ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

এক দুখিনী মায়ের জন্ম ১৯৮৯ সালে এক গরিব মা-বাবার সংসারে। নাম তার অনিতা রানী। সংসারে তার এক ভাইও ছিল, ছোটভাইটি তার দুই-বছরের ছোট। বাবা চাকরি করতেন ব্যক্তি মালিকানাধীন একটা কারখানায় সামান্য বেতনে। তখনকার সময় অনিতার বাবার বেতন ছিল মাত্র উনিশশো টাকা। সপরিবারে থাকত পরের বাড়িতে ভাড়া, বাসা ভাড়া ছিল দুইশ টাকা। সংসারে উপার্জন করার মতো ছিল তার একমাত্র বাবা-ই। তখনকার সময়ে যত্রতত্র গার্মেন্টস ছিলনা, এদেশের অনেক মহিলা তখন গার্মেন্টস কী, গার্মেন্টস কাকে বলে তাও জানত না। কাজেই সংসারের হাল অনিতার বাবার উপরই ন্যস্ত ছিল।

p20170613-025516 দুখিনী অনিতার সাথে তার দুই মেয়ে- পূজা ও অঞ্জলি।

তখন বাজারে চালের মূল্য ছিল পাঁচ টাকা হতে সাড়ে পাঁচ টাকা, আটার মুল্য ছিল দুই টাকা হতে আড়াই টাকা। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার মধ্যেই অনিতা হাটি হাটি পা পা করত করতে বড় হতে লাগল গরিব মা-বাবার সংসারে। চারবছর বয়সেই অনিতা আদর্শলিপি বই পড়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য অনিতার এরকম কান্নাকাটি দেখে তাঁর মা-বাবা নিকটস্থ একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিতাকে ভর্তি করে দেয়। স্কুলে ভর্তির পর অনিতার স্কুলে আসা-যাওয়া দেখে স্কুলের সব শিক্ষক ওর প্রতি একটু বেশি নজর রাখতেন। এভাবে দিন যায় মাস যায়, বছর গড়িয়ে যখন ক্লাস ওয়ানের বাৎসরিক পরীক্ষা শুরু হল সেই পরীক্ষায় অনিতা আরও ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীদের পিছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করে ক্লাস টু-তে অনিতা হয়ে গেল ক্লাস ক্যাপটেন।

এদিকে অনিতা স্কুলে যাওওয়ার সময় অনিতার ছোট ভাইও ওর সাথে স্কুলে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে যখন অনিতা বই খাতা নিয়ে স্কুলে রওনা হয়। সেটা দেখে অনিতার গরিব মা-বাবা, বাধ্য হয়ে অনিতার সাথে ওর ছোটভাইটিকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয় একই স্কুলে। এখন আর অনিতা স্কুলে যাওয়ার সময় কোনো সাথী খুঁজতে হয়না, সাথী তার ছোটভাই। দুই ভাই-বোন মিলেমিশে স্কুলে যায় আসে। এভাবে শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে চলতে চলতে একসময় অনিতা দশম শ্রেনীতে আর ছোট ভাইটি অষ্টম শ্রেণীতে পড়তে থাকে। শুরু হল এসএসসি পরীক্ষা, সময় তখন দুই হাজার পাঁচ সাল। এসএসসি পরীক্ষায় অনিতা ভাল রেজাল্ট নিয়ে পাস করে। এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করার পর সংসারের অভাবের কারণে অনিতার পড়ার ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও লেখাপড়া আর অনিতার কপালে জুটেনি। সে সময় অনিতা বয়সের দিক দিয়েও বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেল। একটা গরিব পরিবারে একটা মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হওয়া মানে মাথার উপর বিরাট বোঝা। অনিতা বড় হওয়ার সাথে সাথে অনিতার মা-বাবা মস্তবড় দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় অনিতার বিয়ের ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে।

অনিতার বাবা তখন নারায়ণগঞ্জের বাইরে কোনো এক জেলাশহরে কাজ করে। সংসারের জন্য মাসে মাসে কিছু কিছু করে টাকা পাঠায় কোনো পরিবহণের মাধ্যমে অথবা ডাকযোগে। একদিন অনিতার মা অনিতার বাবা’র কাছে খবর পৌছায়, “অনিতাকে দেখতে এসেছে তুমি তাড়াতাড়ি করে নারায়ণগঞ্জে আস। ছেলের বাড়ি ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের একটা গ্রামে। ছেলে দেখতে খুবই ভাল, যতটুকু শুনেছি পারিবারিক দিক দিয়েও ভালো।” বললেন, অনিতার মা। সংবাদটা পাওয়া মাত্র, অনিতার বাবার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার পালা। কেননা মেয়ে বিয়ে দিতে হলে তোবিস্তর… টাকা কড়ির প্রয়োজন, কিন্তু টাকা পাবে কোথায়? মেয়ের বিয়ের জন্য কে দিবে তাকে টাকা? এসব দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েও উপায়ন্তর না দেখে শেষ অবধি অনিতার বাবা নারায়ণগঞ্জ আসে।

