ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

সময় সময় লোকে বলে আপনি ভালোবাসার জাদুকর, মধুময় অন্তরের রূপকার। আসলে ভালোবাসা পেতে হলে আগে ভালোবাসা দিয়ে পুঁজি খাটাতে হয়। এটা কিন্তু সবাই জেনেও না-জানার ভান করে অহংকারে গদগদ হয়ে আগে থেকে ভালোবাসা ছাড়তে চায়না। আমি আমার বাবাকে দেখেছি, আমার বাবা আমার মাকে খুব ভালোবাসতেন। বাড়ি থেকে বেড় হওয়ার সময় কোথায় যাবে কী করবে সবকিছু আমার মায়ের কাছে বলে যেতেন। ভালোবাসা একটি মানবিক অনুভূতি এবং আবেগকেন্দ্রিক একটি অভিজ্ঞতা। ভালোবাসা শুধু যুবক-যুবতীর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ কোন মানুষের জন্য স্নেহের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ভালোবাসা। আমিও আমার মাকে খুব ভালোবাসতাম, মাও আমাকে ভালোবাসতেন। যখন আমার মা ছিলেন, তখন আমি আমার মাকে ছাড়া একটি রাতও ঘুমাতে পারি নাই। আমরা ছিলাম চার বোন, দুই ভাই। দুই ভাই-ই ছিলাম আলাদা আলাদা সংসারে। মা সবসময় আমার কাছেই থাকতেন। টেক্সটাইল মিলের কাজ শেষ করে যত রাতেই বাসায় ফিরতাম, মা আমার জন্য সজাগ থাকতেন। অনেকসময় মা বলতেন, এতো রাতে বাসায় ফিরলি? রাত কী কম হয়েছে? আমি মাকে বলতাম, মা বেশি রাত তো হয় নাই, কেবল ১০টা বেজেছে। মা বলতেন, আরে রাখ! এখন রাত ২টার কম-না। আসলে তখন রাত ২টাই বাজে। আকাশের তারার দিকে চেয়েই মা ঘড়ির ঠিক সময় বলে দিয়েছে!

আমিও আমার ছেলেমেয়েকে খুব ভালোবাসতাম, কিন্তু বেশি প্রকাশ করতাম না। সবসময় রাগ দেখিয়ে চলতাম। ওরা মনে মনে ভাবতো, বাবা আমাদের বেশি ভালোবাসে না। সময় সময় ওরা ওদের মায়ের কাছেও বলে ফেলতো বাবা আমাদের ভালোবাসে না। আসলে কিন্তু তা নয়, আমি ওদের ভীষণ ভালোবাসতাম। সেই ভালোবাসাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়। আবেগধর্মী ভালোবাসা সাধারণত গভীর হয়, বিশেষ কারো সাথে নিজের সকল মানবীয় অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া, এমনকি শরীরের ব্যাপারটাও এই ধরনের ভালোবাসা থেকে পৃথক করা যায় না। ভালোবাসা বিভিন্ন রকম হতে পারে, যেমন- ধর্মীয় ভালোবাসা, গুরুর প্রতি ভালোবাসা, জিনিসের প্রতি ভালোবাসা, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা, পছন্দের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি ইত্যাদি।

পৃথিবীতে সব প্রাণীর মধ্যে ভালোবাসা অনুভূত হয়। এরমধ্যে মানুষের ভালোবাসাই বেশি প্রকাশ পায়। যেমন: আমি এই ব্লগে যখন লেখালেখি শুরু করি তখন এই ব্লগের অনেকের সাথে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কোনো সময় ফেসবুক থেকে আবার কোনো সময় ব্লগ থেকে। প্রথমে লেখার মন্তব্যে, কখনো মোবাইল ফোনে, এরপর সামনাসামনি। যেমনটা হয়েছিল, গত বছর ১৩ মে ২০১৬ ঢাকা সংসদ ভবন সংলগ্ন চন্দ্রিমা উদ্যানে কৃষ্ণচূড়া আড্ডায়। সে আড্ডায় কয়েকজন ব্লগার/লেখকদের সামনাসামনি হওয়ার কারণেই তাদের সাথে আন্তরিক সখ্যতা গরে ওঠে। সেই ভালোবাসার টানে ছুটে যাই নারায়ণগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ। যেখানে থাকে আমাদের বিডি ব্লগের তুখোড় লেখক কাজী শহীদ শওকত সাহেব। গিয়েছিলাম, শহীদ শওকত দাদার বাড়িতে ভালোবাসার টানে। আমার এখানেও আসেছিল আমার মাহাগুরু, গুরুমশাই ও ব্লগের সাজ্জাদ রাহমান দাদা। এসেছিলেন ব্লগ সংকলক সম্মানিত আইরিন সুলতানা দিদি, শফিক মিতুল দাদা। ভালোবাসার টানে মানুষ নদী মহাসাগরও পাড়ি দিতে পারে, যদি মানুষের ভেতরে সেই গভীর ভালোবাসা আবির্ভাব হয়। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, যেকোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত স্নেহ প্রায় সময় খুবই আনন্দদায়ক হতে পারে। এমনকি কোনো কাজ কিংবা খাদ্যের প্রতিও। আর এই অতি আনন্দদায়ক অনুভূতিই হলো ভালোবাসা। ভালোবাসা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ভালোবাসা আছে বলেই হয়তো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে গ্রহ নক্ষত্রগুলি অহরহ ঘুরছে বিরামহীন ভাবে।

