবে ঐতিহ্যবাহী হাজীগঞ্জ কেল্লার জায়গা।

তথ্য সংগ্রহ বাংলাদেশ তথ্য বাতায়ন
নারায়োণগঞ্জ সদর উপজেলা