অনিতার বাবা বাসায় এসে অনিতার মাকে বলে, “মেয়ের বিয়ের জন্য তো অনেক টাকা দরকার, টাকা পাবো কোথায়?” অনিতার মা বললেন, “তুমি নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়ার পর, আমি একটা গার্মেন্টসে চাকুরি নিয়ে কাজ করছি। কাজে লেগেছি, শুধু ছেলে-মেয়ের কথা চিন্তা করে যা, তোমাকে আমি জানাইনি। কাজ করে যেই টাকা বেতন পেয়েছি, সেই টাকা থেকে ছেলের স্কুলের জন্য কিছু খরচ করে, বাদবাকি টাকা দিয়ে মেয়ের জন্য সোনার কানের দুল, হাতের চুড়ি, বানিয়ে রেখেছি।” তখন অনিতার মায়ের মাসিক বেতন ছিল আঠারোশো টাকা। তখন স্বর্ণের বাজার মূল্য ছিল চার হাজার, হাজার টাকা ভরি। সময়টা তখন ২০০৭ সালের মাঝা-মাঝি। মেয়ের জন্য এগুলি করেও নগদ কিছু টাকাও হাত করে রেখেছে অনিতার মা।

কিন্তু অনিতার বাবা তো একেবারেই নিঃস্ব। অনিতার বাবা মেয়ের মাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলে পক্ষের দাবি-দাওয়া কী কী?” অনিতার মা বললেন, “কিছুই না, আমরা খুশি হয়ে যা দেই, আর যে-ভাবেই পারি, তাতেই তারা মেয়ে নিতে রাজি।” এ কথা শুনে অনিতার বাবা, নিজের কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের সাথে আলাপ করলে, তার বন্ধুবান্ধবরা, অনিতার বিয়েতে কিছু টাকা-পয়সা দিবে বলে তাকে আশ্বাস দেয়। কোন দুশ্চিন্তা না করে, বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে ফেলতেও বলে দেয়। জানিয়ে দেওয়া হয়, “তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করবে বিয়ের বরযাত্রীদের খাওয়ানের খরচটা দেবার।” তাদের আশ্বাস পেয়ে অনিতার বাবা গেল তার বড়দির বাড়ি, বড়দির স্বামী, (জামাই বাবু) বিয়ের সময় অনিতার হাতের দুটা সোনার চুড়ি দিবে বলে কথা দেয়। বড়দি বললেন, “বড় ভাগ্নির বাড়ি গিয়ে ভাগ্নি জামাইকে নিমন্ত্রণ করে আসতে।” তার মানে হল, ভাগ্নি জামাইকে নিমন্ত্রণ দিতে গেলে, ভাগ্নি জামাইও হয়তো কিছু একটা দিবে।

বড়দি’র কথামত অনিতার বাবা, একদিন বড় ভাগ্নির বাড়ির উদ্দশে রওনা হয়। ভাগ্নির বাড়ি চাঁদপুর মুন্সির হাট। সেখানে যাওয়ার পর ভাগ্নি জামাই অনিতার বিয়ের কথা শুনে খুব খুশি হয়ে বিয়েতে অনিতার গলার হার বানিয়ে দিবে বলে আশ্বাস দেয়। সোনা গয়নার ঝামেলা শেষ হয়েছে ঠিক, কিন্তু হিন্দুদের বিয়েতে নানাবিধ খরচের ঝামেলা কম নয়। শেষমেশ উপায়ন্তর না দেখে অনিতার মা-বাবা আশা সমিতি হতে চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে মেয়ের বিবাহ সম্পাদনের জন্য। তারপর, দুই হাজার সাত সালের মাঝামাঝি কোনো একসময় অনিতার বিয়ের দিন ধার্য হয়ে যায়, অতপর বিয়ে। মেয়ের বিয়েতে সে সময় অনিতার বাবা, দুইশজন লোক খাওয়ানোর আয়োজন করে ফেলে।