IMG_20170125_112444

আইরিন সুলতানা দিদির দেওয়া ওড়না আর কাজী শহীদ শওকত দাদার দেওয়া পাঞ্জাবি। সবকিছুই ভালোবাসার বিনিময়।

ভালোবাসা মানুষ মানুষের মধ্যেই শুধু নয়, স্রষ্টার প্রকৃতির মাঝেও ভালোবাসা বিদ্যমান। বস্তু ও খাদ্যের প্রতিও ভালোবাসা থাকে। আমি একটা মোবাইল কিনেছিলাম, সেই মোবাইল দিয়েই অনলাইনে লেখালেখি করতাম, দিনরাত ২৪ ঘন্টা সেই মোবাইলটা নিয়েই থাকতাম। মোবাইলটার কোনো বিশ্রাম ছিল না। আমি যতক্ষণ সজাগ থেকে সচল থাকতাম, আমার মোবাইলটাও আমার সাথে সজাগ থাকতো। মোবাইলটাকে আমি আমার ছেলের মত ভালোবাসতাম। সেই মোবাইলটাকে আমি কিছুদিন আগে হারিয়ে ফেলি। সেই মোবাইল ফোনটা হারিয়ে আমি কয়েকদিন যাবত পাগলের মতো ছিলাম। কিছুই ভালো লাগতো না। একজন মানুষের কাছ থেকে যখন তার প্রিয় মানুষটি হারিয়ে যায়, সেই হারানো বেদনা যেমন হয়, ঠিক আমার কাছেও তেমন লেগেছিল মোবাইলটার জন্য। এখনো আমার বিশ্বাস, আমার মোবাইলটা আমার কাছে একদিন ফিরে আসবে। তেমনি কারো প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীলতা কিংবা প্রতিক্ষেত্রে কারো উপস্থিতি অনুভব করা ভালোবাসার সাথেই সম্পর্কযুক্ত। কারো প্রিয় মানুষ যদি কারো কাছ থেকে হারিয়ে যায় সেই মানুষটির জন্য অপেক্ষায় আর আশায় থাকে মাসের পর মাস আর বছরের পর বছর।

ভালোবাসা ছিন্ন করে কেউ যদি কারো কাছ থেকে দূরে সরে চলে যায়, ছ্যাঁকা খাওয়া ব্যক্তি সবসময় মনে করে সে আবার আমার কাছে ফিরে আসবে। আশায় থাকে পথ চেয়ে মনের মানুষটির জন্য। একটা পরিপূর্ণ সংসার যদি ভেঙ্গে যায়, তবু উভয় পক্ষই আশাবাদী থেকে আবার সংসার গড়া যাবে। বছর গড়িয়ে যখন যুগ শেষ হয় তখন আস্তে আস্তে সেই ভালোবাসার আকর্ষণও কমে যায়, আবার নতুন করে অন্য কাউকে ভালোবাসতে থাকে। অধিকাংশ প্রচলিত ধারণায় ভালোবাসা, নিঃস্বার্থতা, স্বার্থপরতা, বন্ধুত্ব, মিলন, পরিবার এবং পারিবারিক বন্ধনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ভালোবাসায় মানুষকে হাসায়, ভালোবাসায় মানুষকে কাঁদায়। ভালোবাসায় জীবকে বাঁচিয়ে রাখে আবার ভালোবাসায় জীবকে মৃত্যুর দিকে টেনে নেয় ঠেলেও দেয়। অনেকে ভালোবাসায় নতুন জীবন পায়, আবার কেউ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে যুগের পর যুগ।

ভালোবাসা দেহ মনের এমন এক অনুভূতি শুধু ভালোবাসার জিনসটির কাছেই সবসময় থাকতে মন চায়, কাছে পেতে চায়, সে হোক মানুষ, হোক কোনো বস্তু। এই ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে মানুষ একসময় চিরকুমার হয়ে থেকে যায়, সন্ন্যাসীরা প্রভুর ভালোবাসার টানে সংসার ছেড়ে নির্জন বনজঙ্গলে গিয়ে প্রভুর ধ্যানে মগ্ন হয়ে বসে থাকে যুগের পর যুগ। ভালোবাসার টানে চলে আসে সে সুদূর আমেরিকা থেকে আমাদের বাংলাদেশে। ভালোবাসার টানে নিজের সন্তানাদি ফেলে দিয়ে চলে যায় অন্যের হাত ধরে। আসলে আমাদের দেহ এবং মনে কেমন ভালোবাসা থাকা চাই? কেমন ভালোবাসা হলে বিশ্ব জয় করতে পারবো, হিমালয় জয় করতে পারবো? ভালোবাসা পবিত্র, ভালোবাসা মনের আবেগ থেকে জন্ম নেয়। ভালোবাসা ছাড়া সৃষ্টিকর্তার কৃপাও মেলেনা। সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা পেতে হলে আগে স্রষ্টার সৃষ্টির সবকিছুকে ভালোবাসতে হবে আমাদের।

পরিশেষে ব্লগ ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সবাই আমার আন্তরিক ভালোবাসা গ্রহণ করুন। শত অসুস্থতার মাঝেও এই বিডিনিউজ ব্লগটা ছেড়ে থাকতে পারিনা ব্লগের ভালোবাসার টানে। আমি এই ব্লগের প্রেমিক আর আপনাদের ভালোবাসার কাঙ্গাল।