সমাজের আরো দশটা মেয়ের বিবাহ যেভাবে হয়, অনিতার বিয়েও সেভাবেই সম্পূর্ণ হয়। ঢাকঢোল, গেইট-পেন্ডেল, তামা-কাঁসা, লেপতোশক সহ সবকিছুই ছিল গরিব মায়ের মেয়ে বিয়েতে। বিয়ের পরদিন অনিতাকে নিয়ে যায় তার শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জে। বিদায় লগ্নে সবাইকে কাঁদিয়ে অনিতা চলে গেল তার স্বামীর বাড়ি। এরপর ২০০৯ সালে এক কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো এক সন্তানের মা হয়ে গেল অনিতা। বাবা-মায়ের ঘরে ছিল কুমারী, বিয়ের দু’বছরের মাথায় অনিতা হয়ে গেল মা। আবার ২০১১ সালে আরেক কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে পরপর দুটি সন্তানের জননী অনিতা। অনিতার এই দুটি সন্তানই ভূমিষ্ঠ হয়, তার মা-বাবা যেখানে থাকে সেখানকার কোনো-এক ক্লিনিকে। নিজের গর্ভধারিণী মায়ের মতো শ্বশুর-শ্বাশুড়ি এতো খেদমত করবেনা মনে করেই অনিতা নয় মাসের গর্ভবতী থাকতেই, তার মা-বাবার কাছে চলে আসে নিজের নিরাপত্তার বিষয়গুলি চিন্তা করে।

p20170613-025443 অনিতার দুই মেয়ে

এদিকে পরপর দুটি কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর অনিতার ওপর নেমে আসে মানুষিক নির্যাতন আর নানাবিধ কটুবাক্য। দুই-দুইবার দুটি সন্তান নারায়ণগঞ্জে হওয়াতেই ছেলের বদলে হয়েছে মেয়ে, বলেন অনিতার শশুরবাড়ির লোকজন ও পাড়াপড়শি।

এসব কটুবাক্য আর অপবাদ সইতে সইতে অনিতার মেয়ে দুটি বড় হতে লাগল। একসময় শ্বশুর শ্বাশুড়ি আর স্বামীর অজান্তেই বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দেয় অনিতা। অনিতার স্বামী কর্মঠ অথচ অলসের গাদি। ঘরে একদিনের খাবারের চাউল থাকলে ওইদিন আর সে কাজে যায় না, এটা যেন তার জন্মলগ্ন স্বভাব। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে মনমালিন্য হওয়ার কারণে একসময় শ্বশুরের সংসার থেকে আলাদা করে দিয়ে একটা ছাড়াবাড়িতে জায়গা করে দেয় অনিতার শ্বশুর। ছাড়াবাড়ির যেই ঘরে অনিতা থাকে সেই ঘরে দিনদুপুরে চুরিডাকাতি হলেও চুপি দিয়ে দেখার কেউ নাই। তবু মনে সাহস নিয়ে দুটি সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার জন্য অনিতার এই ছাড়াবাড়িতে থাকা। বড় মেয়ে যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে তখন ছোট মেয়েও ওর স্কুলে যাওয়ার জন্য কাঁদে।

ছোট মেয়ের কান্না দেখে অনিতা তার ছোট মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। দু’বোন স্কুলে ভর্তির পর, প্রতিদিন দু’বোন একসাথে স্কুলে আসাযাওয়া করে। শত দুর্যোগ আর মেঘবৃষ্টির দিনেও অনিতার দুই মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ নাই। সেজন্য স্কুল থেকে অনিতার দুই মেয়ে ছয়মাস পরপর পড়ার খরচ বাবদ কিছু টাকাও পায়। এসব দেখেও অনিতার স্বামীর দুইটি মেয়ের জন্য একটুও মায়া হয় না। সন্তানদের মানুষ করার যেন ইচ্ছাই নাই, যত দুশ্চিন্তা অনিতার। কোনো ঈদে বা পূজাপার্বণে নারায়ণগঞ্জ থেকে অনিতার মা-বাবা অনিতাদের বাড়িতে গেলে চাউল, ডাউল, তেল, সাবান সহ অনেককিছু স্থানীয় বাজার থেকে কিনে দেয় অনিতার মা-বাবা।

অনিতার মা-বাবারও আর কেউ নাই যে তাদের জন্য ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে। তাঁদের সব চিন্তা এখন অনিতার দুই মেয়ের জন্য আর অনিতার সংসারের জন্য। অনিতা ছাড়া তাদেরও এই পৃথিবীতে আর কেহ নাই, অনিতাই তাঁদের সব। তাই সময়-অসময় সবসময়ই অনিতার সংসারের জন্য বর্তমান আধুনিক যুগের নেটওয়ার্ক ভিত্তিক ব্যাংকিং ‘বিকাশ’ এর মাধ্যমে মাসে অথবা পনেরো-দিনে, তাদের সামর্থ্যানুযায়ী কিছু-কিছু করে টাকা পাঠিয়ে দেয়। তাঁদের উদ্দেশ্য একটাই, পেটভরে যেন দুমুঠো ভাত খেতে পারে সে-জন্য। এছাড়াও অনিতার দুই মেয়ের লেখাপড়া করার যাবতীয় খরচাদি অনিতার মা-বাবাই বহন করে আসছে দুই মেয়ের স্কুল জীবন থেকে। এভাবে চলতে-চলতে গতবছর, অনিতা আবার গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এবার, গর্ভবতী থাকাবস্থায় নানারকম কথা শুনতে হয় অনিতাকে। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আর পাড়াপড়শি সবার সাথে অনিতার স্বামীও বলছিল, “যদি এবার মেয়ে হয় তো, দু’মেয়েকে সাথে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যেতে হবে।”

এসব কথা শুনে অনিতার কান্না ছাড়া আর কি-ই বা থাকতে পারে? অনিতা শুধু তার সৃষ্টিকর্তাকেই ডাকছিল মনেপ্রাণে। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এই হতভাগী মায়ের মুখপানে আর কে-ই বা চাইবে। হঠাৎ একদিন খবর আসল অনিতারর মায়ের কাছে। খবরটা হল, “মা আমার তো সময় ঘনিয়ে এসেছে, আমি খুবই বিপদে মা, তুমি একমাসের জন্য ছুটি নিয়ে আমার বাড়িতে আস।” খবর পেয়ে অনিতার মা ওর বাবাকে সবকিছু খুলে বললেন। তখন অনিতার বাবা অনিতার মাকে অনিতাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য সম্মতি দিলেন। সম্মতি দেওয়ার কারণও আছে। কারণ, এর আগে দুটি মেয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছে নারায়ণগঞ্জে, তখন অনিতার শশুরবাড়ির সবাইর সাথে অনিতার স্বামীও বলছিল যে, “ডেলিভারি নারায়ণগঞ্জ হওয়াতেই মেয়ে হয়েছে, এখানে হলে ছেলে হতো।”

তাই আবার অনিতার মা-বাবাও মেয়েকে নারায়ণগঞ্জ আনতে নারাজ, যা হবার সেখানেই হবে। গতবছর ২০১৬ সালের কোন একসময় অনিতার বাবা অনিতার মাকে পৌঁছে দিয়ে আসে অনিতাদের বাড়ি ডেলিভারির সময় মেয়েকে খেদমত করার জন্য। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় এবার অনিতার কোলজুড়ে আসে এক ফুটফুটে ছেলেসন্তান, নাম রেখেছে প্রিতম।

দুখানি মা, অনিতা এখন তিন-সন্তানের মা, কিন্তু দুঃখ লাঘবের কোন সম্ভাবনা নেই অনিতার জীবনে। ডেলিভারি হয়েছে আধুনিক যুগের প্রচলিত সিজারে, হাসপাতালের যাবতীয় খরচাদি সব কিছুই বহন করতে হয়েছে অনিতার মা-বাবাকে। থাকে দরজা জানালা ছাড়া একটা কুঁড়েঘরে, বৃষ্টি এলে বাইরে পড়ার আগেই পড়ে ঘরে। অথচ এই কুঁড়েঘরখানা মেরামত করার জন্য ধাপে ধাপে ওর স্বামীকে অনেক টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘরখানা বিগত কয়েক বছরের মধ্যেও ঠিক হয়নি, ঠিক হয়নি ঘরের দরজা জানালাও। স্বামী বেকার সেসাথে চলাফেরাও বেশি ভাল নয়। সংসারে খাবার না থাকলেও অনিতার স্বমীর কিছু যায় আসেনা। যৌতুক ছাড়া বিয়ে করেছে বলে, ক’দিন পরপরই অনিতাকে বলে, “তোমার মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা হাওলাত নাও, আমি ক’দিন পরে দিয়ে দিচ্ছি।” স্বামীর কথায় বিশ্বাস করে অনিতাও মায়ের কাছে দাবি করে বসে, কিছু টাকা পাঠানোর জন্য। মেয়ের কথা শুনে গর্ভধারিণী মাও, চোখের জল ফেলতে ফেলতে, জমানো তহবিল থেকে টাকা পাঠিয়ে দেয় মেয়ের জন্য।

IMG_20160710_114237অনিতার তৃতীয় ছেলেসন্তান প্রিতম।

এ-অবস্থায়, তিন-তিনটে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে অনিতা কী করতে পারে? সন্তানদের পেটের ক্ষুধার কথা ভেবে অনিতা কোনদিন তিন বেলার মধ্যে ঠিকমত এক বেলা খাবারও খেতে পারেনা। না খেয়ে থেকেও তবু স্বামী-সংসার, সন্তানই অনিতার কাছে নাখেয়ে থাকা পেটের ক্ষুধা নিবারণের সুখ। এই সুখ তার আগামী দিনের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। না খেয়ে থেকেও যদি ছেলেমেয়েদের একটু মানুষ করা যায় তবেই বর্তমান কষ্ট অনিতার স্বার্থক হবে।

সেই সুখের স্বপ্ন দেখে সংসারের ক্ষুধার জ্বালা মিঠানোর জন্য অনিতার কতরকম চেষ্টা! প্রতিদিন খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে থাকা একটা তেঁতুলগাছের নীচ থেকে তেঁতুল কুঁড়ে আনা হল অনিতার প্রথম কাজ। সেই তেঁতুলগুলি শুকিয়ে সেই তেঁতুল থেকে বিচি আলাদা করে একটা পাত্রে জমা করে রেখে দেয়। এভাবে যখন চার-পাঁচ কেজি তেঁতুল হয়, তখন সেগুলি বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। বিক্রিত টাকা দিয়ে সংসারের জন্য কিনে আনে চাউল, ডাউল সহ আরও কিছু। আবার বাড়ির চারদিকে ঘরের পাশে পুকুরপাড়ে বপন করে নানারকম সবজি। সেসব সবজি হাটের দিন সকালবেলা সংগ্রহ করে পুকুরে ধুয়ে, আঁটি বেঁধে কখনো কখনো নিজেই নিয়ে যায় বাজারে। অনিতা হাটবাজারে গেলে ওর দুধের শিশুটিকে রেখে যায় ওর দুই মেয়ের কাছে। মা বাজার থেকে না আসা পর্যন্ত অনিতার দুই মেয়ে ছোটভাইকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মাঝরাস্তায়, মায়ের আগমনের আশায়। এসব কষ্ট অনিতার এখন নিত্যদিনের সঙ্গি যা ওই গ্রামের মানুষের মুখে শোনা।

IMG_R_20160611_084508_9 মায়ের সাথে তিন ভাই-বোন।

 মেয়ের এ-সব কষ্টের কথা শুনে অনিতার মা-বাবা অনিতাকে বলে, “তোমার এতো কষ্ট করার দরকার নাই, তুমি তিনটি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমাদের কাছে চলে আস।” মা-বাবার এসব কথা শুনে অনিতা বলে, “মা, আমি যদি তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে তোমাদের এখানে চলে আসি, তাহলে আমার এই সাজানো কাচের স্বর্গ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে, যা আর কোনদিন জোড়া লাগাতে পারবনা।” আরও বলে, “তোমরা যদি কিছু নাও দাও, তবু একথা আর কোনদিন আমাকে বলবে না মা। আমি আসলে তোমাদের দুই নাতিনের লেখাপড়া হয়ত চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।” অনিতার মুখে এসব কথা শুনে, অনিতার মা-বাবা আর কখনওই ওকে আসার কথা বলেনা।

সেই ২০০৭ সালে অনিতাকে বিয়ে দেবার পর বছরের নয়-মাসই থাকত বাবার বাড়িতে। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, দেবর-ননদীদের কটুবাক্য সইতে না পেরে, মা-বাবার কাছেই বেশি থাকতে হতো অনিতাকে। আর এখন অনিতা শত কষ্টে থেকেও মা-বাবার এখানে আসতে চায় না, সংসার আর ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। অনিতার বড়মেয়ে এবার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী, ছোটমেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। দুই মেয়ে লেখাপড়ায়ও খুব ভাল। ওদেরও খুব ইচ্ছা, শত কষ্টের মাঝেও ওরা লেখাপড়া শিখে একদিন মানুষের মত মানুষ হবে। অনিতাও ওদের মুখপানে চেয়ে শত দুঃখকষ্ট বুকে চেপে ধরে বর্তমান দিনগুলি অতিবাহিত করছে। জানিনা, এই দুখিনীর সংসারে কোনদিন সুখ-পাখি বাসা বাঁধবে কিনা।